গত ২৮ মে শনিবার বর্তমান সরকারের একজন মন্ত্রী ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে প্রাণিসম্পদবিষয়ক এক আলোচনায় বলেছেন, ‘দেশের মানুষ এখন ইচ্ছা করলে তিন বেলা মাংস খেতে পারেন।’
তিনি সেখানে প্রাণিসম্পদবিষয়ক আরো কিছু কথা সে দিন বলেন। দেশের বেশির ভাগ গণমাধ্যমে এ সংবাদটি প্রকাশ হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি নিয়ে বেশ রসালো আলোচনা হয়। তা আবার ভাইরালও হয়েছে।
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও তাদের দলীয় বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে মন্তব্য করে মিডিয়ায় বেশ আলোচিত হয়েছেন। আগেকার এক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিছে’। তৎকালীন সময়ে শিশু নওশীন সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হলে নওশীনের পরিবারের লোকজনকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তিনি এমন কথা বলেন। এ কথা নিয়ে ওই সময় বেশ আলোচনা-সমালোচনা হয়। তিনি একসময়ে বিমান বাহিনীর প্রধান ছিলেন। ওই সময়ের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (নেত্রকোনা) মাথায় জেল মাখতেন! নিয়মিত মিডিয়াতে কথা বলতেন। মন্ত্রী একবার সন্ত্রাস দমন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন, উই আর লুকিং ফর দা শত্রুজ!
বর্তমান সরকার যাদের মন্ত্রী ও উপদেষ্টা বানিয়েছে তারা বিভিন্ন সময়ে হাজার রকম মন্তব্য করেছেন । সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যার বলা হয়েছিল- আমরা বেডরুমে গিয়ে তো পাহারা দিতে পারব না...। প্রবীণ এক অর্থমন্ত্রী (সাবেক) বলেছিলেন- রাবিশ, বোগাস, চার হাজার কোটি টাকা তেমন কিছুই না! বাণিজ্যমন্ত্রী (সাবেক) বলেছিলেন কম খেতে! তিনি কম খাওয়ার যে মন্তব্য বাণিজ্যমন্ত্রী থাকাকালে করেছিলেন তখন গাজীপুরের এক শ্রমিক নেতা (মরহুম) এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন কম খেতে, কখন যে বস্ত্রমন্ত্রী বলেন পোশাক না পরার জন্য! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (সাবেক) সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর বলেছিলেন, বিএনপি-জামায়াতের লোক ওই বিল্ডিংটাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে! উল্লেখ্য, এই ব্যক্তি একাত্তরে পাকিস্তান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ আমলা ছিলেন, যাদের দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করা। তিনি ১৯৯৬ সালে সরকারি কর্মচারীদের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মে নামিয়েছিলেন। পরে তিনি পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী পদ পান। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন, একটি ব্যাংকের মালিকও হন, আবার ব্যাংকটি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগের শেষ নেই। কোনো বিচার হয়নি! এই ১৪ বছরে যারা মন্ত্রী ও উপদেষ্টা হয়েছেন তাদের নিয়ে দেশের ভদ্রলোকরা বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন তাদের অতীত নিয়ে, চরিত্র নিয়ে।
সম্প্রতি যে মন্ত্রী বলেছেন, দেশের মানুষ এখন ইচ্ছা করলে তিন বেলা মাংস খেতে পারেন তিনি খুব পরিচিত ছিলেন না। তিনি ঢাকায় খুব বেশি বছর আগে আসেননি। ছিলেন একজন মফস্বল সাংবাদিক। তবে মিডিয়ার মাধ্যমে আইনজীবী হিসেবে তার পরিচিতি ঘটেছে। নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় তিনি টিভি টকশোতে বারবার দাওয়াত পেতেন। পরে গুরুত্বপূর্ণ দুই পদের পূর্ণ মন্ত্রী হয়ে যান। পৃথিবীতে দরিদ্র পরিবারের অনেক সন্তান বড় বড় পদপদবি পেয়েছেন, যাদের অ্যাকাডেমিক ডিগ্রিও ছিল না। কিন্তু তারা অনেকেই বেশ সফল হয়েছেন তাদের মহৎ কর্মের মাধ্যমে। বলিভিয়ার হুগো শ্যাভেজ কৃষক ছিলেন। কফি চাষি ছিলেন। লেখাপড়া খুবই কম ছিল। কিন্তু সফল রাষ্ট্রনায়ক হয়ে উঠেছেন। কে কোথা থেকে এসেছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কর্মদক্ষতা ও চরিত্র।

দেশের জনসংখ্যার বড় অংশই আজ চরম দরিদ্রতার মধ্যে। ডিম কিনে খেতে পারছে না অনেকে। সেখানে ৭০০-৮০০ টাকা কেজির গোশত (তাদের ভাষায় মাংস) কিভাবে তিন বেলা খাবেন? তারা ২০০১ থেকে এ পর্যন্ত টানা ২২ বছর যাদেরকে সমালোচনা করছেন, তাদের সরকারের আমলে গরুর গোশতের কেজি কত ছিল, আমরা ভুলে গেছি। মহিষ ও ভেড়ার গোশত আরো অনেক কম দামে কিনে খেতে পেরেছে মানুষ।
বিপুল মূল্যস্ফীতি ঘটেছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতনও দফায় দফায় বাড়ছে। সাধারণ মানুষের আয় তেমন বাড়েনি। মন্ত্রীরা অনেকেই নির্বাচনের আগে হলফনামায় সামান্য অর্থ দেখিয়েছেন। আজ তারা সবাই বড়লোক, অনেক অর্থের মালিক। মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবন বিলাসী জীবনে থাকেন। বাজারে যেতে হয় না। তারা কিভাবে দেশের নাগরিকদের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন!
ফ্রান্সের এক রানী সাংঘাতিক বিলাসী নারী ছিলেন। স্বর্ণ ও হীরা খচিত পোশাক পরতেন। বাসভবনে দামি কেক খেতেন। একসময় ফ্রান্সে দুর্ভিক্ষ এলো। রাজপথে ফ্রান্সের নাগরিকরা মিছিলে নামল। স্লোগান ছিল রুটি চাই, রুটি চাই। সেই মিছিল দেখে রানী রাজাকে বললেন, ওদের কী হয়েছে? রাজা বললেন ওরা রুটি চায়। দেশে রুটির ঘাটতি। রানী বললেন, রুটি নেই, কী হয়েছে? ওরা কেক খেতে পারে না? রাজপ্রাসাদে থেকে বুঝতেই পারতেন না যে কোটি কোটি নাগরিককে কেক বানিয়ে খাওয়ানো সম্ভব নয়। সেই অর্থ রাষ্ট্রের নেই।
গত ১ জুন দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি ছবি প্রকাশ হয়েছে যে ছবি দেখে হৃদয়বান যে কেউ কাঁদবেন। ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় টিসিবির পণ্য বিক্রি হচ্ছিল। এক নারী তার তিন বছরের শিশুকন্যাকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে। এর মাঝে ওই ছোট্ট শিশু টিসিবির ট্রাকের নিচে গিয়ে ময়লা-আবর্জনার মধ্যে পড়া চাল পলিথিনে উঠাচ্ছিল। এরকম দৃশ্য আজ সমগ্র বাংলাদেশে।
সেই সময়ে মন্ত্রী বলছেন- এখন দেশের মানুষ ইচ্ছা করলে তিন বেলা মাংস খেতে পারেন। এটা দেশের মানুষের সাথে উপহাস করার শামিল।