বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান, অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে। শুধু আইন পরিপালন নিশ্চিত করা আর অপরাধ প্রতিরোধ বা দমনই নয়, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ বাহিনীর সদস্যরা তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা আর পেশাদারিত্ব দিয়ে অপরাধ মোকাবেলায় প্রতিনিয়ত সৃজনশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন। বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল সময় ১৯৭১ সাল।
পুলিশ বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বলা হয়। এই বিভাগ যেকোনো দেশ ও জাতির একটি স্থায়ী সম্পদ। তারা আইন ও নীতি-নৈতিকতার ব্যাপারে উচ্চতর স্থানে থাকার কথা। অথচ সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে পুলিশের কিছু সদস্য বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ প্রবণতা এতই বাড়ছে যে, সহকর্মীরাও যৌন হয়রানি, ধর্ষণ থেকে ছাড় পাচ্ছে না। কেউ কেউ হত্যা, ধর্ষণ ও ডাকাতির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে চাঁদাবাজি ও মাদকের সাথে সম্পৃক্ত থাকা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। অনেকের ধারণা, পুলিশের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে এটি ঠিক নয়। এই প্রবণতা আগেও ছিল, এখনো আছে। আগে গণমাধ্যমে আসত না, এখন আসছে। আগে সেভাবে খেয়াল রাখা হতো না, এখন রাখছে। ফলে বিষয়টি সামনে চলে আসছে।
দেশের পুলিশ বাহিনী ব্রিটিশ নিয়মেই চলছে। এর সংস্কার হওয়া খুবই জরুরি। সংস্কার না হওয়ার অন্যতম কারণ পুলিশকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হয়। পুলিশের মধ্যে এমন কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতা আসেনি যে তারা নিজের উদ্যোগেই সংস্কার করবে। দেশের অর্থনীতি যেভাবে বেড়েছে তাতে পুলিশের মধ্যে অনৈতিভাবে অর্থ উপার্জন করার প্রবণতাও বাড়ছে। অনেকেই অল্প দিনে ধনী হতে চান ফলে তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।
আমাদের পুলিশকে ভাবা হয় দুর্বিনীত ও ভয়ঙ্কর। এই বাহিনীতে যারা আছেন তারা সবাই খারাপ এমন নয়। তবে যারা ভালো তারা কোণঠাসা। কিন্তু বাকিদের মন-মানসিকতা তেমন উন্নত নয়। বেশ বড় অংশ ঘুষ ও দুর্নীতিতে লিপ্ত । সেবার চেয়ে হয়রানি ও পেরেশানির অভিযোগই বেশি পাওয়া যায়। প্রায়ই এ ধরনের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মনে আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। পুলিশের হওয়ার কথা বিপদে মানুষের আস্থার আশ্রয়স্থল। কিন্তু কিছু পথভ্রষ্ট পুলিশ সদস্যের জন্য সমস্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী আজ অপদস্থ, অবিশ্বাসীতে পরিণত হয়েছে । তাদের ভালো কাজ, ভালো উদ্যোগ চাপা পড়ে যাচ্ছে।
পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলেই তাদের কারো কারো ক্ষেত্রে বিভাগীয় মামলা হয়, কারো ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলা হয়। শাস্তির মাধ্যমে যদিও তাদের বোঝানো হয়, অপরাধ করলে পার পাওয়া যায় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো- পুলিশে অপরাধ কমছে না, বাড়ছে প্রতিদিন।
অপরাধবিজ্ঞানীরা মনে করেন, ‘পুলিশে জবাবদিহিতার অভাবেই এ পরিস্থিতি। এটি কমাতে হলে দায়িত্বশীল অফিসারদেরও জবাবদিহিতা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’
প্রায় সোয়া দুই লাখ সদস্য নিয়ে পুলিশবাহিনী গঠিত। বছরে পুলিশের বিরুদ্ধে ২৫ হাজারের মতো অভিযোগ জমা পড়ে সদর দফতরে। আর গড়ে দুই হাজার পুলিশের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতিসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। পুলিশ সদর দফতরের সিকিউরিটি সেল ও আইজিপির বিশেষ সেলে সরাসরি অভিযোগ করা যায়। আর আদালতে বা থানায় ভুক্তভোগী সরাসরি মামলাও করতে পারেন। তাতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু বাস্তবে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করা কি অত সহজ!
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ অন্যায় অনৈতিক কাজের কারণেই সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এর সুযোগ নিচ্ছে বিভিন্ন অপরাধীরা বা অপরাধী গোষ্ঠী। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে বা তাদের সহযোগিতায় প্রকাশ্যেই সব বেআইনি অপরাধ করে যাচ্ছে।
পুলিশের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ পুলিশ সদর দফতরে আসে তার মধ্যে রয়েছে- হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই, নির্যাতন, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টা, যৌন হয়রানি, ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া, চাঁদাবাজি, মাদক কারবারের মতো অপরাধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে অনেকেই নানাভাবে দ্রুত আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে, আবার অনেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে বেপরোয়া হয়ে নানা অপরাধ করছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ, পোস্টিং ও পদোন্নতির কারণেই এমনটি হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।
একশ্রেণীর অসাধু পুলিশ সদস্যের নানা অপকর্ম, অনিয়ম ও অপরাধের কারণে সরকারি এ সংস্থাটি এখন নানা প্রশ্নের মুখে। বিভিন্ন অনৈতিক ও অপরাধমূলক ঘটনায় পুলিশের পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কেন জন্ম নিচ্ছে সেটি একটি প্রশ্ন। সময় এসেছে তাদের প্রশিক্ষণে কোনো ঘাটতি আছে কি না, খতিয়ে দেখার। এ ধরনের ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি করে। এটি খুবই বিপজ্জনক।
অপরাধী যেই হোক, অপতৎপরতা-অনৈতিক থেকে পুলিশ বিভাগকে মুক্ত করার জন্য শক্তিশালী জবাবদিহির ব্যবস্থা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়াও যুগোপযোগী আইনেরও প্রয়োজন। প্রয়োজন আইনের সংস্কার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা যদি অনৈতিক কাজ করে আর শাস্তি যদি ১০০ টাকা হয় অপরাধ দমন তো হবেই না, বরং উৎসাহিত হবে। আর অপরাধ দমনের দায়িত্বে নিয়োজিতদের মধ্যে যারা নিজেরাই অপরাধে লিপ্ত হয়, তাদের শাস্তি অধিকতর কঠোর হওয়া দরকার।
নচেৎ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থানকে দৃঢ় করে গড়ে তোলার জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রদত্ত এবং জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল কর্তৃক প্রণীত জাতীয় কৌশলগত যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে ‘রূপকল্প ২০৪১’সহ সব উন্নয়নই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাতি হিসেবে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবো। কোনো পরিকল্পনাই সফলতা পাবে না।
বাংলাদেশ পুলিশ দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছে দীর্ঘ দিন থেকে। অথচ ঘুষ, অনৈতিক, দুর্নীতির কারণে অভিযুক্ত এই বাহিনী তার পেশাদারিত্ব হারাচ্ছে। জনগণের প্রতি তার দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে জনগণের গর্বের বাহিনীতে পরিণত করতে হবে ।
লেখক : উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা, সাদার্ন ইউনিভার্সিটি
বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান, অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে। শুধু আইন পরিপালন নিশ্চিত করা...
