বিশ্বব্যাপী নারী ও মেয়েদের প্রতি নির্যাতন ও তাদের দুর্দশা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২৫ নভেম্বর বাংলাদেশসহ সারা বিশে^ আন্তর্জাতিক নারী সহিংসতা প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়ে থাকে। দিনটি নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিক্রিয়া জানাতে এবং নারীর মৌলিক মানবাধিকার ও লিঙ্গ সমতা সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
নারী এবং মেয়েরা ঘরে বাইরে সর্বত্র কোনো না কোনোভাবে নির্যাতিত। নারীর প্রতি সহিংসতা বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর কারণ মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক ইত্যাদি। এগুলো আমাদের সমাজজীবনে ছড়িয়ে পড়লেও এর ক্ষতিকর দিকটি ভয়াবহ। মোবাইলে টিকটকের দৌরাত্ম্য ছোট ছোট মেয়েদেরকে আনন্দ দিতে গিয়ে সর্বনাশের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
এ দেশে নারী নির্যাতনের চিত্র ভয়াবহ। সরকারি হিসেবেই ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ নারী পারিবারিক পরিসরে স্বামী বা ঘনিষ্ঠজন বা শাশুড়ি কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়। মানসিক নির্যাতন তো দূরের কথা, নারীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা যে একটি শুরুতর অপরাধ, এ ব্যাপারে অনেক পুরুষ বা স্বামীর ধারণাই নেই। বিয়ের পর অনেক মেয়ে যৌতুকের জন্য শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। প্রতি বছর এ দেশের হাজার হাজার নারী, মেয়ে বা কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হলেও বেশির ভাগ ধর্ষকই অনুতপ্ত হয় না। এ ক্ষেত্রে আইনের দুর্বলতা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। যখন তার সহিংস আচরণ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে তখনই নারী নির্যাতনের মাত্রা কমে আসবে। তবে গরিব ও দরিদ্র দেশে এ সমস্যা জটিল। গরিব পরিবারে মেয়েদের বাল্যবিয়ের কারণে নির্যাতনের মাত্রা অনেক বেশি। কাজের বুয়া বা যারা অভাবের জন্য বাসা-বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে থাকে তারাও লোভ-লালসার পাল্লায় পড়ে অনেক ক্ষেত্রে সর্বনাশের পথে পা বাড়াতে বাধ্য হয়। ইটিও এক ধরনের নির্যাতন। বর্তমানে সমাজে যতগুলো সামাজিক সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে নারী নির্যাতন অন্যতম। সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী একটি জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বে নারী নির্যাতনের হারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ চিত্র আমাদের দেশের জন্য লজ্জাজনকই নয়; বরং আমাদের সমাজজীবনে একটি চরম উদ্বেগের বিষয়। এ ছাড়াও মেয়েদের উদ্দেশে ছুড়ে দেয়া বিশ্রী মন্তব্য, শিস দেয়া, ওড়না ধরে টান দেয়া, ভিড়ের মধ্যে ধাক্কা দেয়া, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করা, যানবাহনে নারীদের স্পর্শ করা ইত্যাদি নানা ধরনের অনৈতিক কাজই হচ্ছে ইভটিজিং। তারপর বিনা অনুমতিতে মেয়েদের ছবি তোলা, মিসকল দেয়া, আপত্তিকর মেসেজ পাঠানো, ফেসবুকে নোংরা ছবি বা কুমন্তব্য প্রেরণ এর সব কিছুই ইভটিজিংয়ের আওতাভুক্ত।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান নিশ্চিত করেছে, কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন এবং চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অভাব-অনটনের এই সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা অনেক বেড়েছে।
নারী ও মেয়েদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের ক্ষমতায়ন ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার উন্নত করা প্রয়োজন। এখন সময় এসেছে, নারীর প্রতি নির্যাতন বন্ধ করে তাদের অধিকার নিশ্চিত করার এবং আগামীতে সবাই মিলে কিভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা দূর করা যায় সে উপায় বের করার। নারী ও মেয়েদের প্রতি সহিংসতা বিষয়ে আরো বেশি জনসচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে এতে কারো সন্দেহ নেই। সমাজের সব স্তরের নারীরা যাতে নির্যাতনহীন ও বাধ্যবাধকতামুক্ত জীবন উপভোগ করতে পারে তার নিশ্চয়তা দিতে আজ প্রতিটি জাতিরই সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন রয়েছে।
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার অবসান ঘটাতে প্রচারাভিযান, সচেতনতা সৃষ্টি, বিশেষ করে ধর্ষণের বিরুদ্ধে নারী সংগঠনগুলোর সোচ্চার বা সাহসী ভূমিকা পালনের বিকল্প নেই।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী
বিশ্বব্যাপী নারী ও মেয়েদের প্রতি নির্যাতন ও তাদের দুর্দশা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২৫ নভেম্বর বাংলাদেশসহ সারা বিশে^ আন্তর্জাতিক নারী সহিংসতা প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়ে...
