করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে সারা বিশ্ব নতুন স্বাভাবিক (নিউ-নরমাল) যুগে প্রবেশ করেছে। উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত সব দেশ অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ধারণা করা হয়েছিল, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো ‘কোভিড-১৯’-এর জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং হয়েছেও তাই। কিন্তু আপাতত মনে হচ্ছে বাংলাদেশ অভাবনীয়ভাবে এই মহামারী মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছে। চলতি অর্থবছরে মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ ভারতকে টপকে যাবে। আইএমএফের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ৪ শতাংশ বেড়ে এক হাজার ৮৮৮ ডলারে উন্নীত হতে পারে। অন্য দিকে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি সাড়ে ১০ শতাংশ কমে এক হাজার ৮৭৭ ডলারে নামবে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যা গত চার বছরে সর্বনিম্ন। জিডিপি প্রবৃদ্ধি জন্য বাংলাদেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে।
বাংলাদেশ যে করোনাকালেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পিছিয়ে নেই তা অভ্যন্তরীণ প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় সুস্পষ্ট। ঢাকা শহরে এখন করোনা-পূর্ববর্তী সময়ের মতো ট্রাফিক জ্যাম হচ্ছে। শপিংমল বা বিপণিবিতানে ক্রেতারা গিজ গিজ করছে। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদে প্রায় সব ধরনের প্রতিষ্ঠান শুধু খোলেইনি; স্বাভাবিকভাবে চলছে। যা আমাদের মতো স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের জন্য সময়ের সবচেয়ে বড় সুখবর। বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের একাগ্রতায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশের অর্থনীতি। অথচ ভারতসহ পাশের দেশগুলো ধুঁকছে। বাংলাদেশ যে বেশ কিছু দিন থেকে উন্নয়নের মহাসড়কে আছে তা করোনা ভ্যাকসিন বৈশ্বিক বাজারে বাজারজাত করার প্রক্রিয়ায় সুস্পষ্ট। চীন বলেছে, কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে। ভারত বলেছে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে। অতিসম্প্রতি যুক্তরাজ্য বলেছে, বাংলাদেশ করোনা ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে। অন্য সুপার পাওয়ার দেশগুলোও করোনা মহামারী মোকাবেলায় এবং অর্থনৈতিক অন্যান্য ক্ষেত্রে এ দেশকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ভেবে দেখুন, বিষয়টি আমাদের জন্য কতটা আনন্দের! একসময় যারা আমাদের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বা অন্যান্য খারাপ তকমা দিয়ে ‘ভূষিত’ করেছিল; তারাই এখন বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং অর্থনীতির নানা প্রস্তাব নিয়ে আমাদের দেশে বিনিয়োগের চিন্তাভাবনা করছে।
অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখতে চীন ও ভারতের সাথে আমাদের সুসম্পর্ক ধরে রাখতে হবে। চলমান চীন-ভারত রেষারেষি ও সামরিক দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ সরকারকে খুব কৌশলী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দেশের স্বার্থ অটুট রাখতে হবে। কারণ দেশের স্থিতিশীলতার জন্য ভারতের সাথে ভালো সম্পর্ক যেমন দরকার, তেমনি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উন্নতির জন্য আপাত চীন হতে পারে সবচেয়ে ভালো বিকল্প। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বড় বড় প্রকল্প যেমনÑ পদ্মা সেতু, র্যাপিড মাস ট্রানজিট প্রকল্প, পায়রা সমুদ্রবন্দরসহ নানা প্রকল্প চীনের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় এগিয়ে চলেছে। চীন এখন অর্থনৈতিক পরাশক্তি যারা খুব দ্রুত আমেরিকাকে টপকে বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। তাই আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য নানা ধরনের উন্নয়নের প্যাকেজ চীনের পক্ষে দেয়া যতটা সহজ, ভারতের পক্ষে ততটা সম্ভব নয়। কারণ ভারত অর্থনৈতিকভাবে নিজেরাই উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। তাদের অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য চীনের ওপর নির্ভর করতে হয়। চীন-ভারত সম্পর্কের চরম অবনতির সময়েও ভারত চীনের কাছ থেকে আগের চুক্তি অনুযায়ী সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার লোন নিয়েছে। ভারতের প্রযুক্তি, খেলাধুলা, শিল্প-কারখানার কাঁচামাল বেশির ভাগ চীন থেকে আসে। চীনকে বাদ দিয়ে এসব ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা আনতে ভারতের অনেক দিন লেগে যাবে।
যা হোক, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আমাদেরকে গুরুত্ব দেয়ার মূলে কিন্তু অবহেলা-অযতেœ দিন দিন বড় হতে থাকা অর্থনীতি। করোনা আমাদের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তবে করোনা এখন বিশ্ববাজারে কোনো কোনো দেশ এবং প্রতিষ্ঠানের কাছে লাভজনক ব্যবসায়! বললে অত্যুক্তি হবে না। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেউলিয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়া ওষুধ কোম্পানি করোনাসংক্রান্ত ওষুধ ও মেডিক্যাল সামগ্রী বানিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং হাজার হাজার ডলার মুনাফা করছে। ধুঁকতে থাকা মোবাইল অপারেটর কোম্পানি ও ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান করোনায় লকডাউনের সময় অভাবনীয় লাভের মুখ দেখেছে। করোনাকালে ভারতের মুকেশ আম্বানির সম্পদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৪৫০ কোটি ডলার। করোনা মহামারীর মধ্যে বড় ধনীরা যখন সম্পদ হারাচ্ছেন, তখন মুকেশের এ সাফল্যের কারণ মনে করা হচ্ছে তার কোম্পানি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান করোনা মহামারীর প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে ‘সকাল-বিকেল’ ধসে পড়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল। সেই বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ এখন ৪০ বিলিয়ন ডলার, যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। প্রবৃদ্ধিতে খুব বেশি প্রভাব পড়েনি। বিশ্বের হাতেগোনা যেসব দেশ প্রবৃদ্ধির ভালো পর্যায়ে আছে তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি করোনাকালের মধ্যেও সাড়ে ৬-এর বেশি থাকবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। তবে দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশের বেসরকারি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করোনার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মতো আচরণ করছে। অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কথা বলে অনেক শিক্ষককে বেতন দিচ্ছে না। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে সেশন ফি, অনলাইন পরীক্ষা, ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যথারীতি বেতন-ফিস তুলছে। শিক্ষকদের বেতন না দেয়াটা অত্যন্ত অন্যায়। এদেশের অনেক বেসরকারি শিক্ষক আছেন যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন দিয়ে সংসার চালিয়ে থাকেন এবং ছেলেমেয়েদের কলম-খাতা, স্কুল-কলেজের ফিস পরিশোধ করেন। তারা এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ঢাকা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হয়েও অনেকে বেতন না পেয়ে লকডাউনের সময় সরকারি ত্রাণ সহায়তা গ্রহণ করে সংসার চালিয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকে শহরের বাড়ি ভাড়া দিতে না পেরে নিরুপায় হয়ে বাসা ছেড়ে দিয়ে, পরিবারসহ গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন। তারা আশায় বুক বেঁধে আছেনÑ কবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্লাস শুরু হবে এবং বেতন পেয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আবার স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করবেন। সরকারের এ বিষয়টিতে নজর দেয়া জরুরি । কারণ এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদে সব প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবে চলছে এবং চাকরিজীবীরা কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন। সরকারের উচিত শিক্ষকদের বেতন নিশ্চিত করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও দায়িত্ববোধের আওতায় আনা।
সরকারের বিরোধীরা পর্যন্ত স্বীকার করেন, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় চীন ও জাপান যদি বাংলাদেশে বড় আকারের বিনিয়োগ করে; তবে সমগ্র এশিয়ার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে যাবে বাংলাদেশ। এর প্রভাব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। রাশিয়া অনেক আগেই সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে চীন বা আমেরিকার চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে। আমেরিকার অবস্থা আগের মতো নয়Ñ তার বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ ক্ষয়িষ্ণু। সামরিক শক্তি দিয়ে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে তারাও অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে না। তাই বিশ্ব অর্থনীতি আগামী দিনে এশিয়াই নিয়ন্ত্রণ করবে। নেতৃত্ব দেবে চীন। ভারতের সম্ভাবনাও বেশ উজ্জ্বল। তবে সে দেশে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতার দ্বিতীয় মেয়াদে এসে কিছুটা খেই হারিয়েছেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ভারতে। যদি ভারত সার্বিক উন্নয়নের কথা বিবেচনায় নিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখার ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়, তবে তারা ঘুরে দাঁড়াবে। কারণ তাদের রয়েছে বিশ্বের ছয় ভাগের এক ভাগ নিজস্ব বাজার। আর পাশের দেশ উন্নয়ন করলে তার প্রভাব আশপাশের দেশগুলোতে পড়ে। যেমন মেক্সিকো আমেরিকার অর্থনীতি ব্যবহার করে এগিয়ে গেছে। ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ একে অন্যের সহায়তায় উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। ফলে ইউরো মুদ্রা, পার্লামেন্ট, অন অ্যারাইভল ভিসা সুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয় চালু হতে পেরেছে। করোনার শিক্ষা নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর উচিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের আলোকে সার্ককে আবারো গতিশীল করে প্রতিবেশী দেশের সাথে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক উন্নত করা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে মনে রাখতে হবে, বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে এককভাবে কেউ উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। বর্তমান সরকারসহ সর্বমহল ও জনগণকে একটা বিষয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতির কারণে সারা বিশ্বে অগ্রাধিকার পেতে শুরু করেছে। এ দেশের অমিয় সম্ভাবনার দ্বার যখন থেকে উন্মোচন হতে শুরু করেছে তখন থেকেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আমরা ষড়যন্ত্রের শিকার। ভবিষ্যতে আরো কঠিন পরিস্থিতি আসতে পারে। এ জন্য আমেরিকা, ভারত, চীন, যুক্তরাজ্যসহ বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। আপাতত ভারত ও চীনের সাথে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সজাগ থাকতে হবে। কূটনৈতিক তৎপরতায় অদক্ষ এবং কোথায় আমাদের স্বার্থ নিহিত তা বুঝতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জনগণ প্রত্যাশা করে, বর্তমান সরকার কূটনৈতিক ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অন্য দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে। কারণ এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। হ
লেখক : এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষক, গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট কলেজ।
করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে সারা বিশ্ব নতুন স্বাভাবিক (নিউ-নরমাল) যুগে প্রবেশ করেছে। উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত সব দেশ অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ধারণা করা হয়েছিল, বাংলাদেশের...
