ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামান এপ্রিলের মাঝামাঝি বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য আমেরিকা সফর করেন। বাহ্যত অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার এ সফর অর্থনীতি বিষয়সম্পর্কিত। কিন্তু যে সময় তিনি ওয়াশিংটনে ভারতের অর্থনীতি নিয়ে কথা বলছিলেন, তখন সেখানে ভারতীয় মুসলমানদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা একটি প্রশ্ন তার মুখের রুচিই নষ্ট করে দিয়েছে। প্রশ্নটি ছিল, ‘তিনি কি স্বীকার করেন যে, মুসলমানদের প্রতি নির্যাতনের ঘটনাবলি ভারতে পুঁজি বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে?’ বাহ্যত অর্থনীতি বিষয়ের সাথে এ প্রশ্নের কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি এ প্রশ্নের জবাব দেয়ারও যোগ্য নন। কিন্তু ভারতে মুসলমানদের সাথে বর্বরোচিত গণপিটুনি এবং তাদের সাথে হওয়া বিশেষ আচরণ সম্পর্কে যে সংবাদগুলো আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোতে পৌঁছেছে, সে সম্পর্কে আমেরিকাও অনবগত নয়। অর্থমন্ত্রী এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয়ার পরিবর্তে সে কথাগুলোই বললেন, যা বিজেপির লোকেরা বলে আসছে।
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামান এ অভিযোগ তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘ভারতে বিশে^র দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যা বসবাস করেন যারা ক্রমাগত উন্নয়নের পথ অতিক্রম করে চলেছেন। যারা ভারতীয় মুসলমানদের সমস্যার কথা তুলে চোখের পানি ফেলছেন, তারা মূলত ভৌগোলিক বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত নন।’ তিনি এ কথাও বলেন যে, ‘ভারতের মুসলমানদের অবস্থা পাকিস্তানি মুসলমানদের চেয়ে বেশ উন্নত। তাদের জনসংখ্যাও ক্রমাগত বাড়ছে। যদি তারা সঙ্কটাপন্ন হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি হচ্ছে কিভাবে?’ তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানে মুহাজির, শিয়া ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন নির্যাতন চলছে। পাকিস্তান নিজেকে ইসলামী রাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে। এরপর পাকিস্তানে প্রতিটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংখ্যা কমে আসছে।’ তিনি ভারতীয় মুসলমানদের ওপর হওয়া নিপীড়ন-নির্যাতনকে কাল্পনিক বলে অভিহিত করে তাচ্ছিল্যের সাথে প্রত্যাখ্যান করেন।
সর্বপ্রথম আমাদের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামানকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত। কেননা, তিনি বিদেশের মাটিতে ভারতের সম্মান রক্ষা করেছেন এবং নিজের সাচ্চা ভারতীয় হওয়ার প্রমাণ পেশ করেছেন। বিপরীতে, রাহুল গান্ধী অতীতে লন্ডনে ভারতের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দাঁড় করিয়ে দেশদ্রোহী কর্মের এমন মারাত্মক অপরাধ করেছিলেন যে, বিজেপি যার কারণে তাকে এখনো ক্ষমা করেনি। আজকাল দেশপ্রেমিক তো তারাই, যারা বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর হ্যাঁ’ কে হ্যাঁ বলে। যারা এমনটি করে না, তাদের নাম দেশদ্রোহীর তালিকায় যুক্ত করে দেয়া হয়। ভারতীয় মুসলমানরা তো দীর্ঘ দিন ধরে এ তালিকায় যুক্ত রয়েছে, কিন্তু এতদসত্ত্বেও তাদের উন্নতি করার ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি করার সব সুযোগ রয়েছে। এটি তাদের অযোগ্যতা নয় তো কী? কেননা, তারা কখনো দাঙ্গাকারীদের হাতে আবার কখনো নামসর্বস্ব গোরক্ষকের হাতে খুন হওয়া নিয়ে মাতম করে। কিন্তু এটি ভাবে না যে, যদি কিছু মানুষ হিন্দুমাতার নামে খুন হয়েও যায়, তাতে মন্দ কী, জনসংখ্যা তো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বৃদ্ধি পেতে থাকা জনসংখ্যার মধ্য থেকে যদি কিছু মুসলমান গোমাতার কাজে আসে, তাহলে এটি তাদের জন্য গর্বের বিষয় হওয়া উচিত।
