কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। পুরুষের পাশাপাশি এগিয়ে যাচ্ছে নারীরাও। সরকারি-বেসরকারি চাকরি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব জায়গায় এখন নারীরা কর্মরত। পাশাপাশি নানা ধরনের সমস্যায়ও তারা পড়ছেন। কিছু ক্ষেত্রে তারা এখনো বৈষম্যের শিকার। উল্লেøখযোগ্য সমস্যা হলো যৌন হয়রানি। শারীরিক, মৌখিক, মানসিকÑ বিভিন্নভাবে একজন নারী যৌন হয়রানির শিকার হতে পারেন। নারীর নিরাপত্তার বৈষম্য আজকাল খুব বাজেভাবে চোখে পড়ছে। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি নারীদের কাছে নতুন কিছু নয়। নিজের কর্মস্থলে এর থেকে তিক্ত অভিজ্ঞতা কি আর হওয়া সম্ভব? বসের ফণা তুলে ফোঁসফোঁস করা, শিক্ষকের ভক্ষকের মতো আচরণ যে নারী একবার দেখেছেন, তিনিই জানেন কত কুৎসিত তাদের দৃষ্টি, কত জঘন্য তাদের ভাষা, কতটা হিং¯্র তাদের স্পর্শ। চক্ষুলজ্জা ও চাকরি হারানোর ভয়ে অনেকে এ বিষয়ে রিপোর্ট করেন না। তার মানে এই নয় কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি হচ্ছে না। যৌন হয়রানি হতে পারে মৌখিক, লিখিত আবার হতে পারে শারীরিক। অশ্লীল কৌতুক, ফোনে বা ইমেইলে কু ইঙ্গিত, অপ্রীতিকর স্পর্শ, কাজের ছুতোয় শারীরিকভাবে হেনস্তা করাÑ আরো অনেক কিছুই এর মধ্যে পড়ে।
কর্মজীবী নারী ও কেয়ার বাংলাদেশের এক সমীক্ষায় বেরিয়ে এসেছে আরেক তথ্যÑ বাংলাদেশের ১২ দশমিক ৭০ শতাংশ নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হন। প্রকৃতপক্ষে সংখ্যাটি আরো অনেক বেশি। শুধু যারা নিজে এগিয়ে এসে কর্মক্ষেত্রে নিপীড়নের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন, তাদের নিয়ে করা হয়েছে এই সমীক্ষা।
তারা নিজেরাও বলেছেন, তাদের মতো আরো অনেকে আছেন যারা মুখ খোলেননি। আর সংখ্যায় তারাই গরিষ্ঠ। অবাক করা ব্যাপার হলো, পুলিশে কর্মরত নারী সদস্যদেরও এমন জঘন্য অভিজ্ঞতা হয়েছে। তারা মুখ খোলার সাহস পাননি। কারণ অপরপক্ষ বেশি ক্ষমতাবান ছিল। মুখ খুললে হয়তো বড়কর্তা দোষটা দেবেন তারই ঘাড়ে। ২০১৭ সালে কনস্টেবল হালিমা বেগম এক পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টরের হাতে ধর্ষিত হন। তার আত্মহত্যার পর বেরিয়ে আসে এসব তথ্য। ক্ষমতার বিভাজনে (চড়বিৎ উুহধসরপং) একটি বড় বিভেদ আছে কর্মক্ষেত্রে। পুরুষমাত্রই বেশি শক্তিশালী, তাদের ক্ষমতাও বেশিÑ এরকম ভুল ধারণা বিরাজমান সবার মধ্যে। এমন অনেক পুরুষ কর্মী আছেন যারা ভাবেন, আমি যা খুশি তাই করতে পারি, দুর্বল নারী সহকর্মী কি আর এমন বাধা দেবে। অনেক নারীও নিজেকে শক্তিহীন ভেবে চুপ থাকেন। দুটি বাজে কথা বা ইঙ্গিতে তারা অন্য ব্রাঞ্চে বদলির আবেদন করেন, কিন্তু মুখ খুলে অভিযোগ করেন না। চাকরি হারানোর ভয় তো থাকেই। উচ্চ পর্যায়ে কর্মরত নারীরাও রেহাই পান না। করোনা মহামারীকালীন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও গার্লস অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্সের সহায়তায় ওই জরিপ পরিচালনা করে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম।
