আদর্শিক শূন্যতা কথাটা এমন পরিস্থিতি বোঝায় যেখানে একটি সমাজ বা জনগোষ্ঠীর কর্ম এবং সিদ্ধান্তগুলোকে নির্দেশিত করার জন্য বিশ্বাস, মূল্যবোধ বা মতাদর্শের একটি স্পষ্ট, প্রভাবশালী বা সমন্বিত শৃঙ্খলার অভাব রয়েছে। এটি আসলে নির্দেশক কাঠামোর একটি শূন্যতা বা অনুপস্থিতি। যে কাঠামো ও সারসত্তা সাধারণত একটি সম্প্রদায়ের বিশ্ব দর্শন এবং নিজস্ব আচরণ পরিচালিত করে।
পশ্চিমা সমাজে মতাদর্শগত শূন্যতার বহুমুখী মাত্রা লক্ষ করা যায়। এর কারণ ও পরিণতি অস্পষ্ট নয়।
আদর্শিক শূন্যতার ধারণা বোঝার জন্য এর ঐতিহাসিক শেকড় পরীক্ষা করা অপরিহার্য। ইতিহাসজুড়ে, সমাজগুলো প্রায়ই প্রচলিত মতাদর্শ দ্বারা চালিত এবং গঠিত হয়েছে। পশ্চিমের আলোকিত যুগ যুক্তি, ব্যক্তিবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে চালক নীতি হিসেবে গ্রহণ করে। যার ধারায় শিল্পবিপ্লব, পুঁজিবাদ এবং অর্থনৈতিক উদারতাবাদের যুগের সূচনা হয়। বিংশ শতাব্দীতে উগ্র জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ, কমিউনিজম এবং উদারনীতির মতো প্রতিযোগী মতাদর্শের উত্থান ঘটে, যা বিশ্ব রাজনীতি এবং সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
বিশ শতকের শেষভাগে এবং একুশ শতকের প্রথম দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, স্নায়ুযুদ্ধের অবসান এবং সভ্যতার সঙ্ঘাত পশ্চিমা দুনিয়াকে সংহত করেনি। বরং নিজের যা নেই, তা কারো মধ্যে না থাকুক, এই জেদে ও দম্ভে বিচলিত করেছে। তার অবস্থান দাঁড়িয়েছে এমন যে, আমার যা আছে, তাই সবার অনুকরণীয়, তার বিপরীতে না কোনো বিকল্প, না কোনো চ্যালেঞ্জ।
পশ্চিমা সভ্যতার আদর্শিক শূন্যতা সবচেয়ে জোরালোভাবে উচ্চারণ করেছে পশ্চিমা সভ্যতা নিজেই। এর কয়েকটি মাত্রা লক্ষ করা যেতে পারে।
এক. উত্তরাধুনিকতা
উত্তর-আধুনিক চিন্তা, আপেক্ষিকতাবাদ এবং গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের প্রতি দৃষ্টি রেখে মতাদর্শের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন বিশ্বাস ও মূল্যবোধের বিভক্তিকে উৎসাহিত করেছে, মতাদর্শগত বৈচিত্র্যে অবদান রেখেছে। পশ্চিমের আদর্শিক অন্তঃসারকে শূন্য হিসেবে দাবি করেছে। যদিও এ শূন্যতার প্রতিকার কী, তা উত্তরাধুনিকতার জানা নেই।
দুই. বিশ্বায়ন
বিশ্বায়নের মাধ্যমে সংস্কৃতিতে সংস্কৃতিতে সম্পর্ক ও পরিচয় বেড়েছে। মানুষে মানুষে যোগাযোগও বেড়েছে। ধারণা এবং সংস্কৃতিসমূহ উন্মুক্ত হয়ে গেছে। এর ফলে বৈশ্বিক পরীক্ষাগারে হাজির হয়েছে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও মতাদর্শ। দেখা গেল সে জাতিসমূহের ঐতিহ্যগত বিশ্বাস এবং মূল্যবোধের ক্ষয় ঘটাচ্ছে এবং শূন্যতা তৈরি করছে। যার ফলে মানুষকে নিজেদের পরিচয় এবং নীতিগুলোকে সংজ্ঞায়িত করতে সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
৩. রাজনৈতিক মেরুকরণ
মেরুকৃত সমাজে, আদর্শগত বিভাজন খুবই তীব্র হতে পারে। যা জাতীয় আদর্শের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। যখন রাজনৈতিক ন্যারেটিভগুলো খুব পক্ষপাতমূলক হয়ে যায়, তখন এটি একটি শূন্যতা। যা আদর্শিক শূন্যতার ফলাফল নিশ্চিত করে। কারণ তখন প্রাধান্যকামী আদর্শও আদর্শিকতার মধ্যে থাকে না, একচ্ছত্রতা বা হেজিমনি তৈরির মাস্তানি শুরু করে। পশ্চিম সেটা করেছে, করছে।
