ভারতের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে দিল্লির নীতি বুঝতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির আত্মোপলব্ধি খতিয়ে দেখতে হবে। অর্থাৎ এ অঞ্চলে ও বিশ্বে ভারত নিজেকে কীভাবে বিবেচনা করে, নিজের কী ভূমিকা সে দেখতে চায় তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের মূল্যায়নগুলো তৈরি হতে থাকে মূলত ২০০১ সালের পর থেকে। যখন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায়, বিশেষ করে ২০০৫ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিগুলো প্রতিবেশীদের প্রতি দেশটির নীতিনির্ধারণ করে দেয়। ২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। জোটসঙ্গী হয় ইসলামপন্থীরা, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী। যার ফলে ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা তাদের অস্বস্তি লুকানোর কোনো চেষ্টাই করেননি। ২০০২ সালে খালেদা জিয়ার বেইজিং সফর ও চীনের সাথে একটি প্রতিরক্ষাবিষয়ক সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর এই অস্বস্তি আরো বাড়িয়ে দেয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা হয় যে, এই ঘনিষ্ঠতার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে চীনকে টেনে আনা। একজন ভারতীয় বিশ্লেষক বাংলাদেশের উদ্দেশে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন, বাংলাদেশী নীতিনির্ধারকদের এটা ভালো করে ভাবা উচিত; ভারতের বিরুদ্ধে যে কৌশলগত নিশ্চয়তা তারা চাচ্ছেন, তা চীন দিতে পারবে কি না।
২০০৪ সালে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স ভারতে সরকার গঠনের পর নীতিগত কিছু পরিবর্তন আসে। যদিও দুই দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে ভারতীয় উপলব্ধিও তাদের নীতিমালাকে প্রভাবিত করে। ইসলামপন্থী জনগোষ্ঠীগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং একাধিক হামলা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করে অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে ভারতের অভিযোগ ও বাংলাদেশের ভেতর বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটির উপস্থিতি বাংলাদেশ সরকারের জন্য বিব্রতকর হয়ে ওঠে। এ দিকে বাংলাদেশও ক্রমাগতভাবে স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদন, সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, তিস্তার মতো আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানিবণ্টন চুক্তি এবং বাণিজ্য ঘাটতি নিরসনে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশী পণ্য প্রবেশে বিধিনিষেধ কমিয়ে আনার ওপর জোর দিতে থাকে। ২০০৫ সালে ঢাকায় সার্ক সম্মেলনে নিরাপত্তার অভিযোগ তুলে ভারত অংশগ্রহণ না করায় ওই সম্মেলন বাতিল হয়ে যায়, যা এই অস্বস্তিকর সম্পর্কের ব্যাপারটিকে জনপরিসরে নিয়ে আসে। ২০০৫ সালের এপ্রিলে চীনা প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাওর বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় পারমাণবিক সহযোগিতা দেয়ার। এ প্রকল্পের কোনো ধরনের কৌশলগত তাৎপর্য নেই বলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বরাবর আশ্বস্ত করা হলেও ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছিল; এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
২০০৭ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যবর্তী সময়টি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ শাসন করে। এর প্রায় ১২ বছর পর, এখন ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকিয়ে বলা যায়, ভারত শুধু সে সময়কার বাংলাদেশের সরকারের কাছ থেকেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইছিল না, ভবিষ্যতে যেকোনো পরিবর্তনের ফলে ভারতকে যাতে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে না হয়; সেটিও নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। আর সেটা প্রতিবেশীদের ব্যাপারে ভারতের নীতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়।
আমাদের স্বাধীনতার পরপরই পররাষ্ট্রবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা গ্রহণে ভারতীয় প্রভাব ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। তখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের কৌশলগত জায়গাগুলোতে ভারতের ব্যাপক প্রভাব ছিল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় কংগ্রেসের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে একটি নতুন সম্ভাবনার ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক নির্মাণের চমৎকার সুযোগ তৈরি করে। এমন অনুমান করা অবাস্তব ছিল না- কারণ, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনতে ভারত সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। তৎকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির আত্মজীবনী স্পষ্টভাবেই সে দিকে ইঙ্গিত করে।
সবচেয়ে বড় ও নিকট প্রতিবেশী হিসেবে এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবসময়ই একটা ফ্যাক্টর হিসেবে উপস্থিত থেকেছে ভারত। সরকার এবং বিরোধীদলগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিজেদের রাজনীতির স্বার্থে ভারত প্রসঙ্গ উপস্থ’াপন করেছে। এই ব্যবহার করাকে অনেকেই রাজনীতিতে ‘ভারত কার্ড’ বলে বর্ণনা করেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত প্রসঙ্গ উপস্থিত থেকেছে আলাপ-আলোচনায়, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। মাত্রাতিরিক্ত ভারতবিরোধিতা এবং ভারতের প্রতি অতিমাত্রায় সহানুভূতিশীল ও ভারত বিষয়ে স্পর্শকাতর জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে সবসময়ই ছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ও প্রভাব ২০০৮ সালের পরে যেভাবে অনুভূত হয়, তা আগে কখনোই হয়নি। ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সবসময়ই ছিল অম্লমধুর। এরপর এই সম্পর্কে একটি নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে- বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে স্থাপিত হয়েছে অভূতপূর্ব ঘনিষ্ঠতা, যাকে দু’টি দেশের নেতা এবং কূটনীতিকরা স্বর্ণযুগ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ভারতের সাথে মুক্তিযুদ্ধের ‘রক্তের রাখিবন্ধনে’ আবদ্ধ বাংলাদেশ।
১৯৯৮ সালের মার্চে ভারতীয় জনতা পার্টি ভারতের ক্ষমতায় আসার পর উভয় দেশের এ সম্পর্কের অবনতি ঘটে প্রধানত দু’টি কারণে। প্রথমত, বাংলাদেশ থেকে তথাকথিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে বিজেপির বিতর্কিত অবস্থান ও দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-সমর্থিত জঙ্গিগোষ্ঠীর উপস্থিতি বিষয়ে ভারতের অভিযোগ। বিজেপি ইতোমধ্যেই ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’র বিষয়টিকে একটি সাম্প্রদায়িক সমস্যায় রূপান্তরিত করেছে। বিস্ময়করভাবে এ বিরোধ বৃদ্ধি পায়, যখন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সঙ্ঘাত হয়। এতে ভারত ক্ষুব্ধ হয়।
বর্তমানে ওই সম্পর্কের বিকাশ হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পথরেখা উল্টো পথে হাঁটছে। এ সময়ে ভারতের ভূমিকা গণতন্ত্রের পশ্চাৎ-যাত্রায় অনুঘটকের কাজ করেছে। আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক উভয় ধরনের সম্পর্ক হয়ে উঠেছে ঘনিষ্ঠ ও অসম। এই দুই ধরনের সম্পর্কের সূত্রেই ভারত অনুঘটকের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছে যে কারণে বাংলাদেশে ভারত আধিপত্য বিস্তারকারী হিসেবেই চিহ্নিত। বাংলাদেশে জনমনে প্রভাব বিস্তারকারী দুটি বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গিকে মোটাদাগে ভারতপ্রেমী ও ভারতবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। প্রথম দুটি দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যে মেলবন্ধন তার ওপর জোর দেয় এবং ২০১৪ সালে বিজেপির উত্থানের আগ পর্যন্ত দুই দেশের সেকুলার ঐতিহ্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গিটি স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের অবদান স্বীকার করে নিয়েই দুই দেশের মধ্যকার অমীমাংসিত বিষয়গুলোর দিকে মনোনিবেশ করার কথা বলে। এটি ভারতকে দেখে একটি হেজিমনিক শক্তি হিসেবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভারতের ভূমিকার কারণে দিল্লিকে নিয়ে সন্দেহও প্রকাশ করে।
ভারত সম্পর্কে এই সংশয়াপন্ন এবং সমালোচক দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম উৎস হচ্ছে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দুর্বলতর হতে থাকলেও ক্ষমতাসীনদের প্রতি ভারতের রাজনীতিবিদদের-জাতীয় কংগ্রেস এবং ভারতীয় জনতা পার্টির অকুণ্ঠ সমর্থন। এই পর্যায়ে এমন সব চুক্তি ও সমঝোতা তৈরি হয়েছে, যেগুলোতে ভারতের স্বার্থ যতটা রক্ষিত হয়েছে, বাংলাদেশের ততটা নয়। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে কাজ করেছে ৫০ বছর ধরে দুই দেশের মধ্যকার বিরাজমান সম্পর্কের বিভিন্ন দিক, অন্য পক্ষে ভারত যে নীতি গ্রহণ করেছে তার পেছনেও আছে এই ইতিহাস এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ব্যাপারে দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে এটাও উল্লেøখ করা দরকার যে, অতীতে ভারতের বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর আগ্রহ ও নির্বাচনের সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার ফলে দিল্লি প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা থেকে হয় বিরত থেকেছে নতুবা সুযোগ পায়নি। এখন ভারতের সংশ্লিষ্টতা প্রত্যক্ষ।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই দেশের বিভিন্ন খাতে অন্তত ১১১টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন, যা ২০১৮ সালে প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে দুই পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। ভারত বাংলাদেশকে ৮ বিলিয়ন ডলারের তিনটি লাইন অব ক্রেডিট দেয়, যার মধ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনতে দেয়া হয়েছে ৫০০ মিলিয়ন ডলার। ৪০ বছরেরও বেশি সময় বিলম্বের পর স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের মীমাংসা হয়েছে। মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ভারত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করেছে। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে ভারত। অভিন্ন ফেনী নদী থেকে ভারতকে পানি দিতে রাজি হয়েছে বাংলাদেশ। ভারতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস রফতানিরও ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তা ছাড়া বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে নামমাত্র সার্ভিস চার্জ সুবিধা পাচ্ছে ভারতের পণ্যবাহী যানবাহন। বাংলাদেশের ভেতরে ভারতীয় যেসব চরমপন্থীগোষ্ঠীর ঘাঁটি ছিল, বাংলাদেশ সেগুলো নির্মূল করেছে, ভারতের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যা বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। অন্য দিকে, বাংলাদেশের দীর্ঘ দিনের প্রত্যাশিত তিস্তা নদীর পানিবণ্টনের চুক্তি এখনো হয়নি। ইতোমধ্যে যুক্ত হয়েছে আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি এবং নাগরিক আইনের সংশোধিত আইন বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ। সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা বন্ধ হয়নি। ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা সঙ্কটে ভারত কাক্সিক্ষত ভূমিকা রাখেনি। বাংলাদেশের বাণিজ্যে প্রয়োজনীয় ও পরিকল্পিত সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প ভারতের আপত্তির মুখে ছয় বছর অপেক্ষা করে বাতিল করতে হয়েছে।
লেখক : সভাপতি, সাংবিধানিক অধিকার ফোরাম, কেন্দ্রীয় কমিটি
ভারতের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে দিল্লির নীতি বুঝতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির আত্মোপলব্ধি খতিয়ে দেখতে হবে। অর্থাৎ এ অঞ্চলে ও বিশ্বে ভারত নিজেকে কীভাবে বিবেচনা করে, নিজের...
