সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেছেন, ‘ঢাকা মহানগরে যেকোনো ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করার জন্য রাজউকের পাশাপাশি দুই সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিতে হবে।’ (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো)
মন্ত্রীর এমন কথা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা হচ্ছে। এমন পদ্ধতিকে অনেকেই ইতিবাচক দেখেননি। এর কারণ হচ্ছে- আমাদের সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি। দেশের মানুষ জানে একেকটি সরকারি অফিসে কী সাঙ্ঘাতিক হয়রানির শিকার হতে হয়। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার সিটি করপোরেশনের অফিসগুলো দুর্নীতির বিশাল আখড়া। এমনিতেই রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউকের অফিসে অনেক ঘুষ দিয়ে ঢাকার বাসিন্দাদের বাড়িঘর নির্মাণ করতে হয়। ধরা যাক কিছু মানুষ কোনো এক বনে বাস করে, সে বনে হিংস্র জানোয়ার বাঘ আছে সেই মানুষরা নিয়মিত বাঘের সাথে লড়াই করে বাঘকে অনেক খাবার খাইয়ে বুঝিয়ে তারা বনে টিকে আছে।
এমন সময় সেই বনের মাতব্বররা যদি বনের মধ্য আফ্রিকা থেকে আমদানি করা অনেক সিংহ ছেড়ে দেয়! তাহলে তো সেই নিরীহ মানুষগুলো আরো বেশি বিপদে পড়বে।
মন্ত্রীর ওই কথা যদি বাস্তবায়ন হয় তাহলে আশঙ্কা থাকে কোনো লোক শুধু রাজউককে ঘুষ দিয়েই বাড়ি করতে পারবে না, নতুন করে সিটি করপোরেশনেও মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে রাজউককে পাঁচ লাখ ঘুষ দিলে সিটি করপোরেশনকে দিতে হবে সাত লাখ টাকা! এসব কথা কারো কাছে কাল্পনিক মনে হতে পারে, জোকস মনে পারে। কিন্তু সরকারি অফিসে ঘুষ ওপেন। রাজউকের কর্মচারীদের কোথায় কী সম্পত্তি আছে সেটা জরিপ করলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে কী পরিমাণ ঘুষ চলে রাজউক অফিসে। সিটি করপোরেশনের কর্মচারীদের কোথায় কী সম্পত্তি আছে সেটা জরিপ করলেও বোঝা যাবে সিটিতে অবকাঠামো নির্মাণে তাদের অনুমতি নিতে গেলে কত ঘুষ লাগবে!
শিশুদের জন্মসনদপত্র নিতে গেলেও সিটি করপোরেশনের কর্মচারীকে ঘুষ দিতে হয়। সিটি করপোরেশনের অনেক কর্মচারী ডিজিটাল সিস্টেম মানতে চান না। ঘুষ ছাড়া কথা নেই। তারা সামান্য কিছুতেই নাগরিকদের হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্ট দেখিয়ে ছাড়ে! অবশ্যই সিটি করপোরেশনসহ অনেক সরকারি অফিসে ঘুষবিহীন কিছু কর্মচারী আছেন। এর সংখ্যা অতি নগণ্য। সামান্য ক্ষুদে ব্যবসার জন্য ট্রেড লাইসেন্স লাগবে, সেই ট্রেড লাইসেন্স নিতে গেলেও অনেক টাকা সিটির কর্মচারীকে ঘুষ দিতে হয়। সেই সিটি করপোরেশনের ঘুষখোরদের হাতে যদি অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতির দেয়ার দায়িত্ব আসে; তাহলে কী পরিস্থিতি ঘটবে তা কি পরিষ্কার নয়?
এমন নয় যে, এ দেশের স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা ব্রিটেন-আমেরিকার মতো উন্নত। উন্নত দেশগুলোতে এরকম ঘুষের কালচার নেই। সিটি করপোরেশনের অনুমতি নেয়া ভালো। অনিরাপদ জায়গায় যাতে অবকাঠামো নির্মাণ না হয় সেটা দেখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনেরও আছে। সিটি করপোরেশনের কর্মচারীরা কি সেখানে নীতিবানভাবে দায়িত্ব পালন করবে?
ব্রিটেন-আমেরিকায় সিটি মেয়র সে নিজেও একজন সরকারপ্রধান। সেখানে সিটিতেই বিশেষ সরকারব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকার মতো ডেসকো, তিতাস, ওয়াসা, রাজউক, এলজিইডি বিতর্ক সেখানে নেই। সেখানে মেয়ররা বাসে অফিস করেন। আর আমাদের এখানে বিতর্কিত লোকেরা ভোট ছাড়াই কাউন্সিলর হয়ে কোটি টাকা দামের গাড়ি ও গানম্যান নিয়ে চলাফেরা করতে সক্ষম। স্থানীয় সরকারের এসব বিষয় নিয়ে মিডিয়ায় কম কথা হয় না। কে শোনে কার কথা।
গত দু’বছর আগে শুনলাম গ্রামে অবকাঠামো নির্মাণ করতে গেলে ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি লাগবে। আমাদের দেশে যে দুর্নীতি-অনিয়ম সেখানে এটাও একটা মহা প্রহসনমূলক ব্যবস্থা হবে। কারণ এখন ইউনিয়ন পরিষদগুলোর বেশির ভাগই বিতর্কিত অনির্বাচিত লোকদের হাতে চলে গেছে। চরিত্রহীনদের অনেকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার হয়ে বসে আছেন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর এমন কথা বা সিদ্ধান্ত দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ গুণী ব্যক্তিরাও ইতিবাচক দেখেননি। বিশিষ্ট প্রকৌশলী ইকবাল হাবিব বলেছেন, ঢাকায় অবকাঠামো নির্মাণে সিটি করপোরেশনের অনুমোদন প্রস্তাব অপরিণামদর্শী।’ (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো।)