জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে উজান থেকে পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টির পানি উপর্যুপরি যমুনা ও তিস্তা নদী এবং ব্রহ্মপুত্র নদের বন্যার পানি বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলের জেলাগুলোর উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদী সিকস্তি চরবাসীদের জীবনযাত্রায় বারবার নেমে আসছে ছন্দপতন আর নানা দুর্যোগ-দুর্ভোগ। উপর্যুপরি নদীভাঙনের ফলে পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নীলফামারি, রংপুর, লারমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ জেলার অনেক এলাকায় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির, হাটবাজার, হাসপাতাল, সরকারি -বেসরকারি অফিস-আদালত, সড়ক, রাস্তাঘাট, গাছপালাসহ ফসলি জমিজমা। সেই সাথে নানা রকম রোগবালাইয়ের আক্রমণে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা বিপন্ন ।

এককালের গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর নদী ভরা মাছ এখন চরবাসীদের শুধুই স্মৃতি। বিগত কয়েক বছর যমুনা, তিস্তা নদী এবং ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের শিকার হয়ে অগণিত চরবাসী বসতবাড়ি-চাষাবাদের জমিজমা হারিয়ে জীবনযুদ্ধে পরাজিত। চরম দারিদ্র্যতার শিকার হয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ চিত্র প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান। সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ ও সহযোগিতা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। শিশু, প্রবীণ, অচল ও বিধবা মানুষের করুণ দশা। বিশেষ করে যমুনা নদীর পানির স্রোতে বাড়িঘর ভেঙে যাওয়ার মুহূর্তে বয়স্ক মানুষ, গৃহপালিত পশু-পাখি নিয়ে বিপাকে পড়েন ভুক্তভোগীরা।

বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলার চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা বাবলু সরকার, ঈমান আলী, দুলাল ও মুস্তাফিজ এবং ডাবলু মণ্ডল জানান, নদী সিকস্তি চরবাসীদের জীবনপ্রবাহ নানা দুর্যোগ-দুর্ভোগে যাপিত। একটি চিঠি আসতে ১০-১৫ দিন লাগে। ৮-১৪ কিলোমিটার নদীপথে শ্যালো নৌকায় দুই-চার ঘণ্টায় উপজেলা সদরে পৌঁছাতে হয়। রাতে যাতায়াত বন্ধ থাকে। স্থানীয় ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি তিন বছর আগে নদীতে বিলীন হওয়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে এলাকাবাসী বঞ্চিত। প্রতি বছর নদীভাঙনের শিকার হয়ে চরবাসীর অর্ধেকই বসতবাড়ি ভেঙে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন।

উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার চরাঞ্চলের মানুষগুলো বহু বছর ধরে ভৌগোলিক কারণেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বর্ষাকালে জননিরাপত্তার অভাব বিরাজ করে, ফলে চুরি-ডাকাতির শিকার হতে হয়। উপর্যুপরি বন্যার কারণে চরবাসীর জনজীবন একেবারেই অতিষ্ঠ। বিশেষ করে ১৯৭১, ১৯৭৪, ১৯৭৫, ১৯৭৬, ১৯ ৮০, ১৯৮৩, ১৯৮৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০২০, ২০২২ এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালের ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙনে দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষগুলো নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে-দুর্ভোগের শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিগত কয়েক বছরে কয়েক লাখ চরবাসী এলাকা ছেড়ে বিভিন্ন জেলায় বসতবাড়ি নির্মাণ করে দুর্বহ জীবনযাপন করছেন। তারা নিজ এলাকায় না থাকায় ওই এলাকায় যেমন সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি যে এলাকার বাসিন্দা হয়েছেন সেখানেও স্থায়ী বাসিন্দা না হওয়ায় সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন না। ফলে দুভাবেই তারা সরকারি সহায়তা-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয় চরবাসী জানিয়েছেন, প্রতি বছর বন্যায় ফসলি জমির উপর বালির স্তর পড়ায় ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। আবার পলিমাটি পড়ায় কোনো কোনো এলাকায় ফসলের ফলন ব্যাপক হয়। শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে যাওয়ায় নৌ-চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ জনপদের যোগাযোগ, যাতায়াত ও কৃষিপণ্য পরিবহনে ভোগান্তির শেষ থাকে না। তবে গত বছর জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার চর পাকেরদহ ইউনিয়নের উপর দিয়ে সম্প্রসারিত বিদ্যুৎলাইন মানিকদাইড় বাজার পর্যন্ত সংযোগের ফলে এলাকায় তথ্য ও প্রযুক্তি, মোবাইল ব্যাংকিংসহ নানা প্রকার সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে।

