ইসলাম বিশ্ব স্রষ্টা আল্লাহর শুধু মনোনীত ধর্মই নয় এবং মানুষের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এ ধর্মে রয়েছে দুনিয়ার শান্তি ও পরকালের কল্যাণের নিশ্চয়তা। এই ধর্মের মানুষকে কঠোর নিয়ম ও শৃঙ্খলা মেনে প্রতিদিন চলতে হয় এবং বৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ দ্বারা জীবনযাপন করতে হয়। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিতভাবে আদায় করতে হয়, যা অন্যায় ও অপকর্ম থেকে মানুষকে বিরত রাখে। বর্তমান বিশ্বে ৮০০ কোটি মানুষের মধ্যে ইসলামের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি। স্বাধীন মুসলিম দেশের সংখ্যা ৫৬। এসব দেশ থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ পবিত্র হজ ও ওমরা পালনের জন্য সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় ভ্রমণ করে থাকেন।
ইসলাম ধর্ম মূলত পাঁচটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম। তাই হজ ও ওমরা পালন মুসলমানের মৌলিক অধিকার। যেসব মুসলমান আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং পারিবারিক ব্যয় মিটানোর পর মক্কা ও মদিনায় যাওয়া-আসার অর্থ থাকে তাদের ওপর আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে হজ ও ওমরা পালন ফরজ করে দিয়েছেন। অস্থায়ী দুনিয়ায় জীবনযাপনের ক্ষেত্রে মানুষ অনেক ভুল ভ্রান্তি ও পাপ কাজে লিপ্ত হয়। পবিত্র হজ ও ওমরা পালনের মাধ্যমে মানুষের গোনাহ আল্লাহপাক ক্ষমা করেন। তাই মানুষের জীবনের শেষ ভাগে গোনাহ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য অর্থ সংগ্রহ করে হজে গমন করে পাক পবিত্র হয়ে দেশে ফিরে আসেন। যারা আল্লাহর নির্দেশে হজ ও ওমরা পালন করেন তারা আল্লাহর মেহমান এবং এ হাজীদের দোয়া আল্লাহপাক মঞ্জুর করেন। আর সৌদি আরব সরকার এ হাজীদের থাকা ও খাওয়ার সুব্যবস্থা করেন। এতে সৌদি সরকার ও জনগণ আর্থিকভাবে লাভবান হন।
করোনাভাইরাস কোভিড-১৯ সৌদি আরবসহ সারা বিশ্বের মানুষের মধ্যে প্রাদুর্ভাবের ফলে বিগত দুই বছর থেকে সৌদি সরকার পবিত্র হজ ও ওমরা পালন স্থগিত ও সীমিত করেছিলেন। করোনাভাইরাস সারা বিশ্বের মানুষের পাপের কর্মফল বেদী, যার মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে আল্লাহ এক সতর্ক বার্তা দিয়েছেন। এই বার্তায় প্রমাণ করে যে, বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা: শেষ নবী এবং তারপর আর কোনো নবী নাই, ইসলাম আল্লাহ মনোনীত সত্য ও শান্তির ধর্ম। কেননা যুগে যুগে আল্লাহ মানুষের হেদায়েতের জন্য নবী ও রাসূল দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন। যেমন : হজরত নূহ আ:, হজরত ইব্রাহিম আ:, হজরত মুসা আ:, হজরত সুলাইমান আ:, হজরত ঈসা আ: ও বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:। আমাদের বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর মৃত্যুর প্রায় ১৩০০ বছর পরও কোনো নবী-রাসূল দুনিয়াতে প্রেরণ করেন নাই। এবং এই করোনাভাইরাস পৃথিবীতে আবির্ভূত হলো মানুষের আজাব হিসেবে, যাতে মানুষ ভ্রান্ত পথ ত্যাগ করে সত্য ও সঠিক পথে ফিরে আসে। করোনাভাইরাস একযোগে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো সাধ্যে নেই। তাই আল্লাহ সর্ব বিষয়ের ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। করোনাভাইরাস চীনের উহান শহরে আবির্ভূত হলেও অতি অল্প সময়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্রে নোঙরকৃত সুরক্ষিত নৌবহরের নাবিকদের আক্রমণ করে পরাজিত করে এবং করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী সাবেক রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম হতবাক হন এবং তিনি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হন। ইসলামবিরোধী ইসরাইলের কৌশলগত মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে এই