পর্যাপ্ত আদালত সঙ্কট খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রথম বাধা। মামলার জট সৃষ্টি ও দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণে খেলাপি ঋণ আদায়ে পথে মূল প্রতিবন্ধকতা। খেলাপি ঋণ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ক্ষেত্রে মারাত্মক সঙ্কট সৃষ্টি করে। খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালত আইন-২০০৩ এর অধীনে ‘অর্থঋণ আদালত’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঋণ বা বিনিয়োগের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় বা জামানতের টাইটেল সঠিক না হওয়ার কারণে সরাসরি তা নিলামে বিক্রয় করা সম্ভব হয় না। সাব-রেজিস্ট্রি অফিস অনলাইন ডাটাবেজ না হওয়ায়ও একই ভূমি একাধিক ব্যাংকে বন্ধক দেয়ার বিষয় নিশ্চিত হওয়া যায় না। মামলার আধিক্য, খেলাপির সংখ্যা ও অন্যান্য কারণ বিবেচনায় চট্টগ্রামে আরো তিনটি অর্থঋণ আদালত প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও বাণিজ্যিক রাজধানী হলেও এখানে একটিমাত্র অর্থঋণ আদালত। অথচ একসময় এখানে চারটি বাণিজ্যিক ও অর্থঋণ আদালত ছিল। ঢাকায় পাঁচটি অর্থঋণ আদালত রয়েছে। সংবাদ সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতের জারি করা মামলার এক হাজার ৩৭৩টি ওয়ারেন্ট বিভিন্ন থানায় পড়ে আছে। যথাসময়ে এগুলো তামিল না হওয়ায় জনগণের হাজার কোটি টাকা আদায় হচ্ছে না। এভাবে এন আই অ্যাক্টের মামলার হাজার হাজার ওয়ারেন্ট, মাল ক্রোকি পরোয়ানা ও সাজা পরোয়ানা তামিল হচ্ছে না। বিজ্ঞ আদালতের আদেশ তামিল না হওয়া আদালত অবমাননার শামিল। এ ব্যাপারে পুলিশের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। নইলে আদালতের আদেশগুলো কার্যকর করা যাচ্ছে না। প্রয়োজনে ওয়ারেন্ট তামিলের জন্য জরুরি ভিত্তিতে পুলিশের একটি বিশেষ শাখা গঠনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগপৎ উদ্যোগ নেয়া দরকার। আদালতের ওয়ারেন্ট তামিলের অপেক্ষায় থাকতে হয় বছরের পর বছর। ফলে জারিকৃত মামলা নিষ্পত্তি হয় না।
নগরীর ১৬ থানায় শীর্ষ ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে পেন্ডিং থাকা ওয়ারেন্ট তামিল নিশ্চিত করতে সিএমপি কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সম্প্রতি অর্থঋণ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক মুজাহিদুর রহমান এ আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, শীর্ষ ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে এ আদালত থেকে ইস্যুকৃত গ্রেফতারি পরোয়ানাগুলো যথাসময়ে তামিল হচ্ছে না, যার কারণে অর্থঋণ আদালতে দায়েরকৃত মামলাগুলো আইনের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। এতে আদালতে মারাত্মক মামলাজট তৈরি হয়েছে। আদালতের গুরুত্বপূর্ণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। অন্য দিকে, ঋণখেলাপিরা ধরা না পড়ায় এই বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না। অথচ ‘ঋণখেলাপি ঠেকাতে বা ঋণ আদায় কার্যকর করার লক্ষ্যে’ ২০০৩ সালে বিশেষ আদালত হিসেবে অর্থঋণ আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়।
আদালত সূত্র আরো জানায়, ২০০৮ সালের ৩০ জুলাই পূবালী ব্যাংকের সিডিএ শাখা নগরীর সাজিল স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৯ কোটি ২৩ লাখ ১৫ হাজার ২৮৭ টাকা ঋণখেলাপির অভিযোগে একটি অর্থঋণ মামলা করে। পরের বছর ১২ মে এ মামলায় ব্যাংকের পক্ষে রায় হয়। রায়ে ৬০ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি টাকা পরিশোধ করেনি। একপর্যায়ে ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একটি জারি মামলা করে। ২০১৮ সালের ২৯ মার্চ প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি চেয়ে আবেদন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ৩ মে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। দেখা গেছে, এ গ্রেফতারি পরোয়ানা এখনো তামিল হয়নি।
অথচ গত ১৫ সেপ্টেম্বর পূবালী ব্যাংকের বোর্ড অব ডিরেক্টরস তাদের ১৩০তম সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক, সাজিল স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সুদ মওকুফ করে ৭ শতাংশ সরল সুদে সাত বছরে ২৩টি ত্রৈমাসিক কিস্তিতে আট কোটি ৭২ লাখ এক হাজার ৯২ টাকা পরিশোধের সুযোগ দেয়। আদালত সূত্র আরো জানায়, প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করেনি, বরং একটি মর্টগেজ বিষয় গোপন করে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে আদালতের কাছ থেকে গত ২৩ মে একটি আদেশ হাসিল করে। বর্তমানে দেশে ৩৪টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। খেলাপি ঋণসংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ৬৭ হাজার ১১৪ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১০ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অর্থঋণ আদালতে অনেক মামলা হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত রয়েছে।
মহামান্য হাইকোর্টে অর্থঋণ মামলা থেকে উদ্ভূত সব রিট, রিভিশন, আপিল, নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট বেঞ্চ সৃষ্টি প্রয়োজন। বর্তমানে ঋণগ্রহীতারা শুধু রিটের মাধ্যমে অর্থঋণ মামলার নিষ্পত্তিতে বাধা সৃষ্টি করছেন। এ ক্ষেত্রে রিট দায়েরের সময় ঋণের ১০ শতাংশ জমা দেয়ার মাধ্যমে রিট দায়েরের বিধান প্রয়োজন। চট্টগ্রামে বর্তমানে একটি অর্থঋণ আদালত। মামলার সংখ্যা এত অধিক যে, একটি কোর্টের পক্ষে এত অধিকসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি খুবই দুরূহ। তার জন্য কমপক্ষে আরো দু’টি আদালত প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। অর্থঋণ আদালত মামলার চেয়ে জারি মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। এ জন্য অর্থঋণ আদালত আইন-২০০৩ এর জারির বিধান ধারা ২৮-৩২-এর অধিকতর সংশোধন প্রয়োজন। এ ছাড়া চাহিদার চেয়ে দেশে অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা কম। আদালতগুলোর বিচারক সংখ্যাও যথেষ্ট নয়। নানা কারণে অর্থঋণ আদালতের মামলাজট তৈরি হচ্ছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর হয়রানিও বাড়ছে। মামলা ঝুলে থাকায় গ্রাহকরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) চেয়ারম্যান ও আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা এসব মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ান। আদালত থেকে বারবার স্টে অর্ডার বা স্থগিতাদেশ নিয়ে, মামলা নিষ্পত্তি করতে দেন না। ফলে শুধু বছর নয়, যুগের পর যুগ ঝুলে থাকে এসব মামলা।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের জুন পর্যন্ত আদালতে দায়ের করা মামলার সংখ্যা ২৮ হাজার ২০৭টি। এসব মামলার বিপরীতে অর্থের পরিমাণ ১২ হাজার ৮৯০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১০ হাজার ৭৭৫টি মামলা, যেখানে অর্থের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ২৫৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের জন্য পুনঃতফসিল পুনর্গঠন, এককালীন পরিশোধসহ গত এক দশকে ঋণখেলাপিদের জন্য একাধিক বিশেষ সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সব সুবিধা পেয়েও ঋণ পরিশোধ করছে না খেলাপিরা। ক্রমাগত বেড়েছে খেলাপি ঋণ।
অন্য দিকে দু-একটি ছোটখাটো ঘটনা ছাড়া ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার উদাহরণ তেমন চোখে পড়ে না। এমন পরিস্থিতিতে মামলাজট কমাতে বিশেষ আদালত চালু করার পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তানজীব-উল-আলম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশের মাধ্যমে অর্থঋণ আদালতের মামলা বছরের পর বছর আটকে আছে। এ ছাড়া চলমান মামলার বিচারকাজ অযৌক্তিকভাবে মুলতবি রাখা হয়। বিচারকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকায় এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হচ্ছে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশে যেসব মামলা স্থগিত রয়েছে, সেগুলো বাতিলের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে এ জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। স্থগিত মামলাগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির কাছে দিতে হবে। আইন মন্ত্রণালয় প্রধান বিচারপতির সাথে আলাপ করে এসব স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।’ এ ছাড়াও অর্থঋণ আদালত ও বিচারক বৃদ্ধি এবং দক্ষ বিচারক দিয়ে এসব মামলার বিচার পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে বলে মন্তব্য করেন। অর্থঋণ আদালত আইনের ২২ ধারায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকলেও ৯৫ শতাংশ মামলায় তা হয় না। চট্টগ্রাম গত এক বছরে ৯০০টি অর্থঋণ মামলা নিষ্পত্তি হয়। রায়ের আগে ক্রোক, বিভিন্ন জরুরি পিটিশন শুনানি ও নিষ্পত্তি, সাক্ষ্য গ্রহণ, যুক্তিতর্ক শোনা, আদেশ-রায় লেখাসহ নানা বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় একজন মাত্র বিচারককে দিন-রাত হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন কি সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও তাকে কাজ করতে হয়। জনগণের অর্থ আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনরত আদালতের সংখ্যা না বাড়ালে দেশের অর্থনীতির চাকা উল্টোদিকে ঘুরতে বাধ্য হবে। দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত প্রধান বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কমপক্ষে আরো তিনটি অর্থঋণ আদালত প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। হ
লেখক : কলামিস্ট, অ্যাডভোকেট ও মানবাধিকারকর্মী