বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের কারোরই অজানা নয়। যে হারে ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে এবং প্রতিনিয়ত বাড়ছে তা নিকট অতীতে আর কখনো দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষ কতটা নাজুক পরিস্থিতিতে আছে তা বলে বুঝানো যাবে না। এ নিয়ে সরকারেরও মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। কারণ এক মন্ত্রী বলেন, আমরা বেহেশতে আছি, আরেক মন্ত্রী বলেন, জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় এখন পর্যন্ত কেউ মারা যায়নি। আমি সে আলোচনায় যাব না। সেসব কথার পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টা কথা বলতে যাওয়াটা সময় ও শ্রম দুটোরই অযথা অপচয় বলে মনে করছি।
আমার আজকের আলোচনার মূল বিষয় হচ্ছে সিন্ডিকেট। এ দেশ যেন একটি সিন্ডিকেটের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছে। সব ক্ষেত্রেই সিন্ডিকেট। কাঁচাবাজারে সিন্ডিকেট, মুদিবাজারে সিন্ডিকেট। পেঁয়াজে সিন্ডিকেট, ডিমে সিন্ডিকেট। সড়কে, চাকরিতে, খেলাধুলায়, মার্কেটে সর্বত্র সিন্ডিকেট। এই সর্বগ্রাসী সিন্ডিকেট থেকে দেশ কবে মুক্তি পাবে- এই প্রশ্ন কাকে করব তা বুঝতে পারছি না। আর এই প্রশ্ন করাটাই অবান্তর এখন।
মাঝে মধ্যে চিন্তা হয়, যারা এই সিন্ডিকেট করে তাদের কি মানুষের প্রতি দয়া-মায়া, মনুষ্যত্ব, মানবতা বলতে কিছুই নেই! এই যে তেলের দাম বেড়েছে এই অজুহাতে ভোগ্যপণ্যের দাম দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, এটি কি কোনো সভ্য সমাজে হয়? এই অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর কোনো না কোনো সময় সাধারণ মানুষের সাথে এই দাম বাড়ানোর খেলায় মেতে থাকে। কারণ তারা জানে, মানুষের খেতে হবে। কিন্তু এবার সেটিকে আকাশচুম্বী করে ছেড়েছে তারা।
তেলের দাম বাড়ানোকে ঘিরে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। মুরগি, ডিম, শাকসবজি এমন কিছু বাদ রাখেনি যা বাড়ানো হয়নি। কিন্তু এভাবে আর কত? এই যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। সড়কে গাড়িতে উঠলে দেখা যায় দ্বিগুণ ভাড়া। যে ভাড়া এক সময় পাঁচ থেকে আট টাকা ছিল সে ভাড়া এখন ১০ থেকে ১৫ টাকা করেছে গণপরিবহনগুলো। কিন্তু সাধারণ মানুষের উপায় কী? নিজের কাজ, অফিসে, স্কুলে যেতে তো হবে সবাইকে।
ডাকাতরা অস্ত্র ধরে ডাকাতি করে। আর আমাদের দেশে ডাকাতি হচ্ছে ভিন্ন পন্থায়। সিন্ডিকেট করে সব কিছুর দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে করে ফেলে জিম্মি। সাধারণ মানুষ না পারে প্রতিবাদ করতে, না পারে নিজের পেটকে কষ্ট দিতে। কারণ খেতে তো হবে। স্ত্রী-সন্তানের মুখে তো খাবার তুলে দিতে হবে। তা ছাড়া আপনি আন্দোলন করবেন, প্রতিবাদ করবেন অথচ আপনার আশপাশের মানুষজন থাকবে নিশ্চুপ। তাহলে দিন শেষে তো আপনিই কষ্ট পাবেন। আপনার পরিবার না খেয়ে থাকলে তো কেউ জিজ্ঞেসও করবে না, খেয়েছে কি না।
এই যখন সমাজের চিত্র তখন তামাশা দেখা আর মুখবুজে সহ্য করা ছাড়া আর উপায় কী? এই অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যতদিন সাধারণ মানুষ এক হয়ে রাস্তায় নামতে পারবে না ততদিন দেশে এই সিন্ডিকেট জারি থাকবে। একসময় তেলের দাম কমবে। কিন্তু কমবে না আমাদের ভোগ্যপণ্যের দাম। আপনি যদি বলেন কমেছে তো, তাহলে আপনি হিসাবে পাক্কা নন সেটিই বোঝা যায়। আপনার পণ্যের দাম বাড়িয়েছিল দ্বিগুণ, কিন্তু অর্ধেক দাম কমিয়েছে কি-না খোঁজ রাখবেন। সুতরাং আমরা এই সিন্ডিকেট ব্যবসার জালে ফেঁসে গেছি। এই জাল ভেদ করতে হলে সর্বস্তরের মানুষকে একসাথে এক হয়ে রাস্তায় নামতে হবে। এটি কোনো দলের জন্য নয়, এটি দেশের জন্য, নিজেদের জন্য।
রাজনীতির প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে ভাবতে হবে সাধারণ মানুষের কথা। কারণ বুভুক্ষু মানুষের কাছে রাজনীতি বড় বিষয় নয়, গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থাটাই বড়। পেটে ভাত না পড়লে তো রাস্তায়ও নামতে পারবেন না। তাই নড়বড়ে ইস্যু নিয়ে রাজপথ গরম না করে এ সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, আন্দোলন করি। আপনি যদি বিত্তবান হয়ে থাকেন, দ্বিগুণ দামে সব ক্রয় করেও সুখে থাকেন তাহলে এই ব্যথার মর্ম আপনি বুঝবেন না। তা ছাড়া আমার জানামতে, এ দেশের বেশির ভাগ মানুষই মধ্যবিত্ত ও নি¤œ মধ্যবিত্ত।
তাই আমাদের খেয়ে-পরে বাঁচতে হলে অবশ্যই এই সিন্ডিকেট সন্ত্রাসীদের দমন করতে হবে। জানি না সরকার এই সিন্ডিকেট সন্ত্রাসীদের রুখবে কি-না, নাকি উল্টো আন্দোলনে নামলে জনগণকেই রুখে দেবে। দেশের মানুষের সমস্যাকে গুরুত্ব দেয়া সরকারের প্রথম ও প্রধান কাজ। সরকার এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসবে ও অসাধু ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনবে সেই প্রত্যাশা রাখছি। অন্যথায় রাজপথে নামবে সাধারণ মানুষ। সেদিনের পরিস্থিতি আসতে খুব দেরি নেই। তাই সরকারের কাছে অনুরোধ, দয়া করে এই সিন্ডিকেট সন্ত্রাসীদের দমন করতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। হ
লেখক : রিপোর্টার, চট্টগ্রাম সময়
