মৃত্যু চিরন্তন ও সত্য। অস্বীকার করার শক্তি সাধ্য জগত সংসারে কারো নেই। প্রতিটি মানুষের মৃত্যু তাঁর নির্ধারিত দিনক্ষণে আরশের মালিকের নির্দেশিত সময়ে হবে। কিছু মানুষের মৃত্যু আমাদের কাছে মনে হয় ‘অকালে’ হয়ে যায়। জন্মের সিরিয়াল থাকলেও মৃত্যুর সিরিয়াল কেউ দিতে পারেনি। কখনো দাদা-দাদী, কখনো বাবা-মার আগে সন্তান দুনিয়ার সফর শেষ করে মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে যায়। স্বাভাবিক মৃত্যু যেখানে মেনে নিতে হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায় সেখানে দুর্ঘটনায় মৃত্যু কত যে কষ্টের তা ভুক্তভোগী পরিবার ব্যতীত অন্য কেউ অনুধাবন করতে পারে না। আমরা সবাই স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই! কিন্তু সবার ভাগ্যে কি স্বাভাবিক মৃত্যু জোটে? যেমনটি জোটেনি নির্মাণ শ্রমিকদের ভাগ্যে। তারা অন্যের ঘর সাজাতে গিয়ে কখনো কখনো মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছে। অথচ এ মৃত্যুকে আমরা দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দিচ্ছি।
সব মৃত্যু দুর্ঘটনা নয়! মনুষ্য সৃষ্ট দুর্ঘটনার মৃত্যু একটু সচেতন হলে অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। নির্মাণ কাজের নিরাপত্তাই প্রথম। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় তা মানা হয় না। ফলে আমরা জেনে-বুঝে প্রান্তিক মানুষগুলোকে মৃত্যুর ফাঁদের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মহলের বোধোদয় হয়নি। আমাদের দেশে যতগুলো দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় তার একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। ওই পর্যন্তই শেষ! তাদের স্বজনরাও ন্যায্য বিচার পায় না।
আমাদের দেশে দুর্ঘটনার শেষ নেই। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা আমাদের জীবনকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কখনো সড়ক দুর্ঘটনা, কখনো লঞ্চ দুর্ঘটনা, কখনো রেল দুর্ঘটনা, কখনো ভবন দুর্ঘটনা, কখনো এসি দুর্ঘটনা, কখনো কারখানা দুর্ঘটনা, কখনো উড়াল সেতুর গার্ডার দুর্ঘটনা, কখনো গ্যাস দুর্ঘটনা জীবন কেড়ে নিচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা তো ভয়াবহ। ৯ জুন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, চলতি বছরের মে মাসে সারা দেশে ৪৯১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০৮ জন নিহত হয়েছে। প্রত্যেকটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করলে দেখা যাবে বেশির ভাগই মনুষ্য সৃষ্ট দুর্ঘটনা। নিচে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করলাম-
২৯ মে ২০২৩ রাজধানীর মহাখালী ব্রিটিশ-অ্যামেরিকান টোব্যাকোর সামনে নির্মাণাধীন উড়াল সড়ক (এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) উপর থেকে একটি রড পড়ে ১২ বছর বয়সী অজ্ঞাত এক কিশোরের মৃত্যু হয়। হতভাগ্য কিশোরের মাথার এক পাশ দিয়ে রড ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। কী মর্মান্তিক! ভাবা কি যায়? মহাখালীর মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো-আমরা কতটা উদাসীন!
২৭ মে ২০২৩ রাজধানীর মুগদা থানার গ্রিন মডেল টাউন এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের নবমতলা থেকে পড়ে এক নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ১৫ আগস্ট ২০২২ রাজধানীর উত্তরায় নির্মাণাধীন বিআরটি প্রকল্পের ফ্লাইওভারের গার্ডার চাপায় প্রাইভেটকারে থাকা পাঁচজন সাধারণ যাত্রীর মৃত্যু হয়। ক্রেইন দিয়ে গার্ডার ওপরে উঠানোর সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে। ২০২১ সালের ১৪ মার্চ ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় বিআরটি প্রকল্পের একটি গার্ডার লঞ্চার ভেঙে তিন চীনা কর্মীসহ ছয়জন আহত হন। ২০২০ সালের ১৫ জুলাই গাজীপুর চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় উড়াল সড়কের লঞ্চিং গার্ডার পড়ে একজন নিরাপত্তাকর্মীর মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে চট্টগ্রামে একটি নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনে ক্রেনের চাপায় দু’জন নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালের ১২ মার্চ রাজধানী ঢাকার মালিবাগ রেলগেট এলাকায় নির্মাণাধীন মগবাজার-মৌচাক উড়াল সেতুর গার্ডার ভেঙে একজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রামের উড়াল সেতুর ৩টি গার্ডার ভেঙে ১৩ জন মানুষের মৃত্যু হয়। এতগুলো মানুষের মৃত্যুর পরও নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি।
আমাদের দেশে নির্মাণ কাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে গাফিলতি ও উদাসীনতা দেখা যায়। প্রায়ই দেখা যায় নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়াই ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। লোক দেখানো কিছু চটের বেড়া টাঙিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু নিরাপত্তা বলয় দেখা যায় না। যেকোনো সমস্যার কথা উত্থাপন করলেই উন্নয়নের গালভরা গল্প শোনানো হয়। কিন্তু উন্নয়নের নামে জনদুর্ভোগ-ভোগান্তি নাগরিক জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। নিরাপত্তাহীনতার অভাবে প্রায়ই কিছু মানুষ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে। নির্মাণ কাজে সেফটি ফাস্ট বা নিরাপত্তাই প্রথম সে নীতি মানা হচ্ছে না।
বিশে^র বিভিন্ন দেশের নির্মাণ কাজে নিরাপত্তাই প্রথম। কিন্তু আমাদের দেশে নির্মাণাধীন প্রকল্পে নিরাপত্তার অভাবে বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ জীবন দিচ্ছে। এমনকি পরিবহন যাত্রীরা দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। ২০০৮ শ্রম-কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, যেকোনো ভবন নির্মাণের সময় চার পাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী দিতে হবে, উঁচু স্থানে কাজ করার সময় লিফট, সেফটি বেল্ট, শক্ত দড়ি ও মজবুত মাচা, শ্রমিকদের হেলমেট, পায়ে গামবুট ব্যবহার করতে হবে। ঢাকা শহরের রাস্তার পাশে ফুটপাথ ও ড্রেন খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলমান। এ কাজ যেন শেষ হয় না। কিন্তু নগর পিতারা এদিকে নজর দিচ্ছেন না। ফলে জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা না থাকায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা বাড়ছে।
সড়কে মৃত্যুর পরিসংখ্যান থাকলেও নির্মাণ শ্রমিকের দুর্ঘটনাজনিত আহত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান জানা যায় না। তবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস)-এর ভাষ্যমতে, কর্মস্থলে নিরাপত্তার অভাবে গড়ে ১৩০ জন নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হচ্ছে। ২০১৮ সাল থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত ৫৮৯ জন নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ২০২২ সালের আগস্ট পর্যন্ত শুধুমাত্র রাজধানীতে পাঁচজন পথচারীসহ ১৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর মিছিল থামছে না।
শ্রম আইন আছে। কিন্তু আইন মানার প্রচলন নেই। আইন মানলে আইনের শাসনের সুবাতাস সবাই উপভোগ করত পারত। পেশিশক্তির জোর দিয়ে বড়জোর ক্ষণিকের জন্য বাজিমাত করা যায়। কিন্তু দিন শেষে সবাইকে আইন মানতে হয়। ক্ষমতায় থাকলে আইনের গতিপথ ভিন্নপথে পরিচালিত করা যায়। কিন্তু ক্ষমতা হারালে আইনের আশ্রয় নিতে হয়। আইনের শাসনের অনুপস্থিতে বিচারহীনতার সংস্কৃতির মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা পাওয়া প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার নির্মাণ শ্রমিকদেরও আছে। সুতরাং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার স্বার্থে দেশের সব নির্মাণ শ্রমিকের নিরাপত্তার বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নিরাপত্তার বিষয়টিকে অবহেলা করে বেশি দূর এগোনো সম্ভব নয়। সুতরাং, দেশের সরকারি ও বেসরকারি কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা সব প্রকল্পে সবার আগে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