বগুড়া জেলার পূর্বাঞ্চল সারিয়াকান্দির উপজেলার চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের মানিকদাইড় চরটি উপর্যুপরি যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। এক সময় এ চরেই অন্তত তিন হাজার বসতবাড়ি ছিল, এখন এখানে শুধু ধুধুু বালুচর আর বর্ষা মৌসুমে অথৈ পানি। উপর্যুপরি নদীভাঙনের ফলে চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নটির মানচিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। এ ইউনিয়নের চরবাসীর প্রায় অর্ধেকই নদীভাঙনের শিকার হয়ে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আশ্রয় নিয়েছেন। এ ইউনিয়নের মানিকদাইর, শিমুলতাইড়, দলিকা, হাটবাড়ি, বিশরশি, বহুলাডাঙ্গা, বিরামের পাঁচগাছি, ফাজিলপুর, আউচারপাড়া, তেলিগাড়ি, সুজালুরপাড়া গ্রামের মানুষ সবচেয়ে বেশি নদীভাঙন ও উপর্যুপরি বন্যার শিকার হন। এসব চরের অধিকাংশ মানুষ অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন বেড়িবাঁধে, সরকারি পরিত্যক্ত জমিতে। আবার অনেকেই গরু-বাছুর, ছাগল-ভেড়া বিক্রি করে অথবা সুদে টাকা নিয়ে বিভিন্ন জেলায় সামান্য জমি কিনে মাথা গোজার ঠাঁই করে নিয়েছেন। এবার চরাঞ্চলে কোরবানির ঈদের আমেজ একেবারেই ছিল না।

মানিকদাইড় চরের স্থানীয় বাসিন্দা এই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস সরকার জানান, বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পরের বছর যমুনা নদীর পূর্বপারে জামালপুর, উত্তরে গাইবান্ধা ও বগুড়া এই তিন জেলার মোহনায় একটি বিশাল চর জেগে ওঠে। এ চরটির নাম মানিকদাইড়। চরটি ১৯৭২ ও ৭৩ সালে ঘন কাশবনে ভরা ছিল, কোনো জনবসতি ছিল না। এরপর গরু-মহিষের চারণভূমি হিসেবে পশুপালনের জন্য বাথান স্থাপন শুরু করেন বিভিন্ন চরের অধিবাসী। ১৯৭৪-৭৫ সালে যমুনা নদীর ভাটি অঞ্চলের সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর উপজেলার মনসুরনগর, চরগিরিশ ইউনিয়ন, জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা, গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলা ও বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলার কাজলা, কর্নিবাড়ি, বোহাইল ও হাটশেরপুর ইউনিয়নের চরবাসী ওই এলাকার কাশবন কেটে বসতবাড়ি নির্মাণ ও চাষাবাদ শুরু করেন।

