সব দেশেই সরকারি কর্মচারীদের চাকরি গ্রহণের সময় তাদের কাজের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শৃঙ্খলাবদ্ধ চলাফেরা এবং নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করার নিয়ম-কানুন সংবলিত কতগুলো বিধি-উপবিধিসহ আইন তাদের পড়ানো হয়ে থাকে। সেখানে তারা জানতে পারেন, তাদের প্রজাতন্ত্রের কাজকর্ম কী নিয়মে সম্পন্ন করতে হবে। আর সেই নিয়ম-কানুন মেনেই তাদের চাকরি করতে হবে। নিয়মবহির্ভূত কিছু করলে যেকোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি চলে যাবে এবং সাজা ভোগ করতে বাধ্য থাকবেন। এই আইনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হচ্ছেÑ কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত থাকতে পারবেন না। ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিÑ এ সবই আইনে অপরাধ বলে উল্লেখ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ওই আইন ও নিয়ম অনুযায়ী যদি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি করেন তা হলে প্রজাতন্ত্রে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে না এবং আর্থিক ক্ষতি হতে পারে না।
বাংলাদেশে আজ ঢালাওভাবে বিভিন্ন থানার ওসিদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হচ্ছে। মামলার সন্দেহজনক আসামি হচ্ছেন জেলা পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা এসপি এবং কোনো কোনো ডিআইজিও। কেন এমন শুরু হলো? এর প্রধান কারণ হলো, তারা সরকারি কর্মচারীবিধি অমান্য করছেন। সেই সাথে সরকারে থাকা বা সরকার পরিচালনাকারী দলটি বা দলগুলো তাদেরকে দলীয় ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার করছে। দলীয় সরকার প্রজাতন্ত্রের সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করছে। আর এ কাজটি করতে গিয়ে সরকারি কর্মচারীরা সরকারি দলের লেজুড় হয়ে অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ছেন। এতে তাদের ভয়ভীতির বালাই তো নেই-ই উপরন্তু পুরস্কারস্বরূপ জুটছে প্রমোশনও।
দেশ আজ দুঃশাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত। দলের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে দেশের এমন কোনো সরকারি দফতর নেই যেখানে দুর্নীতির আখড়া গড়ে উঠেনি। এসবই হয়েছে কারণ, সরকার পরিচালক রাজনৈতিক দলটি কর্মচারীদের কাছ থেকে অবৈধ সাহায্য নেয়ার ফলে জাতীয় নির্বাচনকে কথিত নির্বাচনে পরিণত করতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন এক লাফে দ্বিগুণ করেছে সরকার। তার ফলে সরকারি কর্মচারীরা দলটির প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছেন। দলটির নেতারা যেসব অপকর্ম করার ইচ্ছে পোষণ করছেন সরকারি কর্মচারীরা তা করে দিচ্ছেন, বিনিময়ে তারা সুযোগ-সুবিধাও নিয়ে নিচ্ছেন।
ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগে অনেক তেলেসমাতি কর্মকাণ্ড ‘আবিষ্কৃত’ হয়েছে। এসব সরকারি কর্মচারীদের একার পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। এটা সম্ভব হয়েছে সরকার পরিচালনাকারী দলটির নেতাদের নরম হাত কর্মচারীদের মাথার ওপর থাকার কারণেই। প্রজাতন্ত্রের নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা আজ কেবল কথার কথা। হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা আজ অর্থের বিনিময়ে