আজকের লেখার শিরোনাম পবিত্র কুরআনুল কারিমের ২৯ পারার ৬৭ নম্বর সূরা ‘মুলক’ এর প্রথম আয়াতের শেষ অংশ। পুরো আয়াতের অর্থ হলো, ‘মহামহিমান্বিত তিনি, যিনি সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী; তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান’। একই সূরার দ্বিতীয় নম্বর আয়াতের অর্থ হলো, যিনি মৃত্যু ও জীবন তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য সৃষ্টি করেছেন- কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।’ আল্লাহ পাক মানুষকে বিচার করেন তার কর্মের মাধ্যমে। আল্লাহ মানুষকে ক্ষমতাও দেন তাকে পরীক্ষা করার জন্য। ক্ষমতা পেয়ে একজন মানুষ আল্লাহর প্রতি শোকর গোজর করে নাকি আল্লাহর ক্ষমতাকে ভুলে গিয়ে নিজের ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠিত করে সেই পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ মানুষকে ক্ষমতা দান করেন।
কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, হে আল্লাহ! তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান করো এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও। আর যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করো এবং যাকে ইচ্ছা অপমান করো। তোমার হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশীল’ (আলে ইমরান, আয়াত- ২৬)। এখানে আল্লাহ তার ইচ্ছার কথা বলেছেন। কোনো ব্যক্তির উপর খুশি হয়ে রাজ্য ক্ষমতা দান করেন বিষয়টি এমন নয় বরং একজন ব্যক্তিকে রাজ্য ক্ষমতা দান করলে তিনি ক্ষমতাকে কিভাবে ব্যবহার করেন, মূলত সেই পরীক্ষা করার জন্যই ক্ষমতা দান করেন। আল্লাহ পৃথিবীতে নমরুদ, ফেরাউন, শাদ্দাদ, কারুন, হিটলার, মুসোলিনী, স্টালিন, চেঙ্গিস খানসহ যুগে যুগে যত সব অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীকে শাসন ক্ষমতা দান করেছিলেন নিশ্চয়ই তাদের কৃতকর্মের ওপর খুশি হয়ে নয়; বরং এটা পরীক্ষা করার জন্য যে, তারা কতটা উদ্ধত হতে পারে তা দেখার জন্য।
নবী রাসূলগণ অনেক কষ্ট করেছেন। আল্লাহকে খুশি করার জন্য অনেক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে তাদেরকে যেতে হয়েছে। কেউ নিজ কওমের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছেন, কেউ শাসকগোষ্ঠী দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন, কেউ রোগ শোক, ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। নবী রাসূলগণের ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট ছিলেন তার পরেও তারা আল্লাহর পরীক্ষা থেকে রেহাই পাননি। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূল সা:-এর আনুগত্য করো। আর তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করো না’ (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত- ৩৩) । যে রাসূল এর আনুগত্য করার কথা আল্লাহ নিজে বলেছেন সেই রাসূল এর দুঃখ কষ্ট প্রতিটি মানুষের হৃদয়কে প্রকম্পিত করে। সাহাবাগণকে অবর্ণনীয় অত্যাচার, কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালার চিরাচরিত নিয়ম হচ্ছে যে, তিনি কাউকে পরীক্ষা না করে জান্নাতে দিবেন না। তিনি তাদেরকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে তার পর সে পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হবে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। কুরআনে এ কথাটি বারবার ঘোষিত হয়েছে। যেমন, আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি মনে করো যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ এখনো তোমাদের কাছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের মতো অবস্থা আসেনি? অর্থসঙ্কট ও দুঃখ-ক্লেশ তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত-কম্পিত হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তার সঙ্গী-সাথী ঈমানদারগণ বলে উঠেছিল, আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২১৪] আল্লাহ আরো বলেন, ‘তোমরা কি মনে করো যে, তোমাদেরকে এমনি ছেড়ে দেয়া হবে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ না প্রকাশ করেন তোমাদের মধ্যে কারা মুজাহিদ এবং কারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ও মুমিনগণ ছাড়া অন্য কাউকেও অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেনি” (আত-তাওবাহ, আয়াত ১৬)? আরো বলা হয়েছে, ‘মানুষ কি মনে করেছে যে, আমরা ঈমান এনেছি। এ কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করে অব্যাহতি দেয়া হবে’ (সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত ২)?

ক্ষমতা একটি পরীক্ষা মাত্র। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা অবশ্যই বিজয়ী হবে। কিন্তু এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে লোভ-লালসা, ক্ষমতার দাপট, ক্ষমতার অহংবোধ, অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন, মানুষের অধিকার বিনষ্ট থেকে দূরে থাকতে হবে। ইনসাফভিত্তিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে হবে। সর্বময় ক্ষমতার মালিক আল্লাহকে ভয় পেতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের শাসকরা আল্লাহর ক্ষমতাকে ভুলে গিয়ে নিজেদের ক্ষমতাকে জাহির করতে গিয়ে আল্লাহর সাথে শিরক করে বসেন। আমাদের শাসকরা যখন বলেন, তারা বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি করেছেন। এমনকি সতের কোটি মানুষের খাবারের ব্যবস্থাও নাকি তারাই করেন। অথচ আল্লাহ নিজে বলেন, ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল সব প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহ স্বয়ং তাঁর নিজের ওপর ন্যস্ত করেছেন (সূরা হুদ, আয়াত ৬)।’ কুরআনে আরো বলা হয়, আল্লাহ রিজিকদাতা। নিশ্চয় তিনি আল্লাহ রিজিকদাতা। আল্লাহ তায়ালাই তো জীবিকাদাতা শক্তির আধার, পরাক্রান্ত (সূরা: জারিয়াত, আয়াত ৫৮)।’ কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘নিশ্চয় তোমার পালন কর্তা যাকে ইচ্ছা অধিক জীবনোপকরণ দান করেন এবং তিনিই তা সঙ্কুচিতও করে দেন। তিনিই তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত এবং সব কিছু দেখছেন (সূরা: আল-ইসরা, আয়াত ৩০)’। একজন শাসক যখন বলেন, তিনিই মানুষের আয়ু বৃদ্ধি এবং রিজিকের ব্যবস্থা করছেন তখন তার এই ক্ষমতা কি আল্লাহর ক্ষমতার সাথে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে না ?
