তদানীন্তন ব্যাংক কর্মচারী ফেডারেশনের আহ্বানে ১৯৭৪ সালের ৪ আগস্ট বাংলাদেশের সব ব্যাংকে পালিত হয়েছিল এক অসাধারণ ধর্মঘট। ফেডারেশনের দাবি ছিল শ্রমবাদের সূত্রের ভিত্তিতে শ্রমিকের বেতন নির্ধারণ করতে হবে। সূত্রানুযায়ী বেতন নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলন বিশ্বের ইতিহাসে এটিই প্রথম। এরূপ দাবিতে কোথাও কোনোরূপ আন্দোলনেরও প্রশ্ন ছিল না। এর আগে যারা শ্রমবাদ সম্পর্কে কোনোরূপ ধারণা পাননি তারা ‘শ্রমবাদের সূত্রের ভিত্তিতে শ্রমিকের বেতন নির্ধারণের’ কথা শুনে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাবেন নিশ্চয়।
মরহুম এমএনএ, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যক্ষ আবদুল হামিদ যিনি ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে প্রচারণায় বলে আসছিলেন ‘পাকিস্তান একটি অবাস্তব রাষ্ট্র, এটি প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও কোনো ক্রমেই ২৫ বছরের বেশি টিকবে না এবং এটি গোরস্তানে পরিণত হবে’ এবং ৬ দফার ডামাডোলের মধ্যেও ‘পূর্বপাকিস্তান পাকিস্তানে থাকতে চায় কি চায় না এ মর্মে এখানে গণভোট দিতে হবে’ বলে দাবি করে আসছিলেন, তার প্রণীত শ্রমবাদ প্রাকৃতিক সত্য এবং পবিত্র কুরআনভিত্তিক শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থার একটি দর্শন। ‘সকল সৃষ্টি (সম্পদ/রিজিক) প্রয়োজনমাফিক সম্পন্ন হয়ে থাকে এবং সব কর্মক্ষম মানুষ ক্ষমতানুযায়ী শ্রম প্রয়োগ করলে সবার প্রয়োজনমাফিক সম্পদ আহরিত হবে’Ñ শ্রমবাদ এ সত্যকে মৌলিক স্বীকার্য হিসেবে গ্রহণ করে। সবার প্রয়োজনমাফিক আহরিত সম্পদের ওপর প্রত্যেকের অধিকারও প্রয়োজনমাফিক। আর তাই সমাজের কেউ প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কিছু ভোগ করলে কারো না কারো সম্পদের ঘাটতি হতে বাধ্য। শ্রমবাদে মানুষের প্রয়োজনকে দুই ভাগে দেখানো হয়েছে, যেমনÑ সাধারণ প্রয়োজন ও বিশেষ প্রয়োজন। সাধারণ প্রয়োজন, যেমনÑ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, সমাজ বা রাষ্ট্রকে প্রদেয় ট্যাক্স, খাজনা প্রভৃতি। এ প্রয়োজন সব মানুষেরই মোটামুটিভাবে সমান। বিশেষ প্রয়োজন শ্রমিকের যোগ্যতা ও দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। যোগ্যতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিশেষ প্রয়োজনও বৃদ্ধি পেতে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন কর্মপরিবেশে মানুষের ভিন্ন ভিন্ন ব্যতিক্রমী প্রয়োজন দেখা দেয়। এটিও বিশেষ প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। শ্রমবাদ এ বিষয়গুলোকে সমন্বয় করে শ্রমিকের বেতনের সূত্র প্রদান করেছে।
সমাজের জন্য প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এরূপ যেকোনো দৈহিক বা মানসিক কর্মকেই শ্রমবাদের আলোচনায় শ্রম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আর এ শ্রম যিনি সম্পাদন করেন তিনিই শ্রমিক। এ হিসেবে কৃষক, কুলি, মজুর, মেথর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত সবাই শ্রমিক। শ্রমবাদ সমাজের জন্য অপরিহার্য সব শ্রমের সমমর্যাদায় বিশ্বাসী। তবে শ্রমিকের মর্যাদা, যোগ্যতা ও দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্বব্যাপী শ্রমবাদই একমাত্র অর্থনৈতিক দর্শন যাতে কর্মরত ব্যক্তিদের পারিশ্রমিক বা বেতন নির্ধারণে সুবিন্যস্ত একটি সূত্র রয়েছে। যেহেতু সব কর্মক্ষম মানুষের ক্ষমতানুযায়ী সম্মিলিত শ্রমের ফলে সব মানুষের প্রয়োজন মাফিক সম্পদ আহরিত হয় সেহেতু যেকোনো শ্রমিকের মোট প্রয়োজন তার মোট উপার্জনের সমান। অন্য দিকে মানুষের প্রয়োজন তার যোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল। যোগ্যতা বা দক্ষতার নিরিখে শ্রমকে ছয় ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যেমনÑ অদক্ষ, অর্ধদক্ষ, দক্ষ, উচ্চদক্ষ, গণ ও ব্যতিক্রমী। একইভাবে শ্রমিককেও ছয় শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। যোগ্যতার এ ছয়টি ধাপ অনুসারে শ্রমিকের বিশেষ প্রয়োজনও ছয়টি ভিন্ন ধাপে বিভক্ত। বিশেষ প্রয়োজনের ভিন্নতার কারণে সাধারণ প্রয়োজনসহ শ্রমিকের মোট প্রয়োজন ছয়টি ভিন্ন যোগ্যতাভিত্তিক। এই প্রয়োজন ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই শ্রমবাদে শ্রমিকের বেতন নির্ধারণের সূত্র প্রণীত হয়েছে। বেতনের এই সূত্র প্রয়োজনভিত্তিক ও যোগ্যতাভিত্তিক।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে শ্রমবাদের তিনটি সংস্করণ বের হয়। কাজেই বেতনের সূত্রে সত্তরের দশকের অর্থনৈতিক অবস্থা অর্থাৎ তখনকার জাতীয় আয়, মাথাপিছু আয় প্রভৃতি বিবেচনা করে ‘জ’-এর মানকে এক মণ চালের বাজার মূল্যের সমান ধরা হয়েছিল। বর্তমানে আমাদের মাথাপিছু আয় ২০৮০ ডলার। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘জ’-এর মান হবে ৮৩ কেজি চালের বাজার মূল্যের সমান।
বহু আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমদের স্বাধীনতা অর্জিত হওয়া সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত যে আটটি পে-স্কেল ঘোষিত হয়েছে এগুলোর প্রতিটিতে চরম অবিচার পরিলক্ষিত হয়েছে নিম্ন গ্রেডগুলোর ওপর। যেমন অষ্টম পে-স্কেল অনুসারে একজন পিয়নের মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা, যেখানে একজন সিনিয়র সচিবের মূল বেতন হচ্ছে ৮৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ একজন সচিবের মূল বেতনই একজন পিয়নের, মূল বেতনের প্রায় ১১ গুণ। এরূপ স্কেল প্রণয়ন ও অনুমোদনকারীদের ভাবখানা এমন যে, একজন পিয়নের যদি তিন বেলা খাবার দরকার হয় তা হলে সচিবের যেন ৩৩ বেলা খাবার দকার হবে; পিয়ন এক বিছানায় ঘুমালে সচিব যেন ১১টি বিছানায় ঘুমাবেন প্রভৃতি। ন্যায়বিচারবিবর্জিত বেতনবৈষম্য শ্রমবাদের সূত্রের মাধ্যমে দূরীভূত হয়েছে।
আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা শহিদুল্লাহ পাটোয়ারীর সাথে কথা বলে জানা যায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ অর্থ, পরিকল্পনা ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে আন্দোলনকারী সংগঠন, ব্যাংক কর্মচারী ফেডারেশনের ২৬ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সাথে আলোচনায় বসেন। অর্থমন্ত্রী শ্রমবাদে উল্লিখিত বেতনের সূত্রের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণসহ নেতৃবৃন্দের সব বক্তব্য মনোযোগসহকারে শোনেন, শ্রমবাদ ও এ সূত্রের প্রশংসা করেন, শ্রমবাদ পুস্তিকাটিকে তিনবার করে ঠেকান, শ্রমবাদের প্রণেতা অধ্যক্ষ আবদুল হামিদের নাম উল্লেখ করে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান, এটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ ও সংস্থান নিয়ে পর্যালোচনা করেন। সদ্য স্বাধীন দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে তখন থেকে ধাপে ধাপে কয়েক বছরে তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দেন। অক্টোবর মাসেই এ মহান নেতার পদত্যাগ এবং ’৭৫-এর দুর্ভাগ্যজনক পটপরিবর্তনের কারণে তার দেয়া প্রতিশ্রুতি আজো বাস্তব রূপ লাভ করতে পারেনি। বর্তমানে তাজউদ্দীন আহমদের প্রাণপ্রিয় দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। কাজেই একটি দুর্নীতিমুক্ত, শোষণমুক্ত, সুখী-সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং প্রয়াত জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে সরকার শ্রমবাদের আলোকে শ্রমিকের বেতন নির্ধারণে অচিরেই যথাযথ পদক্ষেপ নেবে বলে আমরা আশাবাদী।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি
E-mail-abdulmonem.bgp@gmail.com