পেতে হয়। রোগীদের দেয়ার জন্য অনেক ওষুধ হাসপাতালে দেয়া হলেও তাদের ভাগ্যে তা খুব কমই জুটে থাকে। বেশির ভাগ ওষুধই কর্তৃপক্ষ বাইরের ফার্মেসিগুলোতে বিক্রি করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে চলেছে। এমন বহু অন্যায় সরকারি হাসপাতালে চলে থাকে। সেখানে নিয়মিতভাবেই ‘নিয়োগবাণিজ্য’ চলে আসছে। এ বিভাগের কিছু কর্মকর্তা ঘুষ গ্রহণ করে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে থাকে। এমন আরো অনেক কিছু ঘটছে।
নগরে যারা বসবাস করে তারা সবাই জানে, সিটি করপোরেশনগুলোর প্রশাসনে যারা থাকেন, তারা কত ধরনের অপরাধ করে থাকেন। নিত্যদিন রাস্তায় চলতে গিয়ে কোনো নাগরিক রাস্তায় হকারের যানজটে পড়েন না, তা আমার জানা নেই। পথেঘাটে বেপরোয়া যানবাহন চলাচল এবং রাস্তায় হকারদের পসরা নিত্যদিনের একটি সমস্যা। এ সব কিছু দেখার দায়িত্ব কি সিটি করপোরেশনের নয়? কিন্তু তারপরও ঢাকা শহরজুড়ে কিভাবে ফুটপাথ এবং রাস্তায় বাজার বসে? এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্য, থানার পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর বখরা না খেলে কি কোনোভাবে সম্ভব হকারদের পক্ষে বাজার বসানো? দেশ আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, সেখান থেকে ফিরে আসতে হলে শক্ত হাতের একটি সরকার প্রয়োজন। এ সরকার প্রথমেই সব বিভাগের ঘুষখোর দলীয় ক্যাডার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঢালাওভাবে চাকরিচ্যুত করতে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পারবে। তবে সরকারকে হতে হবে শতভাগ স্বচ্ছ। তার থাকতে হবে পূর্ণ ধর্মীয় অনুভূতি। আল্লাহ ও পরকালের ভয় থাকতে হবে তাদের। তবেই তারা পারবে দেশকে এই চরম দুর্নীতি আর অনিয়ম থেকে টেনে তুলতে।
সর্বোপরি বলছি, দেশ ও জাতির এই চরম দুঃসময়ে সবার আত্মিক চিকিৎসার বড়ই প্রয়োজন। মানুষের দেহের বা শরীরের চিকিৎসা ডাক্তার করে থাকেন কিন্তু আত্মার চিকিৎসা হয় না। এ দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষেরই আত্মা অসুস্থ। চাকরিজীবীর আত্মা অসুস্থ সচিব থেকে পিয়ন পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে। অফিসে গিয়েই ঘুষের ধান্ধা করা তাদের আত্মাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। অনেকে নামাজ-রোজা যা করে তা লোক দেখানো মাত্র। কেননা নামাজ-রোজা করার আগে তারে হালাল রিজিক গ্রহণ করার বিধান রয়েছে ইসলাম ধর্মে। কিন্তু ঘুষ বা অবৈধ উপার্জন কোনোভাবেই হালাল হতে পারে না। ঘুষের টাকা খেয়ে নামাজ-রোজা করলে সেটা কি লোক দেখানো নয়? কারণ এসব কাজে আল্লাহ সন্তুষ্ট হতে পারেন না।
রাষ্ট্রের কর্ণধার জনগণের ভোটের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে দিনের ভোট আগের রাতেই প্রশাসনের সহযোগিতায় নিজের দখলে নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নেয়া হচ্ছে। তা সম্পূর্ণরূপে অন্যের হক নষ্ট করার দৃষ্টান্ত। ফলে তার নামাজে কী সুফল দেবে? ওই ‘ক্ষমতাধর’ রাষ্ট্রের তহবিল থেকে যে মাসোহারা নিচ্ছে তাতো কোনোভাবেই হালাল হতে পারে না। তার কারণেই রাষ্ট্রের জনগণ কষ্ট ভোগ করতে বাধ্য। অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব। আর সে অন্যায়কারী যদি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিও হয়, তবুও। এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের দেশের জনগণ কি অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে? সাধারণত করছে না বরং অন্যায়কারীকে অনেকে বাহবা দিয়ে যাচ্ছে। অন্যায়কারীর হাতে প্রশাসন রয়েছে; গুলি, বন্দুক রয়েছে, সন্ত্রাসী ক্যাডার রয়েছে; প্রতিবাদ করলে হেনস্তা হওয়া থেকে জীবনও চলে যেতে পারে। কিন্তু না, ওদের ভয় করে লাভ নেই। এই পার্থিব জীবন তো নেহায়েতই ক্ষণকালের; অনন্তকালের জীবন রয়েছে পরকালে। তাই অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে যদি জীবন দিতে হয় দাও তা হলেও তো পরকালে রয়েছে বিরাট পুরস্কার। এখানে জীবন গেলে পরপারে যে বিরাট সুখময় জীবন পাবো এটা কেন আমরা বুঝি না? এ দেশে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিছু লোক তাতে জীবনও দিয়েছে। ফলে আন্দোলনকারীরাই জয়ী হয়েছেন এবং যারা জীবন দিয়েছে তারাও অমর হয়ে আছেন। এ বিষয়টি এ দেশের জনগণকে বুঝতে হবে। ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরির ফাঁকে আন্দোলনে নামতে হবে। তবেই দেখবেন, সফলতা এসে ধরা দেবে। হাত গুটিয়ে বসে থাকলে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না।
এবার আসি কিছু হাদিসের কথায়। মানুষের আত্মা কত অসুস্থ, তা রাস্তায় দাঁড়িয়ে পুরুষগুলোর পরা প্যান্ট ও লুঙ্গির দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। রাসূল পাক সা: বলেছেন, ‘টাখনুর নিচে পুরুষের পোশাক পরা হারাম, যে বা যারা পরবে তাদের মৃত্যুর পর টাখনুর নিচে আগুন লাগিয়ে দেয়া হবে।’
এবার বলতে হয়, সামাজিক মহা ব্যাধি সুদ সম্পর্কে কিছু কথা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘আমি সুদকে করেছি হারাম আর ব্যবসাকে করেছি হালাল।’
এ থেকেই বোঝা যায়, সুদ কত খারাপ জিনিস। রাসূল পাক সা: বলেছেন, ‘সুদের দাতা, গ্রহীতা ও দলিল লেখক এই তিনজনই সমান অপরাধী।’ সুদের সাজা সম্পর্কেও অনেক ঘোষণা রয়েছে হাদিসে। দু-একটি কথা এখানে তুলে ধরছি মাত্র। সুদের রয়েছে অনেক শাস্তি, মৃত্যুর পর তাকে জীবিত করে দুর্গন্ধময় রক্তের সাগরে ফেলে দেয়া হবে, ওই সাগরে সুদখোর হাবুডুবু খেতে থাকবে; নাক-মুখ দিয়ে ওই দুর্গন্ধপূর্ণ রক্ত তার পেটে প্রবেশ করতে থাকবে, আর তীরে দাঁড়ানো ফেরেশতারা চার দিক থেকে তার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করতে থাকবে। তাই সবার বোঝা দরকার, সুদের সাথে জড়িতদের কত বড় ভয়ঙ্কর সাজা হবে। তাছাড়া সুদখোরের ইবাদত কবুল হবে না; তার কোনো দোয়াই কবুল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে সুদ বর্জন না করবে এবং তা করে তাওবা না করবে। রাসূল পাক সা: বলেছেন, ‘কিয়ামতের একটি আলামত হবে যে, বিশ্বব্যাপী সুদের ব্যাপক প্রসার ঘটবে।’ এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়Ñ সুদখোরের অপরাধ কত বড়। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন প্রতিটি মানুষের আত্মার চিকিৎসার। বেশি প্রয়োজন দেহের মধ্যে বসে থাকা আত্মার চিকিৎসার। শুধু আত্মিক চিকিৎসায়ই মানুষ তার পূর্ণ মনুষ্যত্ব ফিরে পেতে পারে। আর মনুষ্যত্ববিহীন মানুষ তো শয়তানেরই অনুসরণ করে থাকে। হ
সব দেশেই সরকারি কর্মচারীদের চাকরি গ্রহণের সময় তাদের কাজের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শৃঙ্খলাবদ্ধ চলাফেরা এবং নিজ নিজ দায়িত্ব পালন...
