১৯৭০ সাল। নভেম্বরের ১২ তারিখ। বাংলা ১৩৭৭ সন ২৬ কার্তিক, রোজ বৃহস্পতিবার এবং রমজানেরও ১২ তারিখ। দশ তারিখ থেকেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। ১১ তারিখ সকাল থেকে সারা দিন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। মধ্যরাত থেকে পূর্ব দিক দিয়ে প্রবল বাতাস বইছিল। ওই আমলে আবহাওয়া অফিসগুলো খুব সতর্ক ছিল না। একটি ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও মহাপ্লাবন যে আমাদেরকে গ্রাস করতে আসতেছে তার কোনো জোরালো আবহাওয়া বার্তা লোকালয় এবং সারা দেশে প্রচারিত হয়নি। অনেকে বলেছেন, ১২ নভেম্বর রাত ১১টার দিকে মহাবিপদ সঙ্কেত দেয়া হয়েছিল বটে; কিন্তু তখন ২৪০ কিলোমিটার বেগে উপর্যুপরি আঘাতে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস দক্ষিণ উপকূলে আঘাত হেনে সব মিসমার করে দিয়ে ওলট পালট তাণ্ডবলীলা প্রায় সমাপ্ত করেছে।
ওই সময় জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় নেমে পড়েছিলাম নৌকার পালে বাতাস ঠেকিয়ে। পটুয়াখালী-৩ আসনে নৌকার প্রার্থীকে জয়যুক্ত করতে আমরা কয়েকজন ছাত্র নেতাসহ তখন উপকূল চষে বেড়াচ্ছি। ১০ নভেম্বর দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে রাঙ্গাবালী, বড়বাইশদা প্রভৃতি সমুদ্র চরগুলোর প্রচারণা শেষ করে দশমিনা থানার তেঁতুলিয়া নদীসংলগ্ন এলাকাগুলোতে প্রচারণা চলছিল প্রার্থীসহ। কিন্তু প্রচণ্ড বাতাসের তীব্রতায় আমরা একটি বাজারের ছোট খালে আমাদের ছোট লঞ্চটিতে স্থান নিলাম তখন রাত ১১টা। সহসা বিক্ষুব্ধ ঢেউয়ের ঝাপটায় লঞ্চটি উল্টে গেল। আমরা বড় গাছে উঠলাম প্রাণ বাঁচাতে। পূর্ণিমার ভরাকাটাল। আবছা আলোছায়ার দোলাচলে মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা ডুবে যাচ্ছে অথৈ পানির অতলে। স্্েরাতের বেগে পাশ দিয়ে কত যে মানুষ ভেসে যাচ্ছে আর বলছে বাঁচাও বাঁচাও। যে মহাপ্রলয়! ইয়া নাফসি ইয়া নাফসিÑ প্রাণের চেয়ে কিছু নাই ভাবছি।
এ বাঁচা মরা অবস্থায় রাত ২টার দিকে বাতাসের প্রচণ্ডতা কমতে থাকল। সহসা ভোর হয়ে গেল। আমাকে প্রচারযান লঞ্চটিতে করে বাড়ি পৌঁছে দিলো। বাড়ি এসে জ্ঞানশূন্য হয়ে গেলাম। এটি কি আমাদের বাড়ি! কিয়ামতের ময়দানে যেরূপ মানুষ নিজেদের অবস্থান অবস্থা ঠিক করতে পারবে না, আমারও জাগতিক চেতনা তদ্রƒপ হলো। শত শত মানুষ যে গ্রামের বাড়িতে ছিল সেখানে তখন একটি ভৌতিক পরিবেশ। উপড়ে পড়া গাছপালা জলে ডুবে আছে। মানুষ আর গবাদিপশু, হাঁস-মোরগ ইত্যাদির মৃত বহর দেখে বিমূঢ় হয়ে ভিটিতে বসে পরলাম অচেতন অবস্থায়। রাতে না খেয়ে রোজা রেখেছি। কোথাও কোনো মানুষের অস্তিত্ব নেই। শুধু দূরে দূরে অবিশ্রান্ত কান্নার রোল তীব্র হিমেল বাতাসে কানে আসছে।
তখনো আকাশে ঘনকালো চাপামেঘ, আর উত্তরের হিমশীতল বাতাস প্রবহমান। ভেজা জামা কাপড়ে পরিবারের হারিয়ে যাওয়া ১০ জন মানুষের খোঁজ নেয়ার সম্বিত সহসা ফিরে পেলাম। তখন বেলা ৩টা, হাতঘড়িটা খোয়া যায়নি। শূন্য বাড়ির দু-একটা দাঁড়ানো গাছের অগ্রভাগে তাকিয়ে দেখি খড়কুটোর স্তূপ। অনুমান করলাম পানি ১৫-২০ হাত স্ফীত হয়েছিল বিক্ষুব্ধ ঢেউয়ে। নেমে পড়লাম মা-বাবা, ভাই-বোনদের লাশের খোঁজে। সন্ধ্যা অবধি খুঁজে পেলাম মাকে অদূরে একটি মান্দার গাছের সাথে (কাঁটাযুক্ত) ডালে দীর্ঘচুল পেঁচানো অবস্থায়। পরীক্ষা করে দেখলাম শ্বাস আছে। শীতের