রাষ্ট্রের জনগণের আমানত রক্ষা করা একজন শাসকের অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু আমাদের শাসকগণ কি জনগণের আমানত রক্ষা করতে পারছেন? নাকি ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য জনগণের আমানতকে লুণ্ঠন করছেন? কুরআনে বারবার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে আমানত রক্ষার প্রতি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থসম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকের কাছে পেশ করো না (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত-১৮৮)।’ আরো বর্ণিত আছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতকে তার মালিকের কাছে প্রত্যর্পণ করো বা ফেরত দাও’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত-৫৮)। প্রকৃত ঈমানদার হওয়ার আলামত হলো আমানত রক্ষা করা। এ সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর (তারাই প্রকৃত মুমিন) যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত-৮)’। ভোট একটি রাষ্ট্রের জনগণের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অধিকার। সেই অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করা নিশ্চয়ই কোনো ঈমানদার সরকারের কাজ নয়। ভোটের মতো বাকস্বাধীনতা, সভা সমাবেশের স্বাধীনতাও সাংবিধানিক অধিকার কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশের জনগণ কি সেই সুবিধা ভোগ করতে পারছে ? পারছে না। কারণ বাকস্বাধীনতা ও কলমের স্বাধীনতার ওপর ডিজিটাল নিরাপত্তা নামক আইনের উলঙ্গ খড়গ ঝুলানো আছে। সরকারের বিপক্ষে যায় এমন কথা বলার সাথে সাথে সেই খড়গ ঘাড়ে পড়তে বেশি সময় নেয় না। সরকারের কাছে জনগণের যে অধিকারের আমানত আছে তা খেয়ানত করাই যেন আমাদের সরকারের কাজ।

এই দেশে অধিকারের কথা বলা যেমন পাপ তেমনি ক্ষুধার্ত থাকলেও বলা যাবে না যে, আমি ক্ষুধার্ত। বলা যাবে না, আমি ‘ মাছ, গোশত, চাইলের স্বাধীনতা চাই’। কেউ চাইলে এবং সেই চাওয়ার ওপর পত্রিকায় নিউজ করলে রিপোর্টারের কী হাল হয় তাতো প্রথম আলোর সাংবাদিক শামসুজ্জামান শামসের দৃষ্টান্ত দেখলেই বোঝা যায়। কেউ কথা বললে বা লিখলে ডিজিটাল নিরাপত্তা নামক আইনের খড়গ কিভাবে ঘাড় মটকিয়ে দেয় সেই দৃষ্টান্তেরও অভাব নেই। সরকার মানুষের খাবারের শতভাগ নিশ্চয়তার কথা বললেও বিভিন্ন রিপোর্ট বলছে ভিন্ন কথা। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টিবিষয়ক কৌশলগত পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়, ‘বাংলাদেশের চার কোটি মানুষ এখনো ক্ষুধার্ত থাকে। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের খাদ্য নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।’ (প্রথম আলো,২৬ অক্টোবর, ২০১৬)। গত ৩০ মার্চ ২০২৩ সালে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং’ (সানেম) এর এক রিপোর্টে দেখানো হয়,নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আলোচ্য ৬ মাসে ৭৪ শতাংশ পরিবার ধার করে চলছে। ১৮ শতাংশ নিম্নআয়ের পরিবারের কখনো কখনো পুরো দিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ৭১ শতাংশ পরিবার প্রয়োজনের তুলনায় কম খাবার খেয়েছে। আর ৩৭ শতাংশ পরিবার মাঝে মধ্যে কোনো এক বেলা খাবার না খেয়ে থেকেছে’ (দৈনিক যুগান্তর, ৩১ মার্চ. ২০১২৩)। উন্নয়নের সাগরে ভেসে থাকা এই দেশের মানুষের না খেয়ে থাকার এই দায়ভার কে নিবে ? নাকি বাংলাদেশের শাসকদের আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে না? হজরত ওমর ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমার রাষ্ট্রের একটি কুকুরও যদি না খেয়ে মারা যায় এর জন্য আমিই দায়ী হবো।’
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব একটি আমানত। এরও যথাযথ হেফাজত করতে হবে। মানুষের প্রাপ্য মানুষদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এখানে খেয়ানত করলেও আল্লাহ তায়ালার কঠিন আজাবে পাকড়াও হতে হবে। হজরত আবু জর গিফারি নবীজির কাছে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কামনা করলে তিনি বললেন, ‘আবু জর, তুমি তো দুর্বল প্রকৃতির লোক। আর এটা হচ্ছে একটি আমানত। কেয়ামতের দিন এটা লজ্জা ও অপমানের কারণ হবে। তবে যে ব্যক্তি এটাকে তার দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং যথাযথভাবে সে দায়িত্ব পালন করেছে তার বিষয়টি ভিন্ন।’ তাই বলি, নিজেকে আল্লাহর ক্ষমতার সাথে চ্যালেঞ্জ না করে আল্লাহর বিধান মতো রাষ্ট্র পরিচালনা করে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে পারলে ইহকাল পরকালে মুক্তির সম্ভাবনা আছে। এর বিপরীতে যা হবে তা মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআনুল কারিমে বর্ণিত আছে।
harun_980@gmail.com