যৌতুককে নারী নির্যাতনের মূল কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই কুপ্রথা থেকে নারীদের বাঁচাতে রয়েছে আইন; তবু যৌতুকের করালগ্রাস থেকে মুক্তি মেলেনি দেশের নারীসমাজের। যৌতুকের কারণে নারী নির্যাতনের কোনো সঠিক হিসাব আমাদের নেই। দৃষ্টির অগোচরে থেকে যায় নারী নির্যাতনের অনেক করুণ কাহিনী। ইউএনডিপির এক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৫০ শতাংশ বিবাহিত নারী যৌতুকের কারণে শারীরিক অথবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। আমরা নারীর ক্ষমতায়ন বা নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার যে দাবি করি, উপরের তথ্যটি যদি সঠিক হয়, তবে তা এক ভিন্ন বাস্তবতার সাক্ষ্য দেয়।
নতুনরূপে অভিনব কৌশলে বর্তমান সময়ে যৌতুকের আবির্ভাব। টিভি, ফ্রিজ, মোটরসাইকেল, সোনার গয়না ও নগদ টাকা সবই আছে যৌতুকের তালিকায়। পারিবারিক মর্যাদা অনুযায়ী যৌতুকের তালিকায় কিছু রদবদল হয় শুধু। দরিদ্র পরিবারে যেখানে ২০ বা ৪০ হাজার টাকায় যৌতুকের দাবিদাওয়া শেষ, সেখানে একটি ধনী পরিবারে যৌতুক হিসেবে চাওয়া হতে পারে কয়েক লাখ টাকা থেকে শুরু করে ফ্ল্যাট বা বাড়ি, গাড়ি পর্যন্ত। যৌতুক দিতে না পারার অপরাধে নারীদের তালাক দেয়া বাংলাদেশে একটি অতি পরিচিত ঘটনা। যৌতুকের দাবি মেটাতে না পারায় এমনকি খুনেরও শিকার হচ্ছে নারী। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে সারা দেশে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয় ৩০ জনকে, নির্যাতিত হন ৪৪ জন। আইনে নারীর প্রতি সব ধরনের নির্যাতন ও নিষ্পেষণই নারী নির্যাতনের অন্তর্ভুক্ত। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, ধর্মীয়, পারিবারিক, রাষ্ট্রীয় ও এমনটি কর্মক্ষেত্রেও নারীর প্রতি যেকোনো ধরনের নির্যাতন বা বৈষম্য আরোপ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে যেকোনো নির্যাতন বন্ধে আইন থাকাই শেষ কথা নয়। আইনের প্রয়োগ ও সচেতনতা ছাড়া কোনো আইনই কার্যকর হতে পারে না। মানুষের সচেতনা ও সম্পৃক্ততা ছাড়া আইনের সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। সে কারণেই দেশে যৌতুকবিরোধী আইন থাকার পরও যৌতুকের ঘটনা কমছে না। কমছে না যৌতুকের কারণে নারী নির্যাতন।
যৌতুক ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে প্রচুর মামলাও হচ্ছে; কিন্তু সে মামলার নিষ্পত্তির হার ও নতুন মামলা রুজু হওয়ার মধ্যে ব্যাপক ঘাটতি বিদ্যমান। ফলে প্রতি বছরই অনিষ্পন্ন মামলার সাথে যোগ হচ্ছে আরো নতুন মামলা। সৃষ্টি হচ্ছে মামলাজট। মামলাজটের আরো কারণের মধ্যে আছে- সাক্ষীর অভাব, আসামির সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব, আইনজীবীদের যথাযথ পদক্ষেপের অভাব ইত্যাদি।
যৌতুক দেয়া-নেয়া দু’টিই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যৌতুকের কারণে কোনো নারীকে শারীরিক নির্যাতন, জখম বা মৃত্য ঘটানো হলে সে ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া জখম বা শারীরিক অন্যান্য নির্যাতনের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ নানা ধরনের শাস্তির বিধান তো আছেই। এ শাস্তি কেবল প্রত্যক্ষ নির্যাতনকারীরই নয়, পরোক্ষভাবে যারা এতে সহায়তা করেন বা মদদ দেন তারাও শাস্তির আওতায়।
নারী নির্যাতন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার বিষয়টি এখন আর কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় সীমার মধ্যে আবদ্ধ নেই। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। পৃথিবীর সব রাষ্ট্রেই নারী নির্যাতনের শিকার হয়। সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনেরই প্রাথমিক শিকার হয় নারী ও শিশুরা। হোক তা শান্তি বা যুদ্ধাবস্থা। ১৯৯৩ সালে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে নারী নির্যাতন যে মানবাধিকারের লঙ্ঘন সে বিষয়টি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের একীভূত দৃষ্টি থেকে নারীকে পৃথক দৃষ্টিতে দেখার প্রয়োজন ছিল। প্রায় ৩০ বছরের প্রচেষ্টার ফলে ১৯৭৯ সালে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ করার সনদ গ্রহণ করা হলো, যা ওই পৃথক দৃষ্টিতে নারীকে দেখার চেষ্টারই ফল। রাষ্ট্রগুলো সে সনদ গ্রহণ ও স্বাক্ষর করল। অতঃপর প্রয়োজন দেখা দিলো নারীর চোখে বিশ্বকে দেখার; কিন্তু নারীকে দেখার বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
যৌতুককে নারী নির্যাতনের মূল কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই কুপ্রথা থেকে নারীদের বাঁচাতে রয়েছে আইন; তবু যৌতুকের করালগ্রাস থেকে মুক্তি মেলেনি দেশের নারীসমাজের। যৌতুকের...
