আল্লাহপাক সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত। তিনি আদি, তাই তার আগে কিছু নেই। তিনি অন্ত, তাই তাঁর পরে কিছু নেই। তিনি গুপ্ত, তাই তাঁর পেছনে কিছু নেই। তিনি আপন কামালিয়াতের যাবতীয় গুণাবলি অনাদিসহ অনন্ত, অক্ষয়, অব্যয় চিরন্তন সত্তা। আঁধার রাতের নিরেট কালো পাথরের উপর কালো পিঁপড়ের পদচারণা এবং ক্ষুদ্র বালুকণার সংখ্যা সম্পর্কেও তিনি সম্যক অবহিত। তিনি মহা উন্নত, মহান ও মহিমান্বিত। সবকিছু সৃষ্টি করেছেন তিনি নিখুঁত পরিকল্পনা অনুসারে! প্রতিদিন তার ৩৬০টি ক্ষণ আছে। তিনি সৃষ্টি করেন, জীবিকা দান করেন, মৃত্যু দেন, জীবন দেন, সম্মানিত করেন, অপমানিত করেন এবং যা খুশি তা-ই করেন। যে ব্যক্তি আল্লাহতে ঈমান আনবে, তাঁর প্রতিশ্র“তিকে সত্য বলে স্বীকার করবে এবং তাঁর রাসূলের অনুসরণ করবে; তাকে তিনি জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
তিনি, মহান স্রষ্টা, স্থাপন করেছেন আকাশ, তাতে স্থাপন করেছেন সুদীপ্ত সূর্য ও জ্যোতির্ময় চন্দ্র এবং তার উপর তৈরি করেছেন সুউচ্চ, প্রশস্ত ও গোলাকার সিংহাসন। যার আছে বিরাট বিরাট স্তম্ভ। যা বহন করেন সম্মানিত ফেরেশতারা, যা ঘিরে আছেন নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারা! আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা গাওয়াই যাদের একমাত্র কাজ। প্রতিদিন তাদের মধ্য থেকে ৭০ হাজার ফেরেশতা চতুর্থ আসমানে অবস্থিত বায়তুুল মামুরে হাজির হন। দ্বিতীয়বার আর সেখানে তাদের আগমন ঘটে না। সৃষ্ট জীবের জন্য পানির তরঙ্গের ওপর সৃজন করেছেন তিনি পৃথিবী, তার উপর স্থাপন করেছেন সৃদৃঢ় পর্বতমালা, আর আকাশ সৃষ্টিরও আগে চার দিনে তাতে ব্যবস্থা করেন তার জীবিকা এবং তাতে জোড়ায় জোড়ায় সব কিছু সৃষ্টির বিষয়টি স্থির করেছেন। মাটি থেকে তিনি মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন এবং নিরাপদ আধারে তুচ্ছ পানির নির্যাস থেকে তার বংশধর সৃষ্টি করে উল্লেখযোগ্য কিছু না থাকার পর তাকে শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন, আর শিক্ষা দান করে তাকে করেছেন সম্মানিত। আদি পিতা আদম আ: কে নিজের পবিত্র হাতে সৃষ্টি করেছেন তিনি, গঠন করেছেন তার অবয়ব। নিজের পক্ষ থেকে তাঁর মধ্যে সঞ্চার করেছেন আত্মা এবং ফেরেশতাদেরকে তাঁর সামনে করিয়েছেন সিজদাবনত। তারপর তার থেকে তার সহধর্মিণী আদি মাতা হাওয়া আ:কে সৃষ্টি করে দূর করে দিয়েছেন তার নিঃসঙ্গতা এবং তাদের বসবাস করতে দিয়েছেন তাঁর জান্নাতে এবং পূর্ণমাত্রায় দান করেছেন অফুরন্ত নিয়ামত।
তারপর তাঁর মহা প্রজ্ঞাময় পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের নামিয়ে দেন পৃথিবীর মাটিতে এবং তাদের থেকে বিস্তার ঘটিয়েছেন অসংখ্য নর-নারীর। তাদের বিভক্ত করেছেন রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, স্বাধীন ও অধীন নর-নারীতে এবং তাদের বসবাস করতে দিয়েছেন পৃথিবীর আনাচে-কানাচে।
বংশপরম্পরায় বিচার দিনে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত তাদের অধীন করে দিয়েছেন ছোট-বড় নদ-নদী, উৎসারিত করে দিয়েছেন প্রয়োজন অনুসারে কূপ ও ঝর্ণারাজি এবং ভারী বর্ষণ করে উৎপন্ন করেছেন রকমারি শস্য ও ফলমূল। সর্বোপরি তিনি তাদের দান করেছেন প্রয়োজন অনুসারে সব কিছু। অতএব, পবিত্রতা ঘোষণা করছি সে সত্তার, যিনি মহানুভব, মহান ও পরম সহনশীল। মানব সৃষ্টি, তাদের জীবিকা প্রদান, তাদের পথ সুগম করে দেয়া এবং তাদের বাকশক্তি দান করার পর তাদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ একটি নিয়ামত ও অনুগ্রহ হলো এই যে, তিনি তাদের কাছে প্রেরণ করেছেন তার নবী-রাসূলদেরকে এবং নাজিল করেছেন তার হালাল-হারাম, যাবতীয় সমাচার ও বিধিবিধান এবং সৃষ্টির সূচনা ও পুনরুত্থানসহ কিয়ামত পর্যন্ত সংঘটিতব্য সব কিছুর বিশদ বিবরণ সম্বলিত কিতাবগুলো। সুতরাং ভাগ্যবান সেই ব্যক্তি যে সমাচারগুলোকে সত্য বলে মেনে নেয়, সাথে সাথে আদেশগুলোকে বশ্যতা ও নিষেধগুলোকে শ্রদ্ধার সাথে মেনে নিয়ে স্থায়ী নিয়ামতরাজি লাভে ধন্য হলো। তোমাদের সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আকাশ সৃষ্টি? তিনিই না নির্মাণ করেছেন। তিনি একে সুউচ্চ ও সুবিন্যস্ত করেছেন। তিনি রাতকে করেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং প্রকাশ করেছেন সূর্যলোক ও পৃথিবীকে এতপর বিস্তৃত করেছেন। তিনি তা থেকে নির্গত করেছেন পানি ও তৃণ এবং পর্বতকে তিনি দৃঢ়ভাবে পতিত করেছেন; এসব তোমাদের ও তোমাদের গবাদিপশুর ভোগের জন্য। আল্লাহ তায়ালা মাটি শনিবার, পাহাড়-পর্বত রোববার, গাছপালা সোমবার ও অপ্রীতিকর বস্তুসমূহ মঙ্গলবার সৃষ্টি করেছেন, বুধবার নূর (জ্যোতি) সৃষ্টি করেন এবং কীট-পতঙ্গ ও ভূচর জন্তুগুলোকে বৃহস্পতিবার পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি আদমকে সৃষ্টি করেছেন জুমার দিন আসরের পর। আদমই সর্বশেষ সৃষ্টি, যাকে জুমার দিনের সর্বশেষ প্রহরে আসর ও রাতের মাঝামাঝি সময়ে সৃষ্টি করা হয়েছে।
আল্লাহর আরশ ছিল পানির উপর। পানির আগে তিনি কিছুই সৃষ্টি করেননি। তারপর যখন তিনি মাখলুক সৃষ্টি করতে মনস্থ করেন তখন পানি থেকে ধোঁয়া আকারে বাষ্প বের করেন। ফলে তা পানির উপরে উঠে যায়। তারপর পানি শুকিয়ে একটি জমিনে রূপান্তরিত করেন। তারপর তা পৃথক করে দু’দিনে (রবি ও সোমবার) সাত জমিনে পরিণত করেন। পৃথিবীকে আল্লাহ তায়ালা একটি মাছের উপর সৃষ্টি করেন। মাছ হলো পানিতে আর পানি হলো সিফাতের ওপর আর সিফাত হলো এক ফেরেশতার পিঠের উপর আর ফেরেশতা হলো একখণ্ড পাথরের উপর আর পাথর হলো মহাশূন্য। এ সেই পাথর যার কথা লোকমান আ: উল্লেখ করেছেন, যা আকাশেও নয়, পৃথিবীতেও নয়। মাছটি নড়ে উঠলে পৃথিবী প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। তাই আল্লাহ তায়ালা মঙ্গলবার দিন পাহাড়-পর্বত ও তার উপকারিতা, বুধবার গাছপালা, পানি, শহর-বন্দর এবং তাবৎ বিনাশ সৃষ্টি করেছেন এবং পরস্পর ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকা আকাশকে পৃথক পৃথক করেছেন। বৃহস্পতি ও শক্র-এ দু’দিনে তিনি সাত আকাশে পরিণত করেন। উল্লেখ্য, জুমার দিনকে জুমা বলে এ জন্য নামকরণ করা হয়েছে যে, এ দিনে আকাশগুলো ও পৃথিবী সৃষ্টির সমাবেশ করা হয়েছিল এবং প্রত্যেক আকাশে তাঁর বিধানের প্রত্যাদেশ দেয়া হয়েছিল। তারপর তিনি প্রত্যেক আকাশে ফেরেশতা, পাহাড়-পর্বত, সাগরমালা, তুষার পর্বত ও এমন বস্তু সৃষ্টি করেন, যা তিনি ছাড়া অন্য কেউ জ্ঞাত নয়। তারপর আকাশকে নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুশোভিত করে তাকে সুষমামণ্ডিত ও শয়তানের কবল থেকে সুরক্ষিত করেছেন। তারপর ইচ্ছামতো সৃষ্টিপর্ব শেষ করে তিনি আরশের প্রতি মনসংযোগ করেন। আল্লাহ সৃষ্টিকার্য শেষ করে আরশের উপর তাঁর কাছে থাকা কিতাবে লিপিবদ্ধ করে রাখেন যে, নিঃসন্দেহে আমার রহমত আমার ক্রোধের ওপর প্রবল। পৃথিবীতে যত সাগর-মহাসাগর আছে এর সমপরিমাণ আরো সাতগুণ সাগর যোগ হলে এবং এই সমুদয় সাগরের পানি কালি হলেও আল্লাহর রহমত, বরকত, হিকমত, কুদরত ও মহিমা লিখে শেষ কার যাবে না।
লেখক : কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
belayet_1@yahoo.com