নির্মলা সীতারামানের যে বক্তব্য নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করছি, সেটি তিনি ওয়াশিংটনে থিংকট্যাংক পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্সের সাথে আলোচনার সময় দিয়েছেন। ইনস্টিটিউটের প্রধান অ্যাডম পোসেন তাকে প্রশ্ন করেন, ‘তিনি কি এ কথা স্বীকার করেন যে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের ঘটনাবলি ভারতে পুঁজি বিনিয়োগে ক্ষতিগ্রস্ত করছে?’ তার জবাবে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘আসুন এবং দেখুন, ভারতে কী হচ্ছে। যারা বাস্তব অবস্থা জানেন, তাদের কথা শোনা ছাড়াই রিপোর্ট লেখা হচ্ছে।’ নির্মলা সীতারামানের ইশারা ছিল ওইসব সাংবাদিকের প্রতি, যারা ভারতে মুসলমানদের সাথে হওয়া বৈষম্যমূলক আচরণের ব্যাপারে ক্রমাগত লিখে যাচ্ছেন। শুধু মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোতেই ভারতীয় মুসলমানদের সাথে হওয়া অন্যায় আচরণের ওপর ভিত্তি করে রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে তা নয়; বরং আমেরিকার মানবাধিকারের কয়েকটি সংগঠনও মুসলমানদের বিরুদ্ধে নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে যাচ্ছে। মার্কিন সরকারও এর ওপর নিরন্তর দৃষ্টি রাখছে।
২০২২ সালের এপ্রিলে আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জারিকৃত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে মুসলমানরা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার। ওই প্রতিবেদনে ভারতে সংখ্যালঘুদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, পুলিশ ও জেল প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইচ্ছেমতো গ্রেফতার ও মুসলমানদের টার্গেট বানানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্টে ধর্মান্তরবিরোধী আইনের আড়ালে মুসলমানদের টার্গেট বানানোর উদ্ধৃতিও রয়েছে। গত বছর নভেম্বরে আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কিত আমেরিকান কমিশন বলেছে, ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার যে অজুহাতের ভিত্তিতে বিপদের সম্মুখীন, তাতে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় সরকারি নীতির ব্যর্থতাও যুক্ত রয়েছে। প্যানেল তাদের গত বছরের এপ্রিলের ওই প্রস্তাবকে পুনরাবৃত্তি করেছিল যে, আমেরিকা ভারতকে ‘বিশেষ উদ্বেগজনক দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু ভারত সরকার এপ্রিলে কমিশনের প্রণয়নকৃত রিপোর্টকে পক্ষপাতমূলক ও ভিত্তিহীন অভিহিত করে প্রত্যাখ্যান করে। এটি নতুন কোনো কথা নয়। যখনই কোনো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে ভারতীয় মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের কথা ওঠে, তখনই আমাদের সরকার সেটিকে কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন তথ্য অভিহিত করে প্রত্যাখ্যান করে দেয়। এটিকেই বলে উটপাখির চাল।
এমনিতেই স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নামে তাদের হত্যা ও তাদের সম্পদ ধ্বংস অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু ২০১৪ সালের পরের পরিস্থিতি একেবারে ভিন্ন। মুসলমানদের চতুর্দিক থেকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। তাদের অস্তিত্বের ওপর হামলা করা হচ্ছে। তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হচ্ছে। যে সময় এ কলাম লেখা হচ্ছে, সে সময় দেশের কয়েকটি স্থানে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা চলছে। এমন রাজ্যগুলোতেও ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা চলছে, যেখানে এর আগে কখনো দাঙ্গা-ফাসাদ হয়নি। রামনবমীর মিছিলের সময় যেভাবে মসজিদ, মাদরাসা ও দরগাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হলো, এর কোনো নজির নেই। এর চেয়ে বাড়তি নির্লজ্জতা আর কী হতে পারে যে, মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসা ব্যক্তি বলেন, তিনি তার রাজ্যের মাদরাসাগুলোর অস্তিত্ব মুছে ফেলবেন। দরগাগুলোতে বুলডোজার চালিয়ে দেবেন। মসজিদ হতে দেবেন না। রমজানের পবিত্র মাসে তারাবিহতে যেভাবে ছিদ্রান্বেষণ করা হয়েছে, তা কারো কাছে গোপন নেই। এমনকি কিছু মসজিদে অনুপ্রবেশ করে মুসল্লিদের মারধর পর্যন্ত করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী যখন আমেরিকায় বসে দমন-পীড়ন ও জুলুম-নির্যাতনের সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে জোরগলায় ভারতীয় মুসলমানদের উন্নয়নের দাবি করেন, তখন তার কথায় আহমদ ফরাজের এ কবিতাটির প্রমাণ পাওয়া যায়- যখম কো ফুল তো সরসর কো সাবা কাহতে হেঁ/জানে কিয়া দাওর হ্যায়, কী লোগ হেঁ, কিয়া কাহতে হেঁ-আঘাতের চিহ্নকে ফুল বলে তো, ঘূর্ণিঝড়কে বলে সমীরণ/কী জানি কী যুগ এটা, কী ধরনের মানুষ এরা, কী সব বলে! হ
মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক মুম্বাই উর্দু নিউজ ১৬ এপ্রিল,
২০২৩ উর্দু থেকে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট
