আমরা জানি বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় শয্যার চেয়ে রোগীদের সংখ্যা ঢের বেশি। রোগীর আত্মীয়দের জন্য ব্যবস্থা তো অনেক দূরের কথা! ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তিদের থাকা নিয়ে যতটুকু না আপত্তি তার চাইতে বেশি অভিযোগ আসে ডাক্তার-কর্মকর্তা এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে। সিনিয়র ডাক্তারদের কেবল সকাল বেলাই পাওয়া যায়। অপরদিকে কর্তব্যরত যেসব ইন্টার্ন ডাক্তার থাকেন- তারা কেবল সিনিয়রদের প্রেসক্রিপশন দেখে চিকিৎসা দেয়া ছাড়া জরুরি অবস্থায় রোগীদের কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত, সে স¤পর্কে অনেকেই অজ্ঞাত। বিভিন্ন পরীক্ষা করার ব্যবস্থাও চরমভাবে সীমাবদ্ধ। যেসব যন্ত্রাংশ সংরক্ষণ করা রয়েছে; সেগুলো হয় অচল নয়তো বা পরীক্ষা করা বন্ধ রয়েছে। এখানেই আরম্ভ হয় ভোগান্তির! টেস্টগুলো করার জন্য দৌড়াতে হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, যেখানে প্রত্যেকটির ফি থাকে সুউচ্চ। পাশাপাশি ফলাফল কতটুকু নিরাপদ তা নিয়েও থাকে নানান সংশয়! এটি একটি মহানগরে অবস্থিত সরকারি হাসপাতালের ইতিবৃত্ত।
যদি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে আলোচনা করা হয়, সেখানে একটি রোগীর অবস্থান খুব বেশি ঘাবড়ানোর মতো না হলেও বিভাগীয় শহরে নিয়ে যাওয়ার সুপারিশ করা হয়। এ হাসপাতালগুলো কেবল প্রাইমারি চিকিৎসা দেয়ার মতোই কাজ করে। অথচ সেসব জায়গায় যদি পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম সরবরাহ করা থাকত, তাহলে সাধারণ মানুষকে বিভাগীয় শহরের হাসপাতালগুলোতে ভিড় জমাতে হতো না। যানবাহন ও অর্থের জোগান দিয়ে তবেই শহরের হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হতে হয়। ফলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে অনেকেই মৃত্যুবরণ করেন। এমন বিশ্লেষণ করার একমাত্র উদ্দেশ্য- আমাদের কাঠামোগত উন্নয়ন হলেও মান উন্নয়ন তেমন হচ্ছে না।
যদি কৃষি খাত নিয়ে সূক্ষ্ম পর্যালোচনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে আমাদের প্রতি বছর বিভিন্ন কাঁচামাল দ্রব্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ভারত থেকে পেঁয়াজ আনা কোনো নতুন ঘটনা নয়। কয়েক মাস আগে পেঁয়াজ সমাচার নিয়ে কেমন লঙ্কাকাণ্ড হয়ে দাঁড়াল এটাও সবার জানা। পাশাপাশি, বাজারে আলুর সঙ্কট ও উচ্চ দাম নিয়েও জনগণ ভুগছে দীর্ঘ দিন ধরে। সরকার কর্তৃক দাম নির্ধারণ করার পরও এর আয়ত্ত করা যায়নি। এর অন্যতম কারণ, কৃষকরা কী পরিমাণ উৎপাদন করলে চাহিদার তুলনায় বেশি কিংবা কম হবে সে স¤পর্কে ধারণা না থাকা। এটি জানিয়ে দেয়ার দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসকদের। এর জন্য সঠিক জায়গায় উপযুক্ত লোক বসানোও জরুরি। এখন উপজেলা পরিসংখ্যান অধিদফতরের দায়িত্বে যদি পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থীকে না দিয়ে বাংলা বিভাগের অনভিজ্ঞ শিক্ষার্থীকে নিয়োগ দেয়া হয় যিনি পদটি স¤পর্কে অনভিজ্ঞ- সে ক্ষেত্রে উৎপাদনে সুষম বণ্টন সম্ভব নয়। সুতরাং যতটুকু স¤পদ অথবা দখলদারি আমাদের রয়েছে তার যথাযথ ব্যবহার করা এবং তার মান উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।
সরকারের প্রত্যেকটি বিভাগ বা অধিদফতরে এমন অগণিত উদাহরণ দেয়া যাবে। যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় স¤পর্কে বলতে হয়- তাহলে বোর্ড পরীক্ষা, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস বহু পুরাতন সমালোচনার বিষয়। এর মধ্যে গণহারে মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন পাওয়ার নজির এ দেশে রয়েছে। কোনো কিছু যদি ‘বিসমিল্লায় গলদ’ হয় তাহলে সুদূর ভবিষ্যতে কী হবে তা আসলেই চিন্তার বিষয়। একজন অযোগ্য শিক্ষার্থী যখন দুর্নীতি করে ডিগ্রি নিয়ে ডাক্তার কিংবা প্রশাসনের বড় কর্মকর্তা হবেন- তখন স্বাভাবিকভাবেই তার দ্বারা অনিয়ম, অপকর্ম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি জাতির জন্যও ভয়ঙ্কর কাল হয়ে উঠতে পারে। মেডিক্যাল কলেজে অযোগ্য শিক্ষার্থী গ্রহণের উপলক্ষটি ভাবলে যে কেউ সেটি ধারণা করতে পারবেন।
যেহেতু শিক্ষা খাত নিয়ে প্রসঙ্গ এসেছে, সেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করতেই হয়। বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক দলের কতটা আশ্রয় নিতে হয় এ নিয়ে ইতোমধ্যে পত্রপত্রিকা, গোলটেবিলে অনেক পর্যালোচনা হয়েছে। চাকরি গ্রহণের পর সেই শিক্ষকের যখন শিক্ষা দেয়ার কাজটি মুখ্য না হয়ে রাজনীতি চর্চাই প্রধান হয় তখন তার অনুসারী অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের মাঝেও এমন বিরূপ প্রভাব ফেলে। তারাও আগামীতে তাদের জায়গায় পদার্পণের উদ্দেশ্যে ওমন পথ অনুসরণ করবে; কল্পনা করাই যায়। সুতরাং এই নিয়মে চললে শিক্ষক বাড়িয়ে যতটুকু না প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন করা যায়- তার চেয়ে যারা আছেন তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব। এর মানে এই নয়, আমি নতুন শিক্ষক বাড়ানোর বিপক্ষে।
এটি গেল একটি প্রতিষ্ঠানের জনবলের ব্যাপারে। এখন যদি গবেষণা নিয়ে বর্ণনা করি তাহলে একই সুরে বলতে হয়- মান উন্নয়ন জরুরি। গত বছরে লন্ডনভিত্তিক শিক্ষাবিষয়ক সাময়িকী, ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’-এ বিশ্বের বিশ্ব্যবিদ্যালয়গুলোর যে র্যাংকিং প্রকাশ করে তাতে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান এক হাজারের পরে। তারা পাঁচটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে ওই সূচক নির্ধারণ করে থাকে। প্রথমত খ্যাতি জরিপ। যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে সমসাময়িক গবেষকরা কিভাবে মূল্যায়ন করেন তা নির্ধারণ করা হয়। দ্বিতীয়ত গবেষণা আয়। যার মাধ্যমে গবেষণার গুরুত্ব ও মান নির্ধারণ করা হয় এবং গবেষণার পরিমাণ অর্থাৎ ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কী পরিমাণ উন্নতমানের গবেষণাপত্র প্রকাশ করছে তার ওপর। কিন্তু গবেষণার উন্নতকরণ নিয়ে বিগত বছরগুলোতে নানান বিতর্ক হলেও তেমন কোনো পরিবর্তন এখন পর্যন্ত আসেনি। এর পেছনের কারণ প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাব নয়তো বা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব। অথচ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা বৃদ্ধি পেলে শুধু সেই প্রতিষ্ঠানের মানেই উন্নয়ন হবে না বরং দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও ব্যাপক অবদান সাধন হবে। আমরা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাবনা দিচ্ছি, কিন্তু অভ্যন্তরীণ কলকব্জা শক্ত করার জন্য তেমন জোর দিচ্ছি না।
চিকিৎসা, কৃষি ও শিক্ষা এই তিনটি সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশকে উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে যেতে হলে এসবের সঠিক মূল্যায়নের বিকল্প নেই। পর্যালোচনা করলে অন্যান্য শাখাগুলোতেও এমন সীমাবদ্ধতা বেরিয়ে আসবে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে অতীতের চেয়ে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। অনেক দেরিতে হলেও একাত্তরের যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশ, বিশ্বে এখন অন্যতম মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। সামনে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ভারতকে পেছনে ফেলছে, আরো অনেক প্রত্যাশাও করছেন অর্থনীতিবিদরা। গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ, পাকা রাস্তাঘাট, সেতুসহ সামাজিক অগ্রগতির দিকে আমরা ধাবিত হচ্ছি। নারীদের কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষায় প্রবেশে আমাদের অর্জন রয়েছে। কিন্তু উন্নয়নে যেভাবে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন হয়ে আসছে, এতে করে এর ফল খুব বেশি টেকসই হয় না। আমাদের বিকল্প চিন্তা করাও জরুরি। অর্থনীতির ভাষায় যাকে ‘বিকল্প পরিকল্পনা’ বলা হয়ে থাকে। সঠিক কর্ম-পদ্ধতিই পারে দেশের কাঠামোগত ও মানোন্নয়ন উভয়ই সুনিশ্চিত করতে।
লেখক : সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম
লেখক ফোরাম