করোনায় যথাক্রমে এগারো লাখ ও সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহর কী অসীম রহমত! দরিদ্র মুসলিম দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখুন, করোনাভাইরাসের আক্রমণ যেমন তুলনামূলক কম তেমনি মৃত্যুর হারও কম। তবে বাংলাদেশ অনেক জ্ঞানী, গুণী, এমপি, মন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, প্রধান আইন কর্মকর্তা ও ট্রাইব্যুনালের বিচারককে এই করোনায় হারিয়েছে। তাই করোনাভাইরাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত এবং মিথ্যাচার, অনাচার, অবিচার, জুলুম, হত্যা, ধর্ষণ, হানাহানি, যুদ্ধবিগ্রহ ইত্যাদি পাপ কাজ থেকে বিরত থেকে মানুষের উচিত ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণ সাধন করা। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণার প্রয়োজন। করোনাভাইরাস কোভিড-১৯ সমাপ্তিতে, সৌদি সরকার ২০২৩ সালে স্বাভাবিকভাবে হজ ও ওমরা পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
বাংলাদেশের একটা রেওয়াজ হয়ে গেছে যে শকুনি যেমন আকাশ থেকে তাকিয়ে থাকে মরা গরুর দিকে তেমনি বাংলাদেশ বিমান এয়ার লাইন্স হজযাত্রীদের পরিবহনের দিকে তাকিয়ে থাকে তাদের লাভের আশায়। বাংলাদেশ বিমান আন্তর্জাতিক পরিবহনে কোটি কোটি টাকা লোকসান দিলেও হজযাত্রীদের ওপর জোর জুলুম করে সেই লোকসান পূরণ করে লাভ করে থাকে। আল্লাহর মেহমানের ওপর জুলুম করে ব্যবসা করা উচিত নয়। একজন হজযাত্রীকে সৌদিতে আসা-যাওয়ার জন্য দুই টিকিটের পরিবর্তে চার টিকিটের বিমান ভাড়া দিতে বাধ্য করা হয়। অজুহাত শুধু, ফিরতি ফ্লাইটে যাত্রী কম থাকে। এ জন্য কি হজযাত্রীরা দায়ী? এ দায় বিমানের কর্মকর্তাদের অদক্ষতা। বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’ রয়েছে। সাধারণ যাত্রী ও হজ যাত্রীদের বিমান ভাড়ার এ বৈষম্য সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ও আইনের পরিপন্থী। এ বৈষম্য অগ্রহণযোগ্য ও বেআইনি। ঈমানদার হজযাত্রীরা এ অন্যায় ও অবিচার নীরবে সহ্য করেন এবং জাতীয় সংসদেও কেউ এ ব্যাপারে কথা বলেন না। হজযাত্রীরা কি এ দেশের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক এবং তাদের দুই টিকিটের বিমান ভাড়ার স্থলে চার টিকিটের বিমান ভাড়া দিতে হবে কেন? অথচ আন্তর্জাতিক পরিবহনে বিমানের সিট খালি থাকে। বাংলাদেশ বিমানের এয়ার লাইন্স হজযাত্রীদের সেবামূলক দায়িত্ব যদি পালন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সহায়তা নেয়া উচিত, যাতে হজযাত্রীদের কষ্ট ও দুর্ভোগ লাঘব হয়।
আর সৌদি আরবে দুই লাখ বাংলাদেশী শ্রমিক কর্মরত আছেন, তারা যাতে ছুটিতে দেশে আসতে পারেন সেজন্য হজ মৌসুমে শুধু একমাস তাদের বিমানভাড়া ২০% হ্রাস করলে বিমানের লোকসান মিটানো যায়। বিগত ২০০৫-২০০৬ সালে একজন হজযাত্রীর সর্বমোট ব্যয় ছিল এক লাখ পঁচিশ হাজার টাকা। আর বর্তমানে একজন হজযাত্রীর সর্বনি¤œ ব্যয় ধরা হয় পাঁচ লাখ টাকা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে হজযাত্রীরা বৃদ্ধ বয়সে সহায়সম্পত্তি বিক্রি করে পাঁচ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। এভাবে কতজন মধ্যম আয়ের হজযাত্রী হজ পালনে সৌভাগ্যবান হবেন তা সরকারকে ভেবে দেখা উচিত। বর্তমান বাংলাদেশ বিমান এয়ার লাইন্স আধুনিক বিমান সংগ্রহ করে লাভজনক অবস্থায় আছে। তাই হজযাত্রীদের সৌদি আরবে যাওয়া-আসা বাবদ দুই টিকিটের বিমান ভাড়া হ্রাসকৃত মূল্যে নির্ধারণ করে আসন্ন ‘২০২৩ হজ নীতিমালা’ প্রণয়ন করে আল্লাহর মেহমান হজযাত্রীদের আর্থিক দুর্ভোগ নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য ইসলামবান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সদয় বিবেচনা করতে পারেন।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সচিব (অব:)
বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা।