জীবন উপভোগ করতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলা যেন এক ভয়ঙ্কর খেলা। মাদকের বিষাক্ত ছোবলে হারায় জীবন, হারায় তারুণ্য। সাময়িক সুখের আশায় সবকিছু শেষ করে দিয়ে অজান্তে নিজেই হারিয়ে যায় পৃথিবী থেকে। কোন পথে আমাদের তারুণ্য? এ প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ। ভয়ানক মাদক এলএসডিতে আসক্ত পাঁচ তরুণ গ্রেফতার হওয়ার পর থানাহাজত কিংবা আদালতের এজলাসে নির্বিকার হাসি দিয়ে কী জানান দিয়েছে? এর মানে তাদের অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গেছে। বিবেকের দরোজা তালাবদ্ধ। সমূহ বিপদের সামনে দাঁড়িয়েও তারা অনুভূতিহীন। জীবনের উদ্দেশ্য কী তা তারা ভুলে গেছে। সমাজবিজ্ঞানী, সমাজনেতাসহ চিন্তাশীল মানুষ মাদকের নিত্যনতুন প্রকরণ এবং তার বিস্তার দেখে হতচকিত, চিন্তান্বিত। আগামী প্রজন্ম সম্পর্কে উদ্বিগ্ন।
সমাজ-সংস্কৃতির দেহে নিত্যনতুন রোগ বাসা বাঁধছে। করোনা মহামারীর ভয়াবহতা বিশ্ববাসীকে ভাবিয়ে তুলছে। এর মধ্যে দেশে এলএসডি নামক মাদকের থাবা সমাজদেহের জন্য কম আতঙ্কের নয়। সমাজে অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। এক সময় অশিক্ষিত, অর্ধ-শিক্ষিত বেয়াড়া যুবক-তরুণরা লুকিয়ে চুরিয়ে মাদক সেবন করত। কিন্তু বর্তমানে নিত্যনতুন মাদকের বিস্তার ঘটছে। নতুন মাদকে আক্রান্ত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া তরুণরা। এদের বেশির ভাগই ধনীর দুলাল। তাদের পোশাক, বাচনভঙ্গি বলে দিচ্ছেÑ মাদকে আসক্ত হওয়ার পেছনে ভোগবাদিতাও একটি বড় কারণ। নতুন এ মাদকের নেশায় আসক্ত হওয়ার তরুণদের আদালতে তোলার পর সরকারের পক্ষের আইনজীবী যে বক্তব্য দিয়েছেন তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ‘এসব তরুণ পরিবারের সীমাহীন অর্থ-বিত্ত আর প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে ভয়হীন। তারা ভাবছে, বাবার অগাধ অর্থ অতি অল্প সময়ে তাদের মুক্তি নিশ্চিত করবে।’ তবে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, মাদকের প্রভাবেই তারা ভয় ও অনুভূতিহীন হয়ে গেছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যু এবং তার দেহে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন দেখে।
ওই ছাত্রের লাশ পাওয়া যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের পেছনে। শরীরে অনেক আঘাতের চিহ্ন দেখে অনেকেই ভেবেছিল, আততায়ীর হাতে সে খুন হয়ে থাকতে পারে। সুঠাম দেহ, সুন্দর চেহারার ছবি দেখে ভাবতেই অবাক লাগে তাকে কেউ খুন করতে পারে! পরে অনুসন্ধানে উঠে আসে ভয়ানক তথ্য। তাকে কেউ খুন করেনি। সে নিজেই আত্মহত্যা করেছে। ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের জেরে সামনে আসে তরুণদের মধ্যে এলএসডি বা লাইসার্জিক অ্যাসিড ডায়েথিলামাইড ব্যবহারের প্রবণতার খবর। পুলিশের তথ্যানুযায়ী, ছাত্রটি বন্ধুদের সাথে এলএসডি সেবনের পর একজন ডাব বিক্রেতার দা নিয়ে নিজেই নিজের গলায় আঘাত করেন। পুলিশ আরো যেসব তথ্য দেয় তা হচ্ছেÑ বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি চক্র এই মাদক কেনাবেচার সাথে জড়িত। এছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই মাদক বিক্রির তথ্যও জানানো হয়। এদিকে মাদক বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএসডি গ্রহণ করে ভুল রাস্তা দেখে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া, বাড়ির জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়া বা অহেতুক আতঙ্কিত হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার বেশ কিছু ঘটনা নথিবদ্ধ রয়েছে।