কালের বিবর্তনে চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের পূর্বাঞ্চল মানিকদাইড় গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দ্বিতল ভবনবিশিষ্ট আশ্রয়কেন্দ্র, দ্বিতল ভবনবিশিষ্ট ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মানিকদাইড় বাজার, টিনশেড আশ্রয়ণকেন্দ্র ও মানিকদাইড় মাধ্যমিক বিদ্যালয়, চারটি মসজিদ ও পাকাসড়ক গত কয়েক বছর উপর্যুপরি নদীভাঙনের শিকার হয়ে যমুনার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখানকার অধিবাসীরা তাদের বসতভিটা হারিয়ে পার্শ্ববর্তী কাজলা ইউনিয়নে বসতবাড়ি গড়ে তুলেছেন। কাজলা ইউনিয়নের মানুষ জমিজমা হারানো সর্বস্বান্ত চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখে তাদের এলাকায় বাড়িঘর নির্মাণের সুযোগ করে আশ্রয় দিয়েছেন।

মানিকদাইড় চরের অধিবাসী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা রওশন কাওসার মানিক জানান, আমার দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ফলে বন্যা, খরা, নদীভাঙন ও ঝড়-বৃষ্টির সাথে যুদ্ধ করে বসবাস করে চরাঞ্চলের অধিবাসী। বিগত ৫০ বছরে নদীভাঙনের শিকার হয়ে বসতভিটা, জমিজমা হারিয়ে প্রায় কয়েক লাখ নদী সিকস্তি চরবাসী তাদের বাপ-দাদার ভিটামাটি ছেড়ে বিভিন্ন অঞ্চলের জেলা ও উপজেলায় বসতি গড়ে তুলেছেন। ইউপি ও সংসদ নির্বাচনের সময় বিভিন্ন পদপ্রার্থী সে সব এলাকায় গিয়ে ভোট প্রার্থনাও করে থাকেন। কেউ কেউ ভোটারদের হাজির করার জন্য নির্বাচনের মৌসুমে যাতায়াতের সুবিধা দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে বিগত ৫২ বছরে ইউনিয়ন পরিষদের কোনো ভবন বা কার্যালয় নির্মিত হয়নি। যে কারণে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বাড়িতেই অস্থায়ী কার্যালয়ে দাফতরিক কাজকর্ম চলে। শুকনো মৌসুমে জটিল রোগীদের পরিবহন অভাবজনিত কারণে অনেক রোগীর মৃত্যু হয়।

বোহাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান জানান, এবার তার বোহাইল ও পার্র্শ্ববর্তী কাজলা ইউনিয়নে ৭৬টি পরিবার যমুনার ভাঙনের শিকার হয়েছে। সম্প্রতি কাজলা ও বোহাইল ইউনিয়ন দু’টি বগুড়া জেলার মানচিত্র থেকে কেটে জামালপুর জেলার মানচিত্রের সাথে মিলিত করার বিষয়ে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে হাইকোর্টে আপিলও করা হয়েছে। চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম বাদশা জানান, এ ইউনিয়নের মানিকদাইড় ও সুজালুপাড়ার প্রায় ২৯০টি পরিবার এ বছর নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। নদীভাঙন রোধে মানিকদাইড় গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে পাকেরদহ থেকে শোনপচা পর্যন্ত যমুনা নদীর ভাঙন রোধে ৫৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬.২৫ কিলোমিটার বাম তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ করা হচ্ছে। কাজলা ইউনিয়নটি নদীভাঙনের হাত থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করতে না পারলে চালুয়াবাড়ি ও কাজল ইউনিয়নসহ জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার হাজার হাজার চরবাসীর বসবাস উপযোগী কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকবে না।

বগুড়া-১ আসনের সংসদ সদস্য সাহাদারা মান্নান বলেন, ইতোমধ্যে নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করা হয়েছে। আশ্রয়হীনদের আশ্রয়ণকেন্দ্রে বসবাসের ব্যবস্থা করাসহ সরকারি বরাদ্দ সাপেক্ষে খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, যারা নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন, তাদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। বন্যায় ও ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দ সাপেক্ষে সরকারি সহযোগিতা প্রদান অব্যাহতভাবে চলমান থাকবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক