পৃথিবীর আদি থেকে অদ্যাবধি ইতিহাসের পাতায় অসংখ্য জ্ঞানী-গুণী, পণ্ডিত, নবী-রাসূলের নাম পাওয়া যায়, যারা পৃথিবীর নানা প্রান্ত ভ্রমণ করে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন। ভ্রমণকে আরবি ভাষায় বলা হয় সফর, ছায়ের, রেহলাত প্রভৃতি। ইসলামী শরিয়তের ফিকহি পরিভাষায় সফর বলা হয়- নিজ বাসস্থান বা কর্মস্থল থেকে ৪৮ মাইল বা ৭০ কিলোমিটার দূরত্বে গমনের উদ্দেশ্যে নিজ মহল্লা বা গ্রাম থেকে বের হওয়া। গন্তব্যে পৌঁছার আগ পর্যন্ত এ অবস্থা বহাল থাকে। সফর বা ভ্রমণকারীকে মুসাফির বলা হয়। রাসূল সা:-এর জীবনে রজব মাসে যে মিরাজ হয়েছিল, সেটিও এ ভ্রমণেরই অংশ। গন্তব্য যদি নিজ বা কর্মক্ষেত্রে হয়, তবে সেখানে পৌঁছার পর আর মুসাফির থাকবেন না। আর গন্তব্য যদি নিজ বাড়ি বা কর্মস্থল না হয় এবং সেখানে অন্তত ১৫ দিবস-রজনী থাকার নিয়ত না থাকে, তা হলে সফর অবস্থা বহাল থাকবে। ভ্রমণ একটি আনন্দময় ইবাদত এবং জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার উৎস। সফর বা ভ্রমণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো পূর্ববর্তীদের কীর্তি ও পরিণতি সম্পর্কে জানা ও শিক্ষা গ্রহণ করা। এ প্রসঙ্গে কুরআনে সূরা ইউসুফের ১০৯ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তারা পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না এবং তাদের পূর্ববর্তীদের কী পরিণাম হয়েছিল, তা কি দেখে না? যারা মুত্তাকি তাদের জন্য পরকালই শ্রেয়; তোমরা কি বুঝ না?’ অন্যত্র সূরা আল-মুমিনের ২১ আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘এরা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? করলে দেখত, এদের পূর্ববর্তীদের কী পরিণাম হয়েছে। পৃথিবীতে তারা ছিল এদের অপেক্ষা শক্তিতে ও কীর্তিতে প্রবলতর। অতঃপর মহান আল্লাহ তাদের শাস্তি দিয়েছিলেন তাদের অপরাধের জন্য এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করার কেউ ছিল না।’ সূরা আল-মুমিনের ৮২ আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না ও তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কী হয়েছিল? পৃথিবীতে তারা ছিল এদের অপেক্ষা সংখ্যায় অধিক এবং শক্তিতে ও কীর্তিতে অধিক প্রবল। তারা যা করত তা তাদের কোনো কাজে আসেনি।’ ভ্রমণ বা সফরের বিশেষ উদ্দেশ্য হলো- আল্লাহর সৃষ্টি রহস্য অবলোকন করে জ্ঞানার্জন করা এবং তার কুদরত ও শক্তির প্রতি অনুগত হওয়া। এ প্রসঙ্গে সূরা হজের ৪৬ নং আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে, ‘তারা কি দেশ ভ্রমণ করে না? তা হলে তারা জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন ও স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন হতে পারত। বস্তুত চক্ষু তো অন্ধ নয়, অন্ধ হচ্ছে হৃদয়।’ সূরা আনকাবুতের ২০ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘বলো, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং অনুধাবন করো, কিভাবে তিনি সৃষ্টির সূচনা করেছেন? অতঃপর আল্লাহ সৃজন করবেন পরবর্তী সৃষ্টি। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান।’