তীব্রতায় জ্ঞান বিলুপ্ত। চট করে তাকে গাছ থেকে নামিয়ে কাঁটা তুলতে লাগলাম। তক্তা পেতে তার গা ঘেঁষে আমার শরীরের তাপ দিতে থাকলাম। প্রত্যুষে গলাচিপা বন্দর থেকে লেপ তোষক এনে ও ব্যথানাশক ওষুধ সংগ্রহ করে গায়ের কাঁটা তুলে কিছুটা সুস্থ করা হলো এবং পরে দু-তিন দিন খুঁজে হাজারো লাশ নেড়েচেড়ে বাবা ও ভাইবোনসহ ঘরের ১০ জনকে বিক্ষিপ্তভাবে ধানক্ষেতে, জঙ্গলে পেয়ে তাদের কাছাকাছি স্থানে কাফন ছাড়াই কোনো মতে একা একা মাটি খুঁড়ে ওই অবস্থায় কবর দেয়া হলো। অবশ্য বাবার জন্য সামান্য কিছু কাপড় পাওয়া গিয়েছিল দাফনের জন্য।
বাড়িতে অন্য ২৬ জন মানুষের মৃতদেহ শেষমেশ সারিবদ্ধভাবে সেনাবাহিনীর সহায়তায় গোরে রাখার ব্যবস্থা হলো। এত বেশি ধ্বংসযজ্ঞ সাধিত হয়েছিল গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, ভোলা, চট্টগ্রাম, কুতুবদিয়া, মহেষখালী, নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চল ও খুলনার নিম্নাঞ্চল যা ভাষায় বর্ণনা দুরূহ ব্যাপার। মোট কথা দেশের দক্ষিণ দিকের জেলাগুলোর উপকূলীয় এলাকা বিরান ভূমিতে পর্যবসিত হয়ে ছিল। বিশ্ব সাহায্য সংস্থাগুলো মড়কের ছবি দেখে আঁতকে ওঠে। শুরু হয় পর্যাপ্ত রিলিফ বিতরণ। স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে বিশ্বের প্রায় অনেক দেশ এগিয়ে এলো পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশে) সাহায্য-সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণ করে। বুলগেরিয়ার মেডিক্যাল টিমের সাথে আমাদের মেডিক্যাল টিমও কাজ করতে দেখা গেছে একসাথে। কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক একযোগে উপকূলে এসে ছিলেন সমব্যথার ব্যথী হয়ে।
আমি তখন আইএ ক্লাসে পড়ি। দাদা ভাই রোকনুজ্জামান খানের প্রেরণায় নবম শ্রেণী থেকেই ছড়া-কবিতা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। কবি জসীমউদ্দীনের বাসায় (পলাশ বাড়িতে) প্রায়ই যাতায়াত ছিল। সেই সুবাদে উপকূলে আসা কবি সাহিত্যিক সাংবাদিকদের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। কোনো এক মেডিক্যাল টিমের সাথে এসেছিলেন কবি সুফিয়া কামাল, তার সাথে এসেছিলেন কন্যা সুলতানা কামালও এই গলাচিপা উপকূলে। কবি সুফিয়া কামালের সাথে অনেক কথা হয়। তিনি ঢাকায় গিয়ে পত্রিকায় লিখেছিলেন আমাদের দুর্দশার কথা। কবি জসীমউদ্দীন এসেছিলেন বস্ত্র ও গরম কাপড় বিতরণকারী একটি দলের সাথে। মন্ত্রী সবুজ খানও (এম এ সবুর) এসেছিনে ওই দলের সাথে। আমাকে অনেক সান্ত্বনা দিয়ে গেছেন।
সরকারিভাবে এ দিনটিকে জাতীয় শোক বা দুঃখের দিবস হিসেবে পালন করা হয় না। কারণ পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্য প্রতি বছর মাগফিরাত কামনা করার অনুষ্ঠান হতো তাতে। ৮০০ কিলোমিটার বঙ্গোপসাগরের তটসম্বলিত উপকূল বরাবর এলাকায় এক সাথে প্রায় বাড়িতে বা নদীকূলে ৩০-৪০টি করে সারিবদ্ধ কবরগুলো বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছে কালের আবর্তে। কেউ জিয়ারত করতে এখন আর আসে না। যদি ১২ নভেম্বরকে একটি স্মরণীয় দিন হিসেবে জাতীয়ভাবে ঘোষণা করা হতো তবে ওই দিন সলিলসমাধি বরণকারীদের জন্য মসজিদে মসজিদে দোয়া হতো। কিন্তু এখন কি স্বজনরা ছাড়া কেউই পালন বা স্মরণ করে সেই ভয়াল ১২ নভেম্বরের মহাপ্রলয়ে মৃত্যুবরণকারী পাঁচ লাখ মানুষের কথা? হ
লেখক : সাবেক ব্যাংকার