অফিসিয়াল কাজে মাঝে মধ্যে পল্টন মতিঝিল এলাকায় যাই। তখন নামাজের সময় বায়তুল মোকাররম মসজিদে যাই। বায়তুল মোকাররম মসজিদের চারপাশ নোংরা এবং হকারদের দখলে। গেট থেকে প্রবেশ করে ভেতরের দিকে যেতেও দেখা যায় নোংরা পরিবেশ। মসজিদের ভেতরেও একই অবস্থা। এসব দেখে মনে হয়, বায়তুল মোকাররম যেন অরক্ষিত! বায়তুল মোকাররম মসজিদের অজুুখানা, প্রস্রাবখানা, টয়লেটে গেলে বমি আসে। সেখানে চরম দুর্গন্ধ। বিশ্রী পরিবেশ। টয়লেটগুলোর দরজা ঠিক নেই। মসজিদের সব ফ্লোরে ধুলাবালু। এমনকি একদম মিম্বরের কাছের জায়গাটিও ধুলাবালিতে পরিপূর্ণ! বাংলাদেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সমস্যা লেগেই থাকে কিন্তু বায়তুল মোকাররম মসজিদের বর্তমান যে সমস্যা দেখছি এটি মহাসমস্যা। মনে হচ্ছে যেন সরকার ইচ্ছে করেই এসব করছে। কারণ এই সরকার প্রতিবেশী একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক শক্তির থেকে পরামর্শ নিয়ে চলে। এ দেশে তাদের বহু এজেন্ট রয়েছে। তাদের কারো কারো পরামর্শেই কি বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম মসজিদের এমন হাল করে রেখেছে সেটি সন্দেহের বিষয়।

আমরা দেখেছি, এই সরকারের অনেক উচ্চপদস্থ লোকজন সংবিধানে ‘বিসমিল্লøাহির রাহমানির রাহিম’ সহ্য করতে পারে না। আল্লøাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস তারা উঠিয়ে দিয়েছে। যারা এসব করেছে তারা ঢাকার বুকে বিশাল বায়তুল মোকাররম মসজিদকে সহ্য করতে পারে না। ঢাকার ওই এলাকার নামই বায়তুল মোকাররম নামে পরিচিত। এটি বাংলাদেশের বড় একটি ঐতিহ্য। পাকিস্তান সরকারের সময় কাবার ডিজাইনে এরকম সুন্দর একটি মসজিদ তৈরি হয়েছে। শুধু তো এক বায়তুল মোকাররম নয়, জাতীয় সংসদ ভবন, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনসহ দেশে শতশত সরকারি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা আছে যা পাকিস্তান সরকার তৈরি করেছিল। ব্যাপারটি কি এমন, এই মসজিদ পাকিস্তান সরকার তৈরি করেছিল এ জন্য এটিকে শেষ করে দিতে হবে! পাকিস্তানের তৈরি করা সংসদ ভবনসহ বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ। এই দেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। এ দেশের জাতীয় মসজিদের এই বেহাল পরিস্থিতি কেন? এর নেপথ্যে কোন ষড়যন্ত্র আছে? কিছু দিন আগে একজন বয়স্ক বাংলাদেশী ব্যক্তি যিনি ইউরোপে থাকেন তিনি বায়তুল মোকাররম মসজিদের নোংরা পরিবেশ নিয়ে ভিডিও করেছেন যা আমরা ইউটিউবে দেখেছি। মুসলিম দেশ বাংলাদেশের কথা শুনলে আন্তর্জাতিক মহল অবশ্যই ভাববে- এ দেশে মুসলিমদের বড় একটি জাতীয় মসজিদ থাকবে এবং বায়তুল মোকাররম মসজিদের নাম আন্তর্জাতিক মহলেরও অনেকের জানা। আগে এখানে বিদেশী অতিথিরা আসতেন।

বায়তুল মোকাররম মসজিদ পরিদর্শনের জন্যই বহু দূর দেশ থেকে অনেকে আসতেন। অনেক বছর আগে ইউরোপ থেকে একজন নারী এসেছিলেন বায়তুল মোকাররম মসজিদ দেখার জন্য। এখন যদি বিদেশীরা এসে মসজিদের এই নোংরা পরিবেশ দেখেন তখন তারা বাংলাদেশ সম্পর্কে কি নেতিবাচক ধারণা নেবেন না? জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে মুসলিম দেশ বাংলাদেশ অন্যতম স্থানে। কেন রাষ্ট্রীয়ভাবেই এরকম অবহেলা? কেউ কেউ বলতে পারেন, অতীতেও এখানে হকার ছিল। আমি বলব, অতীতের উদাহরণ দিয়ে ১৫ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা সরকার কতদিন চলবে! হকারদের কাছ থেকে চাঁদা কারা নিচ্ছে? জিন, ভূতে? বিএনপির সময়ে বিএনপির লোকজন চাঁদা নিত এখন কে নেয়? বায়তুল মোকাররম মসজিদের ইনকাম তো অনেক। শতশত কোটি টাকা ইনকাম। এই টাকা যায় কোথায়? হাজার হাজার দোকান রয়েছে বায়তুল মোকাররম মসজিদে। সেখান থেকে শতশত কোটি টাকা ভাড়া আসে। বায়তুল মোকাররম মসজিদে কাঠামোগত কিছু উন্নয়ন হয়েছে। বিএনপির আমলেও হয়েছে। দেখেছি। সেসব করেই কি সব টাকা শেষ করেছে? পুরো মসজিদ কমপ্লেক্সটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কি প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোকবল নিয়োগ দেয়া যায় না? কেন টাকার অভাব হবে? বায়তুল মোকাররমের টাকার অভাব আছে? একজন শামীম আফজালই তো ৫৫০ কোটি টাকা মেরে দিলো! কত ফান্ড থাকলে অত টাকা মেরে দিতে পারে! ইসলামিক ফাউন্ডেশনটা ভয়ানক একটা দুর্নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাদের প্রকাশনা মানহীন। সেখানে লুটপাট চলে। বায়তুল মোকাররমে খতিব নিয়োগ হয়েছে; সেটিও চরম অনিয়মের মধ্য দিয়ে। একজন আওয়ামী লীগ নেতা যিনি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, যিনি আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী হয়ে এমপি হওয়ার জন্য পোস্টার করে প্রচার করেছেন, যিনি চরম চাটুকারী করে আওয়ামী লীগের নেত্রীকে, সরকারপ্রধানকে কওমি জননী বলেছেন সেই ব্যক্তি বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিব হয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, এটি শেষ জামানার লক্ষণ! অতীতে বায়তুল মোকাররম মসজিদে লাখ লাখ লোকজন জুমার নামাজ আদায় করতে আসতেন। তখন বায়তুল মোকাররম মসজিদে যোগ্য খতিব, ইমাম ছিলেন। খতিব মাওলানা উবায়দুল হকের কথা শুনতে বহু মানুষের উপস্থিতি সেখানে ছিল। সবাই উবায়দুল হক হতে পারবেন না কিন্তু ঈমান আকিদা তো অন্ততপক্ষে ঠিক থাকতে হবে। অতীতে ঢাকায় এত ধুলাবালি ছিল না কিন্তু এখন ধুলাবালু বেশি। সেটি জেনে বুঝে কর্তৃপক্ষ পরিষ্কার-পরিছন্নতাকর্মী নিয়োগ দিয়ে রাখবে না? বায়তুল মোকাররম মসজিদের পাশেই মেট্রোরেলের স্থাপনা এবং বিভিন্ন ভবনের নির্মাণকাজ হয়েছে। এতে ধুলাবালি বেড়েছে। কিন্তু পরিষ্কার করার কর্মী বাড়িয়ে সুনজরে রাখলেই তো বায়তুল মোকাররম পরিষ্কার রাখা যায়। এটি তো কঠিন কোনো কাজ নয়। বায়তুল মোকাররম মসজিদ কমপ্লেক্সে ভাসমান নোংরা লোকজনের উপস্থিতি চরম পর্যায়ের। মাদকাসক্তদেরও ভিড় সেখানে। জুতা চোর, ছিনতাইকারীদেরও ভিড়। পুলিশ কি জানে না এসব? সম্প্রতি একজন কনস্টেবল ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হন। এরপর পুলিশ প্রায় ২০০ জনের কাছাকাছি ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করেছে!

এখানে বিষয়টি স্পষ্ট, পুলিশ জানে, বায়তুল মোকাররমকেন্দ্রিক অপরাধে কারা কতজন আছে। কিন্তু তাদের বিচারের আওতায় আনছে না! পুলিশ বায়তুল মোকাররমে সরকারের নির্দেশে জুতা পায়ে উঠে বিরোধী দল-মতের লোকদের; সাধারণ লোকদের নামাজরত অবস্থায়ও পেটাতে পারে! কিন্তু চোর ছিনতাইকারী মাদকাসক্তদের ধরতে পারছে না! কী অদ্ভুত আমাদের পুলিশ প্রশাসন! আমরা দেশের বিভিন্ন মসজিদে নামাজ পড়ি গুলশান মহাখালী বনানী উত্তরা ধানমন্ডি, সেসব মসজিদ কত পরিপাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখি। অথচ জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম মসজিদের কত বিশ্রী পরিবেশ! অতীতে আমরা বায়তুল মোকাররম মসজিদের এরকম বিশ্রী পরিবেশ দেখিনি। শিশুকাল থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদে যাই। বর্তমান পরিবেশ মারাত্মক বিশ্রী। আমরা আশা করি, কর্তৃপক্ষ এখানে সুদৃষ্টি দেবে।