জরিপের তথ্য উপস্থাপন করে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক নাছিমা আক্তার জলি বলেন, গবেষণার জন্য নমুনা হিসেবে ২০টি প্রশ্ন সংবলিত একটি প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে তথ্য সংগ্রহকারী দলের মাধ্যমে জরিপ কার্যক্রমটি পরিচালনা করা হয়। প্রাথমিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ৩৯০ জন নারীর একটি তালিকা তৈরি করা হয় (র্যান্ডম স্যাম্পলিং)। পরবর্তীতে এই জরিপটিতে যৌন হয়রানি শিকার হয়েছেন এমন ১৩৫ জন কর্মজীবী নারী অংশগ্রহণ করেন। গবেষণা কার্যক্রমটি পরিচালিত হয় এই বছরের জুলাইয়ে।
নাছিমা আক্তার জলি বলেন, অংশগ্রহণকারী ১৩৫ জন নারীর শতভাগই নিজ কর্মস্থলে কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানান। তাদের মধ্যে ৪১ দশমিক ৪৮ শতাংশ দুই-তিনবার, ২৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ নারী চার থেকে পাঁচবার এবং ২২ দশমিক ৯৬ শতাংশ নারী একবার করে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
১৩৫ জনের মধ্যে ৬১ জন শারীরিক স্পর্শের মাধ্যমে (৪৫ দশমিক ১৯ শতাংশ), ৮০ জন মৌখিকভাবে (৫৯ দশমিক ২৫ শতাংশ)। সরাসরি যৌন আবেদনের শিকার হয়েছেন ৬৪ জন অর্থাৎ ৪৭ দশমিক ৪১ শতাংশ নারী। এ ছাড়া ৬০ জন (৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ) সুপারভাইজার দ্বারা, ৮৮ জন (৬৫ দশমিক ১৯ শতাংশ) ম্যানেজার/বস কর্তৃক, আটজন (৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ) নারী তাদের নিয়োগকর্তার দ্বারা হয়রানির শিকার হয়েছেন।
জরিপে বলা হয়, উত্তরদাতাদের একটি বড় অংশ অর্থাৎ ৮৯ জন জানেনই না কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বিষয়ক নীতিমালা থাকা প্রয়োজন বা এ সম্পর্কে হাইকোর্টের একটি গাইডলাইন আছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী মধ্য থেকে ১১৮ জন (৭৯ দশমিক ৪০ শতাংশ) মনে করেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি সমন্বিত আইন প্রয়োজন। শতকরা ৮৫ দশমিক ১৯ নারী বলছেন, আইন হলেই হবে না; এটি যথাযথভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে শাস্তির বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। এ পর্যন্ত যতগুলো শ্যাডো রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে সবগুলোতেই বারবার জানতে চাওয়া হয়েছে, ২০০৯-এর আদেশনামার সঠিক বাস্তবায়ন এখনো হয়নি কেন। উত্তর কারো জানা নেই। এখন দরকার একটি যথোপযুক্ত আইন। আর যতদিন না নতুন আইন পাস হচ্ছে, ১১ পয়েন্টের প্রত্যেকটির বাস্তব জীবনে যথাযথ প্রয়োগ সুনিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি অফিসে নারীবান্ধব কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য আলাদা কমিটি থাকতে হবে। এই কমিটির শুধু নামের কমিটি হলে চলবে না, নিয়মিত শুনতে হবে কারো কোনো অভিযোগ আছে কি না। পক্ষপাতদুষ্টতা বাদ দিয়ে সবাইকে যদি এই কমিটির পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা যায় তাহলেই কর্মক্ষেত্রে নারীর যৌন হয়রানির বিপক্ষে দাঁড়ানো সম্ভব হবে। হ
কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। পুরুষের পাশাপাশি এগিয়ে যাচ্ছে নারীরাও। সরকারি-বেসরকারি চাকরি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব জায়গায় এখন নারীরা কর্মরত। পাশাপাশি নানা ধরনের সমস্যায়ও তারা পড়ছেন। কিছু...