আলোচিত মাদকের বর্তমান উপাদানের সাথে যে বিষয়টি আলোচনায় যুক্ত হয়েছে তা হচ্ছে ধনীর দুলালরা এতে আসক্ত হচ্ছে বেশি। জীবনে যাদের আর কিছু পাওয়ার নেই। সুখ-সম্ভোগের সব উপায় উপকরণ যাদের হাতের নাগালে। গুলশান, বারিধারা, বনানী, উত্তরা আর ধানমন্ডির অভিজাত এলাকার এসব তরুণ সুখের পায়রা খুঁজে বেড়ায়। জীবনে সব কিছু ভোগ করার পর আলোচিত মাদকে আসক্ত হওয়ার পর মৃত্যুই তাদের কাছে সমাধান মনে হয়। এ জন্য তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় এই করোনাকালীন সময়ে ক্ষুধার্ত বুভুক্ষু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। দুমুঠো অন্যের জন্য গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা অসংখ্য মানুষ আবার গ্রামে ফিরে গেছে। জীবনের রূঢ় বাস্তবতায় তারা বুঝতে পেরেছে শহরের ইট-পাথরের মাঝে কেউ কারো নয়। তাদের অনুভবে, ভাতের থালায় বুভুক্ষু হৃদয়ের হাহাকার ছাড়া কিছুই খুঁজে পায়নি। এর মাঝেও এক শ্রেণীর মানুষ বিপুল অর্থ ব্যয়ের রাস্তা খুঁজে পায় না। তাদের আদরের দুলালরা তাদের চোখের সামনেই বখে যাচ্ছে। তারা কিছু বলতে পারে না, কারণ সুখ খোঁজার নামে তারাও কেনো হোটেল কিংবা বারে সময় ব্যয় করে।
বাংলাদেশে বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেশি। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেখানে পড়া মানে নিজেকে অভিজাত ভাবতে শেখা। পড়ালেখার মানের চেয়ে খরচের হার এগুলোতে বেশি। স্বাভাবিক কারণেই বিত্তশালী পরিবারের সন্তানরা সেখানে পড়তে যায়। তাদের জীবনাচার, সংস্কৃতি, সভ্যতা সবকিছুতে পশ্চিমা ভাবধারা প্রকাশ পায়। যার সাথে আমাদের দেশের সংস্কৃতির কোনো মিল পাওয়া যায় না। করপোরেট পুঁজির দৌরাত্ম্য অনেক কিছু দিলেও আমাদের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। করপোরেট পুঁজির হাত ধরে অনেকগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। তারা সার্টিফিকেট এবং পুঁথিগত বিদ্যার একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করতে পেরেছে। কিন্তু পুঁজিবাদ এবং ভোগবাদী শিক্ষাই তারা দিয়ে যাচ্ছে। ফলে অবাধ স্বাধীনতার সুযোগে ওইসব তরুণ সাময়িক সুখের আশায় মাদকাসক্ত হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে জীবন থেকেই।
এর মূল কারণ, জীবনের মূল্যবোধ উপলব্ধি করতে না পারা। পরিবার কিংবা প্রচলিত শিক্ষা তাদেরকে সে শিক্ষা দিতে পারেনি। জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে তাদের সামনে কোনো আদর্শ উপস্থাপিত হয়নি। নৈতিক চরিত্র গঠনের মতো বিষয়গুলো তাদের জীবনাচারে যুক্ত হতে পারেনি। শুদ্ধ-সহজ জীবন ও চরিত্র গড়তে পারে এমন বিষয়গুলোর সাথে তারা যুক্ত হওয়ার সুযোগ কমই পেয়েছে। খাও দাও, ফুর্তি করো, জীবন উপভোগ করোÑ ত্রিমাত্রিক এ মিথের বাইরে কোনো দর্শন তাদের জীবনে অধরা থেকে গেছে। আমাদের সমাজ সংস্কৃতিতে এবং শিক্ষায় যে দর্শনগুলো কাজ করে তা মানব জীবনের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রেই তরুণদের অনবহিত রাখে। জীবনের উদ্দেশ্য তো সেটাই যে উদ্দেশ্যে স্রষ্টা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তাকে একটি পরিচয় ও মর্যাদা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।
স্র্রষ্টা কেন মানুষ সৃষ্টি করেছেন? এ জন্য যে, মানুষ তার স্র্রষ্টার দাসত্ব করবে। এর মাধ্যমেই নিজ জীবনের মূল্য উপলব্ধি করতে শিখবে। এই লক্ষ্যে স্র্রষ্টার পক্ষ থেকে গাইডলাইন দেয়া হয়েছে। তাতে মানুষের দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে জানানোর পাশাপাশি তাকে সতর্ক করা হয়েছেÑ দুনিয়ার এ জীবনই সব নয়, আরো সুন্দর জীবন তার জন্য অপেক্ষা করছে। মানুষের জীবন বল্গাহীন নয়, তার প্রতিটি কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। এ অনুভূতি জাগ্রত থাকলে সে মাদকের মাঝে সুখ খুঁজতে পারে না। এ সম্পর্কে আল্লাহর ঘোষণা, ‘আর প্রত্যেক মানুষের ভালো-মন্দ কাজের নিদর্শন তার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছি; আর কিয়ামতের দিন আমরা তার জন্য একটি কিতাব (আমলনামা) বের করে দেবো যা সে পাবে উন্মুক্ত অবস্থায়। তুমি তোমার কিতাব পাঠ করো; আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশের জন্য যথেষ্ট।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ১৩-১৪)
ভয়ঙ্কর মাদকের কবল থেকে আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে তাদের সামনে জীবনের প্রকৃত দর্শন এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা তুলে ধরতে হবে। আদর্শিক এবং নৈতিক শিক্ষা বাড়াতে হবে। মাদকের বিস্তার রোধে আইন আরো কঠোর ও প্রায়োগিক করতে হবে। পরিবারে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় অনুশাসন পালনের মোটিভেশন দিতে হবে। হ