৪. প্রযুক্তিগত সঙ্কট
ডিজিটাল যুগ এবং ইন্টারনেট তথ্য প্রচারের পথ সুগম করে তুলেছে। যার ফলে বিশেষ মতাদর্শ এবং উপসংস্কৃতির বিস্তার ঘটতে পারছে। এটি প্রত্যেকের জন্য সমমনা সম্প্রদায়ের সন্ধান করা সহজ করে তুলেছে, মতাদর্শিক ল্যান্ডস্কেপকে আরো বিভক্ত করছে। এটি মূল্যবোধের অবক্ষয় ও পচনকে সর্বগ্রাসী সহজতার দিকে নিয়ে গেছে। এই অবনতিকে ড্রাইভ করছে পাশ্চাত্য। যা তার শূন্যতাকে উগরে দিচ্ছে বিশ্বের পরিসরে। অন্যদেরও এর দ্বারা সংক্রমিত, ব্যাধিগ্রস্ত ও আত্মবিনাশের অভিমুখী করে তুলছে।
একটি আদর্শগত শূন্যতা গভীর এবং বিস্তৃত পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কেননা একীভূত মতাদর্শ ছাড়া সমাজগুলো বিভিন্ন ভুল ফাটলে জর্জরিত হতে থাকবে। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পার্থক্যের মতো মতাদর্শিক ভাঙনও সমাজকে অস্থিরতা এবং সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
মতাদর্শগত শূন্যতা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। কেননা প্রতিযোগী দলগুলো ক্ষমতা এবং প্রভাবের লড়াইয়ে এই শূন্যতাকে কাজে লাগায়। একটি সাধারণ আদর্শের অনুপস্থিতিতে, শাসনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরো বিতর্কিত হয়ে ওঠে।
আদর্শিক শূন্যতার ফলে ব্যক্তি এবং সম্প্রদায়গুলো পরিচয় সঙ্কটের সম্মুখীন হতে পারে। কারণ তাদের জীবন পরিচালনা করার জন্য তাদের কাছে একটি সুস্পষ্ট মূল্যবোধ এবং বিশ্বাসের অভাব রয়েছে। এটি বিচ্ছিন্নতা এবং বিভ্রান্তির অনুভূতি জাগায়, হতাশা, ভ্রান্তি, ক্ষয় ও নিজের কাছ থেকে নিজের পলায়ন নিশ্চিত করে।
আদর্শগত শূন্যতা সমাজকে চরমপন্থী মতাদর্শের প্রতি সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। চরমপন্থী দলগুলো প্রায়ই এমন পরিবেশে উন্নতি লাভ করে যেখানে মূলধারার মতাদর্শগুলো দুর্বল বা অনুপস্থিত। পশ্চিমা দুনিয়ায় এই উপসর্গগুলো তীব্রভাবে কাজ করছে।
আদর্শিক এই শূন্যতার সাথে পশ্চিমা সভ্যতার লড়াই চলছে তার বিকাশের প্রথম দিন থেকেই। তার দরকার সত্য। কিন্তু সত্যের জন্য সে কেবল ইন্দ্রিয়জ ও বস্তুগত পরিসরের ওপর নির্ভরশীল। বড়জোর স্বজ্ঞাকে সে কামনা করতে পারছে। কিন্তু এর মধ্যে কোনো সুস্থির ও প্রশান্তিকর আদর্শিকতার বিকাশ ঘটছে না। এসব উপকরণের সীমাবদ্ধতার মতোই তার অর্জনও থেকে যাচ্ছে সীমাবদ্ধ। এই সীমাবদ্ধতাকে প্রশ্ন করে জন্ম নিচ্ছে আরেক চিন্তা। সেও ইন্দ্রিয়জ ও বস্তুজাত। সেও এক দিকে আলোকপাত করতে গিয়ে আরেক দিকে রেখে যাচ্ছে গভীর সীমাবদ্ধতা। চিন্তা চিন্তাকে খারিজ করছে। একে অপরের সাথে লড়ছে। এই খারিজ করা আর লড়তে থাকার যেন শেষ নেই। কোনো সুস্থির সত্যের বিশ্বাস নেই পশ্চিমা বস্তুবাদে। ফলে অস্থিরতা ও অবিশ্বাস তার নিয়তি। যার অবধারিত উপসংহার হলো চিন্তার উপসংহারহীনতা। নৈরাজ্য, সিদ্ধান্তহীনতা ও এক প্রান্তিকতার বিপরীতে অন্যান্য প্রান্তিকতা। পশ্চিমা চিন্তা মতাদর্শিক এই নৈরাজ্যের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অবক্ষয়মুখী সময় পার করছে।
লেখক : কবি, গবেষক
71.alhafij@gmail.com
