এ জগতে মাকে যতই মমতাময়ী মনে করা হয় না কেন তার পেছনে একটা কারণ বিরাজমান। একমাত্র মায়ের মমতায়ই কোনো স্বার্থ থাকে না। তার মমতা নদীর স্রোতের মতো বহমান। যে মমতা সন্তানকে অনরবত ভিজিয়ে রাখে। সন্তানও তা যে উপলব্ধি করে না তা নয়। তবে দুনিয়া যেহেতু স্বার্থপরতায় নিমজ্জিত, সেখানে সন্তানদের অনেকটাই বাধ্য হতে হয় কৃত্রিম মমতায় গুরুত্ব দিতে, মানে অবজ্ঞা অবহেলা দেখাতে। কখনো কখনো এমনও হয় যে, সন্তান মায়ের চেয়েও কাউকে বেশি ভালোবাসে, তা দেখাতে তাদের সামনে মাকে অমর্যাদা করে বসে।
তা ছাড়া জামানা এমনই যে, সন্তানদের মধ্যে একপ্রকার উচ্চাকাক্সক্ষার প্রবণতা সৃষ্টি হয়ে গেছে যে, দেশ ছেড়ে বিদেশের প্রতি মোহ তৈরি হয়েছে দারুণভাবে। দেশ ছেড়ে বিদেশে যাওয়ার পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। দেশে যোগ্যতামাফিক চাকরি নেই, আবার চাকরি থাকলেও তা রাজনৈতিক কারণে যখন যে দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকে তারা ছাড়া অন্য কেউ যোগ্যতামাফিক চাকরি স্বপ্নেও দেখে না। অন্য দিকে বিদেশে যে সবাই যোগ্যতামাফিক চাকরি পায় তা নয়। তবে যেতে পারলেই হলো, দেশের তুলনায় আয় অনেক। কারণ ডলার-ইউরো। সবচেয়ে বড় কথা ওসব দেশের সুশৃঙ্খল জীবনধারা ভালো লেগে যায়, আর দেশে ফেরে না। ওসব দেশে এমন হয় না যে, আপনার কষ্টের পয়সায় কেনা বাড়িটি দখল হয়ে গেল দিনের আলোয় আপনাকে তাড়িয়ে দিয়ে। আপনার কষ্টের পয়সায় কেনা এক টুকরো জমি প্রভাবশালী কেউ দখল করে নিলো। আমাদের দেশে এমনও দেখা গেছে যে, সাত সন্তানের একটিও দেশে নেই, দেশে মা-বাবা পড়ে রয়েছে দেখার কেই নেই। এ বুড়ো-বুড়ির দু’জনের মধ্যে বুড়োর বয়স বেশি আমাদের দেশের প্রেক্ষাটটে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বুড়ো বয়সে বড়; তার তিরোধান আগে। মা একা। সুতরাং মা দিবসের তো প্রয়োজন অবশ্যই। যা কিছুরই শঙ্কাজনক অবস্থা তারই দিবস। যেমন ‘বিশ্ব বাঘ দিবস’, ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ প্রভৃতি। বছরে এক দিন বেশি আলোচনা। বিশ্ব দিবসে দিবসে বছর কাটিয়ে দিচ্ছে মানুষ। মা দিবসে মায়ের জন্য ফুল, কার্ড, দেশে সন্তান থাকলে দেখা করা, বিদেশে থাকলে ভিডিও কলে সময় করে একটু দেখা ও কথা বলা!
জগতে একমাত্র ব্যক্তি যাকে অবজ্ঞা অবহেলার পরেও মা মা-ই থেকে যান, তিনি শুধু দোয়া দেন, বিনিময়ে কিছু নাহি চান। এমন একটি নিরীহ প্রাণী যার এর বেশি প্রয়োজন নাহি হয়। বস্তুতপক্ষে মা একজন বোকা প্রাণী। তিনি সন্তান দ্বারা অবহেলিত হলে, নিগৃহীত হলে, এমনকি কখনো অসম্মানিত হলে রা করেন না। বরং সব অসুন্দর ব্যবহার যেন তিনি বুঝতেই পারেননি এমন ভাব দেখান। অন্যদের সামনে, এমনকি বাড়ির কাজের মানুষের সামনে অপদস্থ হলেও, বরং মনে মনে দোয়া পড়তে থাকেন ছেলেটা যেন কোনো প্রকার দুর্ঘটনা ছাড়াই অফিসে পৌঁছায়, ওর যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
এবার আসি আরেক প্রসঙ্গে। বিদেশে বসবাসরত সন্তানদের মায়ের সন্তানের কাছে থাকার ভাগ্য নেই। তাদের দিনগুলো একা একা কী কষ্টে কাটে তিনিই জানেন। বিদেশ তো বিদেশ, একই শহরে থেকেও ওই ভিডিও কলেই নাতি-নাতনীদের মুখ দেখতে হয়, তা-ও কতদিন পরে পরে। মোবাইল ফোনের ছবির উপর হাত বুলিয়ে ওদের ছোঁয়া পান যেমন করোনাকালে মানুষ গরুর গায়ে হাত বুলিয়ে আপন জনের ছোঁয়া উপলব্ধির চেষ্টা করে। সেখানেও বলি গরু তো একটি প্রাণী, ছবি তো তা-ও নয়।
এমনও দেখলাম যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মায়ের চারটি সন্তান তার জীবন গেল খুনির হাতে। কেউ কাছে থাকল না। কারো কাছেই থাকা হলো না। দুনিয়াতে মানুষ আসে একা, চলেও যায় একা। একা থাকাটা মায়েদের জীবনেই ঘটে বেশি। কেননা তারা সর্বংসহা ধরিত্রী।
আমার সহকর্মী প্রফেসর ড. হামিদা খানম একটি উদ্যোগ নিয়েছেন এসব একা থাকা মা-বাবার জন্য। তিনি সন্তানদের ডেকে কিংবা কাছে গিয়ে এটা বলা শুরু করেছেন যে, তোমরা সন্তানরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করো এবং কারো না কারো সাথে বাবা-মাকে রাখো। অথবা কেউ না কেউ বাবা-মায়ের সাথে থাকো। তাতে কাজ হয়েছে। অন্তত একটি তো দেখলাম। একাকী বাবা তার বিদেশে বসবাসরত চার সন্তানের একজন তার কাছে বাবাকে রাখার ব্যবস্থা করে নিয়ে গেছেন। বাবা না হয়ে মা হলে নিতেন কি না কিংবা মা যেতেন কি না জানি না। কারণ মায়ের মতো ত্যাগী ব্যক্তি ধরায় আর নেই।
সন্তানকে হয়তো বাড়তি কষ্ট দিতে চাইবেন না। কত কতজন মাকে সন্তানরা বস্তাবন্দী করে হাটবাজারের গাছতলায় কিংবা জঙ্গলে রেখে যায়, যাওয়ার সময় দয়া করে বস্তার মুখ খুলে দেয়। এসব মায়ের কেউই চিৎকার করেছেন বলে জানা যায়নি, বরং নীরব থেকেছেন, সন্তানকে করেছেন দোয়া। তার বাড়ি কোথায়, কী তার ঠিকানা, কী নাম সন্তানদের এ বিষয় কখনো মুখ খোলেননি। চুপটি থেকেছেন কিংবা বলেছেন তার এসব মনে নেই। কেননা তার মনে আছে শুধুই সন্তানদের জন্য দোয়া। আল্লাহর কাছেও এসব মা কিছু চাননি। সৃষ্টিকর্তার দয়ার প্রতিই বিশ্বাস রেখেছেন, বিচলিত হননি। হ
লেখক : প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান
প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এ জগতে মাকে যতই মমতাময়ী মনে করা হয় না কেন তার পেছনে একটা কারণ বিরাজমান। একমাত্র মায়ের মমতায়ই কোনো স্বার্থ থাকে না। তার মমতা নদীর...
