দেশের অনেক থানা-ফাঁড়ির বহু পুলিশ সদস্য মাদক, গাঁজা, ইয়াবা প্রভৃতি দিয়ে সাধারণ মানুষ, তরুণ সমাজ ও ক্ষুদ্র দোকানদারদের ফাঁসিয়ে টাকা পয়সা আদায় করছে; আবার যারা সত্যিকার অর্থে মাদকাসক্ত বা অপরাধী তাদের ধরে টাকা-পয়সার বিনিময়ে ছেড়েও দেয়া হচ্ছে। বিষয়টি আপনি জানেন কি? আপনাকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের দৈনন্দিন অপরাধ-অপকর্ম ও ঘটনা ঘটে থাকে; তা সর্বদা জানানো হয় কি না, তা জানি না। এই সে দিন গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে ঢাকার সূত্রাপুর থানার দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। (সম্ভবত ১৯ বা ২০ জুন ২০২১) রাজধানীর শ্যামপুর থানার পুলিশ সিএনজি নিয়ে অলিগলি টহল দেয়ার সময় আমি যে ফ্ল্যাটে বসবাস করি সেই বিল্ডিংয়ের ডেভেলপার কোম্পানির সুপারভাইজারসহ অনেককে আইজিগেট থেকে গাঁজার পুঁটলিসহ আটক করে। সুপারভাইজারের মোবাইলের মাধ্যমে সেই পুলিশের সাথে ঘটনার সত্যতা যাচাই করার জন্য কথা বলি। পুলিশ বলে, ‘গাঁজাসহ আপনাদের লোককে আটক করেছি এবং ওকে থানায় নিয়ে যাচ্ছি’। বিবেকবান বা সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি লোকটিকে ছেড়ে দেয়ার জন্য পুলিশকে অনুরোধ করিনি। কারণ আমি নিজেও প্রকৃত অপরাধীর শাস্তির পক্ষে। কিন্তু ঘটনার এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ তার পকেট থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা এবং তার অফিসের বসকে ডেকে নিয়ে আরো আট হাজার টাকা সর্বমোট ৯ হাজার ৩০০ টাকা নিয়ে পোস্তগোলা শ্মশানঘাট থেকে ছেড়ে দেয়। পোস্তগোলা ফাঁড়ির এহেন কার্যকলাপ নিয়ে থানায় বহু অভিযোগ করলেও লাভ হয়নি। আপনিই বলুন, এ ক্ষেত্রে অপরাধী কে? এসব ঘটনা সচরাচর পুরান ঢাকার থানা ও পুলিশ ফাঁড়িগুলোতে বেশি ঘটে এবং ঢাকার বাইরের জেলার থানাগুলোতে এ ধরনের অপরাধের মাত্রা চরমে। থানা-পুলিশ যেসব সোর্সের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে তারা নিজেরাই মাদক আসক্ত এবং থানার লিস্টেড আসামি। একশ্রেণীর পুলিশের আচরণ দেখে জনগণ হতবাক। অস্ত্রধারী হয়ে ও পুলিশের পোশাক পরিধান করে তাদের যে চাঁদাবাজি, জুলুম-নির্যাতন, প্রচুর মিথ্যা কথা বলা, প্রতারণা, দাপট, হুমকি-ধমকি, জবরদখল, হয়রানির মতো ঘটনা সব কিছুই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও অবগত থাকার কথা। তবে সৎ, দক্ষ, ভদ্র ও নিষ্ঠাবান ক্যাডার পুলিশ অফিসাররা এ ধরনের ঘটনার জন্য লজ্জিত ও ব্যথিত। অনেক ক্ষেত্রে তারাও অসহায়। এই করোনার সময় পুলিশের ভূমিকা চমৎকার। তবে একশ্রেণীর বেপরোয়া পুলিশের কর্মকাণ্ডে পুলিশের সুনাম ও অর্জন আজ ক্ষতিগ্রস্ত। কিছু বিপথগামী পুলিশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ নতুন কিছু নয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আবার পুলিশকে দিয়ে তদন্ত করার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণত নাগরিক হিসেবে সুষ্ঠু বিচার পাওয়া দুষ্কর। সময় সময় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অভিযোগকারীকে ডেকে নিয়ে স্বাক্ষর রেখে অভিযোগ ‘নিষ্পত্তি’ করেন বলে পুলিশের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয় না। দেশে সাধারণ মানুষ ক্ষমতাহীন। কিছুসংখ্যক পুলিশের অন্যায়, অবিচার, হয়রানি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার মতো সৎ সাহস থাকলেও ঝামেলা ও স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন বা সোর্স দিয়ে হুমকি-ধমকি দেয়ায় মানুষ এখন আর পুলিশের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পারতপক্ষে কোনো অভিযোগ করে না। তবে দিন দিন জনগণের ক্ষুব্ধতা বাড়ছে। পারতপক্ষে থানার ওসিরা এখন আর ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বা পুলিশ সুপারের কাছে জবাবদিহি করার প্রয়োজন মনে করেন না। সর্বত্র রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো ও তদবিরের জোরে পুলিশের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির ওপর আঘাত করা হচ্ছে। পুলিশ জনগণের বন্ধু কিন্তু সে বন্ধু কোনোভাবেই টাকা-পয়সার বিনিময়ে নয়। গোটা দেশের পুলিশ খারাপ নয়, শুধু পুলিশের একটি ক্ষুদ্র অংশ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য সরকার ও পুলিশের সব ভালো অর্জন ও সুনাম ক্ষুণœ করছে। এ ক্ষেত্রে থানা-পুলিশের মুভমেন্ট বা তাদের চলাফেরার ওপর পুলিশের এসপি/ডিসি/এডিসির সার্বক্ষণিক তদারকি জোরদার করতে হবে। এখনো থানাগুলোতে জিডি করতে গেলে প্রাথমিকভাবে হয়রানি করা হয়ে থাকে। এর এক তিক্ত অভিজ্ঞতার সাক্ষী আমি নিজেই। বিশেষত ওসিদের দাপট ও দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। থানায় থানায় ভদ্র ও ভালো ব্যবহারকারী ওসিদের পোস্টিং দিলে ভালো হয়। তাদের দক্ষ ও মানসম্মত পুলিশ কর্মকর্তা হতে হবে। পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা এখনো আছে। বিপদে পুলিশকে কাছে পেলে মানুষ সন্তুষ্ট। যেমন ৯৯৯-এর মাধ্যমে জনগণ পুলিশের যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়ে খুশি। পাশাপাশি থানা ও পুলিশ ফাঁড়ির ওপর নজর বাড়ানো উচিত।
আশা করি, পুলিশের মধ্য থেকে সততা ও নিষ্ঠাবান বন্ধু ভাই-পুলিশদেরকে জনগণের সামনে নিয়ে আসতে সহযোগিতা করবেন। হ
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী