কানাডায় কয়েক মাস অবস্থানকালে সেখানকার কিছু কাঠামোগত সংস্কার আমাকে মুগ্ধ করেছে। ভেবেছি বাংলাদেশে গিয়ে এসব বিষয় নিয়ে লিখব। হয়তো তাতে আমার দেশের মানুষগুলো নিজেদের ভুলভ্রান্তি শুধরে নিতে পারবেন এবং রাষ্ট্রের কর্ণধাররা নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে আরো সচেতন ও যতœশীল হবেন। তা হলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।
কানাডা বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৭০ গুণ বড়। আয়তন প্রায় এক কোটি বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা মাত্র তিন কোটি ৫০ লাখ। প্রথমে কানাডার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে কিছু বলব। এ সেক্টরে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। কানাডার বড় বড় শহর, উপশহর এমনকি পল্লী এলাকার সড়ক পথগুলোও অত্যন্ত মজবুত ও মনোরম সাজে সজ্জিত। মনে হয় একেকটি সড়ক যেন একেকটি ছবি। সারি সারি নানা প্রজাতির রঙ-বেরঙের গাছগাছালি এবং মাঝে মধ্যে গভীর বনের সমাহার। নানা প্রজাতির পাখির কূজনে মুখরিত প্রতিটি স্থান। পুরো উত্তর আমেরিকা মহাদেশের দূষণমুক্ত আবহাওয়ায়ই রাস্তাঘাটগুলো এত সজীব। এ সব গাছগাছালি গভীর বনের সমাহার শহরের সড়ক পথগুলোর সৌন্দর্য্য দিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কানাডায় আমার দেখা কয়েকটি রাস্তার প্রবেশপথগুলো যেমন টরেন্টো, অটোয়া ৩২, ১৬, ৮ ও ৬ লেনের এবং ডাউন টাউনের সড়ক পথগুলো চার লেনের। ছোট শহর ও উপশহরের প্রবেশ পথগুলো উদাহরণস্বরূপ কুইবেক প্রদেশের মনট্রিল, অ্যালবার্টা প্রদেশের ক্যালগেরি, অন্টারিও প্রদেশের হেমিলটন, বারলিংটন, লন্ডন, নায়াগ্রা ফলস এবং কানাডা ও আমেরিকার মিশিগান ডেট্রয়েড শহরের সীমান্তঘেঁষা কানাডারই একটি শহর উইনজারের সড়ক পথগুলো ৮, ৬ ও ৪ লেনের। পল্লীর সামাজিক সড়কপথগুলো দুই ও চার লেনের। আমাদের বাসা থেকে এক কৃষকের বাড়ির দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। যেতে সময় লাগে মাত্র ২০ মিনিট। আমরা প্রতি সপ্তাহে একবার গাড়িতে করে ওই কৃষকের বাড়িতে যেতাম অর্গানিক ডিম এবং আরো কিছু কৃষি পণ্য কিনতে। এ দেশের প্রতিটি কৃষক ধনী পরিবারের সদস্য। নিজের গাড়ি তো আছেই এ ছাড়া পণ্য সরবরাহের জন্য রয়েছে তাদের একাধিক গাড়ি। কানাডার বহু মানুষ এ ধরনের খামার বাড়ির নিয়মিত খদ্দের। খামার বাড়িগুলোর নির্মাণ কাঠামো অতি চমৎকার।
কানাডার রাস্তাগুলো এমনভাবে নির্মিত যাতে যানজটের সৃষ্টি না হয়। যথাসময়ে যানবাহনগুলো পণ্য ও যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। এখানে সময়ের যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়। এ দেশে রাস্তার শেষ নেই। মেট্রো রেল পাতাল রেলসহ সব ধরনের যানবাহন আছে। রাস্তার দুই পাশে পথচারীর জন্য ৫ ফুট বা ৪ ফুট প্রশস্ত রাস্তা রয়েছে। এসব রাস্তা দিয়ে শুধু মানুষ চলাচল করে।
সর্বত্রই নিয়মমাফিক গড়ে তোলা হয়েছে আবাসিক প্রকল্প। সেখানে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই। এমনকি কোনো ফুটপাথও নেই। ফেরিওয়ালা নেই। দুই ও তিন চাকার কোনো গাড়ি নেই। খোলা ট্রাকও নেই। এগুলো কানাডার আইনে নিষিদ্ধ। কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাসরত সবারই গাড়ি আছে। গাড়ি এ দেশে বিলাস সামগ্রী নয়, বরং অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রী। গাড়ির দাম বেশির ভাগ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা হয়েছে। এখানে প্রধানমন্ত্রী হোক বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী, রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা সবার জন্য একই রকম। ছাত্রছাত্রীদের জন্য সরকারি বাড়ি ভাড়া এতটাই কম যা ভাবা যায় না। S.S.C পর্যন্ত লেখাপড়ার খরচ সরকার বহন করে। প্রাইভেট কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার জন্য সরকার loan দেয়। চাকরি করে মাসে মাসে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা আছে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিজ কমিউনিটি বা এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পড়তে হয়।
কানাডার সুপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শেখার বিষয়। দেশটির কোথাও কোনো বর্জ্য জমে আছে বা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমন দৃশ্য চোখে পড়েনি। অন্টারিওর লন্ডন শহরে যে বাড়িতে থাকতাম সে বাড়ির গার্বেজ (Paper, plastics, card board, cans & Bottles) রিসাইকেলিং করে তিনটি ভাগে বিভক্ত করে ভিন্ন রঙের তিনটি পাত্রে রাখা হয় এবং বর্জ্যরে পাত্রের মুখ শক্ত করে বন্ধ করে তা প্রতিটি বাড়ির বা বাসার সামনের রাস্তার পাশে নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হয়। এসব রিসাইকেলিং বর্জ্যরে জন্য রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন গাড়ি। সপ্তাহের একেক দিন একেক গাড়ি এসে ময়লাগুলো নিয়ে যায়।
এখানে নিজের কাজ নিজেকে করতে হয়। সিটি করপোরেশন যেসব গাছ রাস্তার দুই পাশে লাগিয়েছে শীতকালে সেগুলোর ডালাপালা ছেটে দেয় সরকারের দায়িত্বশীল কর্মচারীরা যাতে যানবাহন ও মানুষের পথচলায় ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয়। কিন্তু বাড়ির সামনে যেসব গাছ বাড়ির মালিকরা লাগিয়েছে তার সৌন্দর্যবর্ধন করার দায়িত্ব বাড়ির মালিকদের এবং রাস্তার দুই পাশে গাছের পাতা এবং বাড়ির চার পাশের ময়লা আর্বজনা জমিয়ে তা বাড়ির সামনে নির্দিষ্ট স্থানে রাখার দায়িত্ব বাড়ির মালিকদের। কেউ নিয়ম ভঙ্গ করলে সিটি করপোরেশন তার বিরুদ্ধে কালক্ষেপণ না করে আইনি ব্যবস্থা নেয়। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে বিধায় এখানে বেআইনি কাজকর্ম হয় না বললেই চলে।
বাংলাদেশ ছোট একটি দেশ। মাত্র এক লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটারে মানুষ ১৮ কোটি। আগামী ১০ বছরে যা দাঁড়াবে ২৫ কোটি। এরকম একটি জটিল অবস্থার দিকে আমরা ধাবিত হচ্ছি। এরপর আমরা আবার সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করছি না। ড্যাপ নামে মাত্র আছে। এ ছাড়া আমরা মেনে চলছি না আইনকানুন। চলছে লাগামহীন অর্থনৈতিক দুর্নীতি, অপশাসনের দৌরাত্ম্য। চলছে ক্ষমতার রাজনীতি।
অপরিকল্পিত আবাসন বানিয়ে ঢাকা শহরকে দূষণের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। আলো বাতাসহীন দমবন্ধ পরিবেশে জীবনযাপন করতে হয় বাংলাদেশের মধ্যবিত্তদের। আজ বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বোচ্চ দূষণের দেশ। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শব্দ দূষণ ঢাকাতেই ঘটে। শব্দ সহ্যসীমার মধ্যে রাখার ব্যবস্থা নেই। কয়েক বছর আগে পরিবেশ অধিদফতরের এক জরিপে এ তথ্য জানা যায়, দেশের সব ক’টি বিভাগীয় শহরে শব্দের মাত্রা ১৩০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে গেছে, যা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে আড়াই থেকে ৩ গুণ বেশি।
কোন পথে যাচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তা খুব কম লোকই ভাবছি।
কানাডার রাস্তাঘাটে মানুষজন নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের ৭১ গুণ বড় দেশটির রাস্তায় বেরোলে মনে হয় কোনো নীরব জনপথ দিয়ে চলছি। এ দেশে কোনো শব্দ দূষণ নেই। রাস্তায় কুকুর নেই। তাই কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ শোনা যায় না। গাড়ির অযথা হর্ন নেই। নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া রাস্তায় ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করে না। কোথাও আড্ডা বা জটলাও নেই।
এ দেশে নারী-পুরুষের বাণিজ্যিক বিলবোর্ড নেই বললেই চলে। রাষ্ট্রপ্রধানের মূর্তি বা ভাস্কর্য কোথাও দেখিনি। একটি জিনিস অবাক হওয়ার মতো। পেট্রলপাম্পে কোনো লোকজন নেই। গাড়ির মালিককে ক্রেডিট কার্ড নির্দিষ্ট স্থানে দিয়ে কম্পিউটারে লিখতে হবে কী পরিমাণ তেল লাগবে। সব কিছু ওকে হলে গাড়ির চালক নিজেই পাইপ লাগিয়ে তেল নিয়ে চলে যায়।
এক কথায় বলতে হয় কানাডায় সব কিছুই নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে চলছে। ফলে পানি, বায়ু, মাটি, শব্দ ও পরিবেশ দূষণ থেকে দেশটি সম্পূর্ণ মুক্ত। কানাডায়ও গরিব মানুষ আছে। কিন্তু আমাদের দেশে অলিগলিতে, বাসাবাড়িতে, মসজিদে, হাটবাজারে যেভাবে পেশাজীবী ভিক্ষুক দেখা যায় সেটি এ দেশে একেবারেই নেই। হাত পেতে ভিক্ষা চায় এরকম মানুষ রাস্তা ঘাটে দেখিনি। এ দেশের গরিব মানুষও হাত পেতে কিছু চাওয়া নিজেকে অপমানবোধ করে। কানাডার লন্ডন শহরে ওয়ালমার্ট সুপার মার্কেট, কসকো, ডলারমা, মেট্রো, হ্যাডসন অ্যান্ড বে-এর মতো বড় বড় শপিংমলে ৮৫-৯০ বছর বয়সের মানুষকে কাজ করতে দেখেছি। সরকার যে বয়স্কভাতা দেয় তা দিয়ে সংসার চলে না। তাই বেশি বয়সেও কাজ করতে হয়। এখানে কে বড় কে ছোট চাকরি করে এ নিয়ে কোনো হিংসা, অহঙ্কার, গিবত নেই। সবাই একটি পরিবারের সদস্য হিসেবে কাজ করে। পাছে লোকে কিছু বলে এই চিন্তা তাদের মধ্যে নেই। নিজ নিজ কাজ নিয়ে সবাই ব্যস্ত। অফিসে দুপুরে লাঞ্চের সময় সবাই এক জায়গায় বসে খেতে দেখেছি। এ দেশেও গরিবদের সাহায্য করা হয়। কিন্তু নীরবে অর্থাৎ বিষয়টি অজানা থেকে যায়। যে সাহায্য করল সে কাউকে বলে বেড়ায় না। আর যে সাহায্য পেল সেও জানে না কে তাকে সাহায্য করল। ইসলামের এই শিক্ষাটা এ দেশে দেখে ভাবলাম আমরা বাংলাদেশের মানুষ কাউকে কিছু দান করলে অনেকটা বাণিজ্যিক কায়দায় তা প্রচার করে থাকি।
পুরো রাস্তা দখল করে কথা বলাকে এ দেশের মানুষ অপছন্দ করে। চলার পথে ডান-বাম মেনে চলতে হয়। রাস্তায় কোনো ট্রাফিক পুলিশ দেখিনি। সবাই ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলে। ইউনিফর্ম পরিহিত কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন রাস্তায় দেখিনি। কানাডার এক শ’ বিশ্ববিদ্যালয় যা সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। সব ক’টি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের সেরা এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। দুঃখজনক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বিশ্বের সেরা এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও নেই। এর মূল কারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা রাজনীতিকে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের উপায় হিসেবে নিয়েছে। ফলে পড়াশোনায় চরম ধস নেমেছে। কানাডায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতি নেই বলেই তারা পড়াশোনা ও গবেষণায় অনেক এগিয়ে গেছে। কানাডার উন্নতির পেছনে টেকনোলজি নয়, বরং সত্যবাদিতাই উন্নতির কারণ।
অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী এবং School bus, ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি এলে ডানে বামে চলমান গাড়িগুলো ধীরগতিতে থেমে যায়। বয়স্ক মানুষকে রাস্তা পার হতে দেখলেও গাড়ি থেমে যায়। মনে হয়, কোনো অদৃশ্য শক্তি দেশটিকে এত নিয়মশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে পরিচালিত করছে। একই দৃশ্য আমি ২০০৫ সালে হজের সময় মদিনায় দেখেছিলাম। বাংলাদেশে এ ধরনের সুশৃঙ্খল জীবনযাপন এবং মানবিক দৃশ্য একেবারেই উঠে গেছে। যার যা আছে তা নিয়েই কানাডার মানুষ সন্তুষ্ট। তাদের ভাবভঙ্গিতেই তা প্রকাশ পায়। আহামরি কোনো চিন্তা নেই। অর্থের প্রতিযোগিতা নেই। এক দিনে কোটিপতি হওয়ারও স্বপ্ন নেই। আজকের দিনটি ভালো যাক এটিই তাদের জীবনদর্শন। বিপরীতে বাংলাদেশে ধনীদের অর্থের লোভ এত বেশি যা ভাবা যায় না। অবৈধ আয়ের হাত যে কত প্রসারিত নিত্যদিনের মিডিয়া দেখলেই তা বোঝা যায়।
বিশ্বে প্রথম ১০টি সুখী দেশ ধনী নয়, কিন্তু সুখী। এই ১০টি দেশের তালিকায় কানাডার নাম আছে। কানাডা বিশ্বের অষ্টম অর্থনৈতিক শক্তি। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, জাপান, সৌদি আরব, ভারত, আরব আমিরাত, কাতার এবং আরো অনেক দেশ ধনী ও বিত্তশালী; কিন্তু তারা সুখী নয়। বিষয়টি আমাদের বুঝতে হবে। সুখী দেশ হওয়ার মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো ধনী দেশগুলোতে অনুপস্থিত বলেই তারা অসুখী।
লেখক : গ্রন্থকার ও গবেষক
EM:harunrashidar@gmail.com