যাতায়াত ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট, যানবাহন ও পরিবহন আল্লাহর কুদরতের অংশ এবং তা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। পবিত্র কুরআনের সূরা সাবার ৩৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তাদের যেসব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছিলাম, যেগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে বহু জনপদ স্থাপন করেছিলাম এবং ওই জনপদে ভ্রমণের যথাযথ ব্যবস্থা করেছিলাম ও তাদের বলেছিলাম, তোমরা এসব জনপদে নিরাপদে ভ্রমণ করো দিবস ও রজনীতে।’ ইসলামী আইনবিদদের মতে, সব মুসলমানের আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে সামর্থ্য অনুযায়ী সফর করা ও ভ্রমণ করা কর্তব্য। সূরা আলে ইমরানের ১৩৭ নং আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের আগে বহু বিধান ব্যবস্থা গত হয়েছে, সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো, মিথ্যাশ্রয়ীদের কী পরিণাম! সূরা আনয়ামের ১১ নং আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘বলো, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো। অতঃপর দেখো, যারা সত্যকে অস্বীকার করেছে তাদের পরিণাম কী হয়েছিল। সফরের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের বৈচিত্র্য বিষয় অবলাকন করে জীবনের পাথেয় সঞ্চয় করা যায়। সফরের মাধ্যমে মানুষের চোখ-কান খুলে যায়। সত্য, সঠিক পথ ও পন্থা গ্রহণ করা হয়। আল্লাহ তায়ালা সূরা হজের ৪৬ নং আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘তবে কি তারা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করে না, যাতে তাদের অন্তর অনুধাবন করতে পারত এবং তাদের কান (সত্যকথা) শুনে নিত।’ সফরে দোয়া কবুল হয়। সফরকালে চার রাকাত ফরজ নামাজ কছর দুই রাকাত পড়তে হয় এবং সুন্নত নামাজ নফল পর্যায়ভুক্ত হয়। সফর অবস্থায় প্রয়োজনে ফরজ রোজা পরে রাখা যায়। সফর অবস্থায় ঈদের নামাজ ও জুমার নামাজ এবং কোরবানি ওয়াজিব হয় না। তবে সুযোগ থাকলে আদায় করা উত্তম।
ইসলামী চিন্তাবিদরা বলে থাকেন, পর্যটন হলো জ্ঞান সমুদ্রের সন্ধান। সুস্থ দেহ ও সুন্দর মন তথা শারীরিক ও মানসিক উন্নতির জন্য ভ্রমণ করা জরুরি। এ জন্য হজরত শেখ সাদী রহ: বলেছেন, দুই ব্যক্তি সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী- ১. ভাবুক বা চিন্তাশীল ব্যক্তি; ২. দেশ সফরকারী ব্যক্তি। আল্লাহর নির্দেশনা হলো পৃথিবীতে ঘুরে দেখো, যারা সত্য কে মিথ্যা বলেছে তাদের পরিণতি কী হয়েছে। নিম্নে কয়েকটি জাতির আল্লাহদ্রোহিতার কারণে তাদের করুণ পরিণতির কথা তুলে ধরা হলো- প্রথমে ফেরাউনের কথা। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সেনাবাহিনী, পারিষদবর্গ ও প্রাসাদের জৌলুস ফেরাউনকে উদ্ধত করেছিল। নিজের ক্ষমতার ব্যাপ্তি দেখে নিজেকে খোদা দাবি করেছিল। মুসা ও হারুন আ: তার কাছে ঈমানের দাওয়াত নিয়ে যান। কিন্তু ফেরাউনের উম্মত্ততা আরো বেড়ে যায়। সে আল্লাহর নবী মুসা আ:কে হত্যা করতে মনস্থির করে। সদলবলে মুসা আ:কে ধাওয়া করে। আল্লাহর হুকুমে সাগরে পথসৃষ্টি হয়ে মুসা আ: পার হয়ে যান। ফেরাউন তাওবা করার চেষ্টা করেছিল; কিন্তু তার তাওবা কবুল হয়নি, বরং তাকে বিশ্ববাসীর কাছে দৃষ্টান্ত হিসেবে রেখে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আজ আমি তোমার (ফেরাউন) দেহ রক্ষা করব। যাতে তুমি তোমাদের পূর্ববর্তীদের নিদর্শন হয়ে থাকো। অবশ্যই মানুষের মধ্যে আমার অনেক নিদর্শন সম্পর্কে উদাসীন। (সূরা ইউনুস, আয়াত-৯২) এ বিষয়ে আসমানি ধর্মগ্রন্থ বিশেষজ্ঞ ড. মরিস বুকাইলি লিখেছেন, নব সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, লোরেট ১৮৯৮ সালে রাজাদের উপত্যকায় (কিংস ভ্যালি) থিবিসে দ্বিতীয় রামেসিসের পুত্র মহাযাত্রীকালীন ফেরাউনের মমি করা লাশ আবিষ্কার করেন। সেখান থেকে তা কায়রোতে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯০৮ সালে ৮ জুলাই এলিয়ট স্মিথ এ মমির আবরণ অপসারণ করেন। তিনি তার ‘দ্য রয়েল মমিজ’ নামক গ্রন্থে (১৯১২)-এর লাশ প্রক্রিয়ার ও লাশ পরীক্ষার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। কয়েকটি জায়গায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বে¡ও মমিটি তখনো সন্তোষজনকভাবে সংরক্ষিত ছিল। তখন থেকে তার মাথা গলা খোলা। অবশিষ্ট দেহ কাপড় দ্বারা আবৃত অবস্থায় দেখার জন্য জাদুঘরে রাখা হয়েছে। সম্ভবত ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কায় লাশের ঢাকনা খুলতে দেয়া হয় না। ১৯১২ সালে এলিয়ট স্মিথের তোলা ছাড়া পুরো লাশের আর কোনো ছবি জাদুঘরে নেই। ঐতিহাসিক চিহ্ন-দ্রব্য সংরক্ষণ করা মানুষের স্বাভাবিক কর্তব্য। কিন্তু এই মমির ক্ষেত্রে সেই কর্তব্য অনেক বেশি বড় ও ব্যাপক হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ এ মমি হচ্ছে এমন একজনের লাশের বাস্তব উপস্থিতি, যে মুসা আ:কে চিনত। তার পরও হেদায়েত প্রত্যাখ্যান করেছিল। তার পলায়নকালে তার পশ্চাদ্ধাবন করেছিল এবং সেই প্রক্রিয়ায় প্রাণ হারিয়েছে। আর কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, তার লাশ মানুষের জন্য নিদর্শনস্বরূপ। আল্লাহর হুকুমে তা ধ্বংস থেকে রক্ষা পেয়েছিল। (সূত্র : কুরআন, বাইবেল ও বিজ্ঞান) সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিম সাগর তীরে ফেরাউনের লাশ ভাসমান অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। আর ওই জায়গাটি অপরিবর্তিত আছে। বর্তমানে এ জায়গার নাম জাবালে ফেরাউন বা ফেরাউনের পর্বত। এরই কাছাকাছি আছে একটি গরম পানির ঝরনা। স্থানীয়রা এর নাম দিয়েছে হাম্মামে ফেরাউন। এর অবস্থান হচ্ছে আবু জানিমের কয়েক মাইল ওপরে উত্তরের দিকে। স্থানীয় লোকেরা জায়গাটি চিহ্নিত করে বলে, ফেরাউনের লাশ এখানে পড়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল।
আল্লাহর আজাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রধান ছয়টি প্রাচীন জাতির মধ্যে অন্যতম জাতি হলো ‘আহলে মাদায়েন’। তাদের সম্পর্কে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- ‘মাদায়েনবাসীর কাছে তার ভাই শোয়াইব আ:কে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো উপায় নেই। আর ওজন ও পরিমাণ কম দিয়ো না। আমি তো দেখছি তোমরা সমৃদ্ধিশালী (এরপর তোমরা ওজনে কম দিলে), আমি তোমাদের জন্য সর্বগ্রাসী আজাবের আশঙ্কা করেছি।’ (সূরা হুদ, আয়াত-৮৪) ‘মাদায়েন’ লুত সাগরের সন্নিকটে সিরিয়া ও হিজাজের সীমান্তবর্তী একটি জনপদের নাম। এটি এখন পূর্ব জর্দানের সামুদ্রিক বন্দর মোআনের অদূরে অবস্থিত। ওরা কুফরি করা ছাড়াও ওজনে কম দিত। অন্যের সম্পদ লুটপাট করত। অন্যায় পথে জনগণের সম্পদ ভক্ষণ করত। এ শহরের গোড়াপত্তন করেছিলেন মাদায়েন ইবনে ইবরাহিম আ:। তিনি মুসা আ:-এর শ্বশুর ছিলেন। লুত আ:-এর জাতির ধ্বংসের অনতিকাল পরে মাদায়েনবাসীর প্রতি তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন। চমৎকার বাগ্মিতার কারণে ‘খাতেমুন আম্বিয়া’ বা নবীদের মধ্যে সেরা বাগ্মী হিসেবে খ্যাত ছিলেন। মাদায়েনবাসীকে পবিত্র কুরআনে কোনো জায়গায় আসহাবুল আইকা বলা হয়েছে। এর অর্থ হলো জঙ্গলের বাসিন্দা। এটি বলার কারণ হলো, এই অবাধ্য জনগোষ্ঠী প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে নিজেদের বসতি ছেড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। আল্লাহ তাদের সেখানে ধ্বংস করে দেন। শোয়াইব আ: অর্থনৈতিক সততার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। এর আলোকে বোঝা যায়, আল্লাহর ইবাদত বলতে শুধু নামাজ, রোজা ও দোয়া দরুদই বোঝায় না, মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে আল্লাহর বিধান মেনে চলা আল্লাহর ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। অন্যান্য নবী-রাসূলের ওপর আজাব এসেছে আল্লাহকে অস্বীকার ও আল্লাহর নবীদের অবাধ্য হওয়ায়। কিন্তু শোয়াইব আ:-এর জাতির ওপর আজাব এসেছে বিশেষভাবে অর্থনৈতিক অসততার কারণে। তাই অর্থনৈতিত অসততা থেকে বেঁচে থাকা উচিত।
আদ জাতির সুউচ্চ প্রাসাদ ও টাওয়ার ছিল। কিন্তু সেগুলোও তাদের প্রকৃতির পতিশোধ থেকে রক্ষা করতে পারেনি। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি দেখোনি, তোমার প্রতিপালক আদ জাতির ইরাম গোত্রের প্রতি কী (আচরণ) করেছেন? যারা ছিল সুউচ্চ প্রাসাদের অধিকারী, যার সমতুল্য প্রাসাদ কোনো দেশে নির্মিত হয়নি।’ (সূরা ফজর, আয়াত : ৬-৮)
শক্তি ও ক্ষমতার বাহাদুরি তাদের হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে ফেলে। অনায়াসে তারা বলে বেড়াত, (এ দুনিযায় আমাদের চেয়ে শক্তিশালী কে আছে? কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে তারাও উপলব্ধি করতে পারে যে, আল্লাহর হুকুমের সামনে, প্রকৃতির প্রতিশোধের কাছে মানুষ বড় অসহায়। আত্ম-অহমিকা আদ জাতিকে পরকালের ব্যাপারে উদাসীন করে তোলে। আদ জাতির অমার্জনীয় হঠকারিতার ফলে প্রাথমিক আজাব হিসেবে কিন্তু কয়েক বছর বৃষ্টিপাত বন্ধ থাকে। তাদের শস্যক্ষেত শুষ্ক বালুকাময় মরুভূমিতে পরিণত হয়। বাগবাগিচা জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তারা মূর্তিপূজা, শিরক ত্যাগ করতে পারেনি। তারা বাধ্য হয়ে আল্লাহর কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করে। তখন আসমানে সাদা কালো মেঘ দেখা দেয়। একপর্যায়ে গায়েবি আওয়াজ আসে, তোমরা কোন মেঘ পছন্দ করো?’ লোকেরা কালো মেঘ কামনা করে। তখন কালো মেঘ নেমে আসে। আদ জাতি তখন স্বাগত জানিয়ে বলে, ‘এটি আমাদের বৃষ্টি দেবে’। জবাবে তাদের নবী হুদ আ: বলেন, ‘বরং এটি সেই বস্তু যা তোমরা তাড়াতাড়ি চেয়েছিলে। এটি এমন বায়ু এর মধ্যে রয়েছে মর্মন্তুদ আজাব।’ পরদিন আল্লাহর চূড়ান্ত আজাব নেমে আসে। সাত রাত ও আট দিন অনবরত ঝড় তুফান বইতে থাকে। মেঘের বিকট গর্জন ও বজ্রপাতে বাড়িঘর ধসে যায়। প্রবল বৃষ্টিপাতে গাছপালা উপড়ে যায়। মানুষ ও জীবজন্তু শূন্যে উত্থিত হয়ে সজোরে জমিনে পতিত হয়।’ (সূরা হাক্কাহ, আয়াত : ৬-৮)
বিকৃত পাপে বিভ্রান্ত ছিল লুত আ:-এর জাতি। লুত আ:-এর জাতি যে অঞ্চলে বসবাস করত, তাকে ট্রান্স জর্দান বলা হয়। এটি ইরাক ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। বাইবেলে এ জাতির কেন্দ্রীয় স্থানকে ‘সাদুম’ বলা হয়। সাদুম নগরী সবুজ শ্যামল ও এতে পানির সরবরাহ পর্যাপ্ত ছিল। ভূমি ছিল অত্যন্ত উর্বর ও শস্যে ভরপুর। এসব অঞ্চল আল্লাহ প্রাচুর্য দিয়ে ঢেলে সাজিয়েছেন। লুত আ:-এর জাতি প্রাচুর্যময় সম্পদের কারণে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পৃথিবীতে পরিচিত ও অপরিচিত এমন কোনো অপরাধ নেই, যা তাদের মধ্যে ছিল না। সে সময় তারা একটি অপরাধ আবিষ্কার করেছিল, যা তখন অন্য কোনো জাতির মধ্যে দেখা যায়নি : সমকামিতা। এই অপরাধ করে তারা প্রকাশ্যে আনন্দ লাভ করত। ফলে লুত আ:-এর জাতির মধ্যে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মহা প্রলয় নেমে আসে। একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প পুরো নগরটি উল্টে দেয়। ঘুমন্ত মানুষের ওপর তাদের ঘরবাড়ি আছড়ে পড়ে।
সামুদ জাতি শিল্প সংস্কৃতিতে পৃথিবীতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। আদ জাতির পর আল্লাহ তাদেরকে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধি দান করেন। কিন্তু তাদের জীবনযাপনের মান যতটা উন্নতির শিখরে পৌঁছেছিল, মানবতা ও নৈতিকতার মান ততই নিম্নগামী ছিল। এক দিকে উন্মুুক্ত ময়দানে পাথর খোদাই করে প্রাসাদের পর প্রাসাদ তৈরি হচ্ছিল, অন্য দিকে সমাজে কুফর, শিরক ও পৌত্তলিকতার প্রসার ঘটেছিল। ন্যায় ইনসাফ বলে সমাজে কিছু ছিল না। অন্যায় ও অবিচারে সমাজ জর্জরিত হতে থাকে। সমাজে চরিত্রহীন লোকের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। হজরত সালেহ আ: যে সত্যের দাওয়াত দিয়েছেন, তাতে নিম্নশ্রেণীর লোকেরা আগে সাড়া দিয়েছিলেন। হিজর ছিল সামুদ জাতির কেন্দ্রীয় আবাসস্থল। এর ধ্বংসাবশেষ মদিনার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। বর্তমান শহর আল উলা থেকে কয়েক মাইল ব্যবধানে এটি দেখা যায়। সালেহ আ: সারা জীবন তাদেরকে হেদায়েতের পথে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। এতে কিছু সংখ্যক ব্যক্তি ছাড়া গোটা জাতি তার অবাধ্য হয়ে গেল। একপর্যায়ে তারা দাবি করে, “আপনি যদি সত্যিই নবী হয়ে থাকেন তা হলে আমাদের ‘কাতেবা’ নামের পাথরময় পাহাড়ের ভেতর থেকে একটি ১০ মাসের গর্ভবর্তী, সবল ও স্বাস্থ্যবতী উষ্ট্রী বের করে দেখান। এটি দেখাতে পারলে আমরা আপনার ওপর ঈমান আনব।” সালেহ আ: আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। আল্লাহর কুদরতে পাহাড় থেকে একটি অদ্ভুত রকমের মাদী উট বের হয়। তা দেখে কিছু লোক ঈমান আনে। কিন্তু তাদের সরদাররা ঈমান আনেনি; বরং তারা উটকে হত্যা করে ফেলে। এতে সালেহ আ:-এর জাতির ওপর আল্লাহর গজব নেমে আসে। তিনি তাদের সতর্ক করে দেন যে, তিন দিন পরপরই আল্লাহর আজাবে ধ্বংস করে দেবে। নির্ধারিত সময়ে আসমানি আজাব এসে অবিশ্বাসীদের চিরতরে ধ্বংস করে দেয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘তার পর সীমালঙ্ঘনকারীদের মহানাদ আঘাত করে। ফলে তারা নিজ গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে (ধ্বংস হয়ে যায়)। যেন তারা সেখানেই কখনোই বসবাস করেনি। জেনে রাখো, সামুদ জাতি প্রতিপালককে অস্বীকার করেছিল। আরো জেনে রাখো, ধ্বংস হলো সামুদ জাতির পরিণাম।’ (সূরা হুদ, আয়াত : ৬৭-৬৮) গগনবিদারী আওয়াজ সামুদ জাতির কর্ণকুহরে আঘাত হানে। সেই আওয়াজে তারা নিজ গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে। একসময় যে জাতি পাহাড়ে ঘর নির্মাণ করত, পৃথিবীতে তাদের ওপর শক্তিশালী জাতি ছিল না। আসমানি আজাবে তারা মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। উদ্ধত সামুদ জাতির প্রতি হজরত সালেহ আ:-এর হুঁশিয়ারি সত্যিই বাস্তবায়িত হয়েছে। হঠাৎ এক দিন প্রচণ্ড শব্দে ভূমিকম্প তাদের নাস্তানাবুদ করে ফেলে। বজ্রপাতের শব্দে মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত আতঙ্কিত হয়ে যায়। অবশেষে তাদের অপমৃত্যু ঘটে।
নুহ আ:-এর জাতি মূর্তিপূজা করত। আল্লাহ তায়ালা নুহ আ:কে সুদীর্ঘ জীবন দান করেছিলেন। তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মূর্তিপূজা ত্যাগ করতে বলেছিলেন। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী অক্লান্ত দাওয়াত দেয়ার পরও তারা ঈমান আনেনি। তিনি তাঁর জাতিকে সত্যের পথে আনতে ৯৫০ বছর দাওয়াত দিয়েছেন। কিন্তু নুহ আ:-এর দাওয়াত তারা তাচ্ছিল্যভরে প্রত্যাখ্যান করে। তারা তাকে বলেছিল, হে নুহ! তুমি যদি বিরত না হও তবে পাথর মেরে তোমার মস্তক চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়া হবে।’ (সূরা শুয়ারা, আয়াত-১১৬) বহু চেষ্টায় অল্পসংখ্যক লোক তার পথে এসেছিল। তাঁর সময়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাঁর কথায় কর্ণপাত করেনি। নুহ আ: আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করেন কিন্তু তাদের চৈতন্যোদয় হয়নি। অবশেষে আল্লাহর আজাব আসে। এক ভয়ঙ্কর প্লাবন ও জলোচ্ছ্বাস তাঁর জাতির অবাধ্য লোকদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এমন প্লাবন তাদের গ্রাস করে ফেলেছিল, হাজার বছর ধরে তা পৃথিবীতে ইতিহাস হয়ে আছে। তখন নুহ আ:-এর নৌকায় যারা আশ্রয় নিয়েছিল তারাই রক্ষা পেয়েছিল। আল্লাহ বলেন, ‘আমি নুহের বংশধরদের অবশিষ্ট রেখেছি, বংশপরম্পরায়। (সূরা সাফ্ফাত, আয়াত-৭৭) সাম তিন ছেলের মধ্যে বড় ছিলেন। তিনি ছিলেন আরব জাতির পিতা। তার বংশধরদের মধ্যে ছিলেন- ইবরাহিম, ইসমাঈল ও ইসহাক আ:। ইসমাঈল আ:-এর বংশধর ছিলেন মানবজাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হজরত মুহাম্মদ সা:। ইসহাক আ:-এর বংশধরদের মধ্যে ছিলেন ইয়াকুব, মুসা, দাউদ, সোলায়মান, ইউনুস, ইলিয়াস, ঈসা আ: প্রমুখ নবী ও রাসূল।
এখন পৃথিবীর কিছু দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই। পৃথিবীতে এমন অনেক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আছে যা একনজরে দেখার জন্য সৌন্দর্যপিপাসুরা রীতিমতো ব্যাকুল থাকে। এমন কিছু জায়গার কথা নিম্নে আলোচিত হলো। পৃথিবীতে যত বড় ফুলের বাগান রয়েছে তার প্রায় সবই নেদারল্যান্ডসে। তেমনি একটি কিউকেনহফ। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ফুলবাগান। একে ‘কিচেন গার্ডেন’ বা ‘গার্ডেন অব ইউরোপ’ বলা হয়। পঞ্চদশ শতাব্দীতে শুরু করা এই বাগানে বর্তমান জমির পরিমাণ প্রায় ৮০ একর। এই বাগান থেকে প্রতি বছর ৭০ লাখের বেশি টিউলিপ উৎপাদন করা হয়। সাধারণত মার্চ মাসে বাগানটি উন্মুুক্ত করে দেয়া হয়।
ছোট-বড় প্রায় আড়াই হাজার দ্বীপ নিয়ে গঠিত মালদ্বীপ। সবগুলো দ্বীপই অপার সৌন্দর্য বহন করে সমুদ্রের বুকে স্থান করে নিয়েছে। পর্যটকদের কাছে ও মালদ্বীপ অন্য রকম আকর্ষণ।
বলিভিয়ার সালারদে ইয়ুনি পৃথিবীর বৃহত্তম আয়না। বর্ষাকালে বলিভিয়ার বৃহত্তম এই লবণভূমি বিশাল এক প্রাকৃতিক আয়না তৈরি করে। লবণের এই আশ্চর্য মরুভূমিকে দেখার জন্য প্রতি বছর ছুটে আসে হাজার হাজার পর্যটক আর ফটোগ্রাফার।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪ হাজার ফুট ওপরে অবস্থিত মরুভূমি আর পাহাড়বেষ্টিত এক প্রাকৃতিক নিসর্গের নাম প্যাংগং লেক। এটি ভারত ও চীনের সীমান্তবর্তী অঞ্চল লাদাখে অবস্থিত। এটি একেক ঋতুতে এক এক রূপ ধারণ করে। সুনীল এই লেকের অপার সৌন্দর্য অবলোকন করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
রহস্যময় এক গিরিখাতের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজনায়। লাখ লাখ বছর আগে জলপ্রবাহের ফলে সৃষ্ট এই গভীর ক্যানিয়নের দেয়ালে সূর্যরশ্মি আছড়ে পড়ে আশ্চর্য এক আলোক ছায়ার সৃষ্টি করে। রঙিন এ খেলা দেখার জন্য পর্যটকরা ছুটে আসেন এখানে।
ঝাংজিয়াজি ন্যাশনাল পার্কটি চীনের হুনান প্রদেশের তিয়ানমেন পর্বতে অবস্থিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার এ পার্কটি দিন দিন পর্যটকদের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। পার্কটি এক হাজার ৪১০ ফুট উঁচুতে নির্মাণ করা হয়েছে। অসম্ভব সুন্দর এক কাচের সেতু।
উইস্টেরিয়া একধরনের ফুলের নাম। এই ফুলের গাছ দিয়ে তৈরি উইস্টেরিয়া টানেল। জাপানের কাওয়াচি ফুজি গার্ডেনে ব্যক্তিমালিকানাধীন তৈরি করা হয়েছে এই টানেল। এপ্রিল মে মাসে যখন উইস্টেরিয়া ফুলের মৌসুম তখন এই টানেল সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।
নর্দার্ন লাইটস হলো অরোরা; অর্থাৎ আকাশে প্রাকৃতিকভাবে রঙের ছড়াছড়ি। এই অরোরা বেশ কয়েকটি দেশ থেকে দেখা যায়। অপার্থিব সৌন্দর্য দেখার জন্য মানুষরা এখানে ভিড় জমায়।
হা লংবে, ভিয়েতনামের কুয়ানিং প্রদেশে অবস্থিত এই যে একটি প্রাকৃতিক নিসর্গ। ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। হা লংবেতে আছে সুনীল পানি আর ছোট-বড় প্রায় দুই হাজার চুনাপাথরের দ্বীপ। এতে কয়েকটি ভাসমান গ্রাম ও কৃত্রিম গুহা আছে।
থাইল্যান্ডে ফি ফি দ্বীপপুঞ্জ। পর্যটকদের চিত্তকর্ষক ফি ফি দ্বীপপুঞ্জে রয়েছে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বিচিত্র সুবিধা। তারা চাইলে সেখানে ক্রুজিং, ক্লিফ ডাইভিং, রকক্লাইম্বিং, ফিশিং করতে পারবে। সাথে ‘বোনাস’ হিসেবে থাকবে মায়া উপসাগর।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
