ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঢাকায় তিনটি রাজনৈতিক কার্যালয়ে নির্বাচনী উৎসব শুরু করেছে। বিএনপির পল্টন অফিসে তালা ঝুলছে। বিএনপি নামের দলটি বাংলাদেশে কয়েকবার ক্ষমতায় ছিল। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তারা আবার ক্ষমতায় যাবে। সেই অফিসে তালা। তাহলে নির্বাচন কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমরা এ ধরনের নির্বাচনের জন্য এরশাদের পতন ঘটাই নাই। আমরা সেই সময় ছাত্ররাজনীতি করেছি। অনেক কর্মী জীবন দিয়েছে গণতন্ত্রের জন্য, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য এবং স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হয়েছিল। আমরা নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই সব দলের অংশগ্রহণে। আমরা চাই না, একটি অফিসে তালা আরেক অফিসে নির্বাচনের উৎসব। এ কেমন রুগ্ণ গণতন্ত্র।
নীতিহীনদের নীতিকথা বলা ও প্রচারের বিশেষ ঝোঁক থাকে। বর্তমান সরকারের নীতিহীনতা ও দুর্নীতির কোনো পরিসীমা নেই। এটা প্রবলভাবে প্রকাশ পেয়েছে যে, সরকারের কুশীলবরা অসুস্থ রাজনীতি করছে। রবীন্দ্রনাথের সোনারতরী চাষিকে জমিতে রেখেই সব ফসল নিয়ে চলে গিয়েছিল। আশা ছিল, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সোনার তরীটিও এবার গণতন্ত্রের শস্যে গলুই পর্যন্ত ভরে উঠবে। কিন্তু তা না হওয়ার মাঝি মাল্লারা খুবই ক্ষুব্ধ। বাঙালি কি সোনার তরীকে ভয় পায়, বাঙালি কি দুঃস্বপ্ন দেখে নৌকার কথা ভাবলে! হতে পারে।

বাঙালি নৌকার বিভীষিকা দেখেছে। সম্ভবত আর দেখতে চায় না। নৌকাকে ঘাটে ভিড়তে দিতে বাঙালির আরো সময় লাগবে। নৌকার মাঝি মাল্লারা একটু বাড়াবাড়ি করতে পছন্দ করে অনেক বছর ধরেই করছে। এবার একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে।
আমরা গণতন্ত্র চাই, যদিও আমাদের অধিকাংশেরই কাছে গণতন্ত্র একটি নিরর্থক শব্দ।
এর জন্যে যে-প্রস্তুতি দরকার তা এখনো সম্পন্ন হয়নি; তবে কোনো দিন যে হবে না, এমন নয়। জাতিগতভাবে আমরা অসহিষ্ণু, পরের মতে শ্রদ্ধা পোষণ করার স্বভাব সাধারণত নেই আমাদের। আমরা সাম্যে বিশ^াস করি না, বিশ^াস করি প্রভু ও অনুচরে; তাই বাংলায় প্রভু মেলে, অনুচরও মেলে; শুধু মেলে না ভদ্র সম্পর্ক।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে গণতন্ত্র বিশেষ নেই; স্বৈরাচারের মধ্যে বাস করতে করতে তারা প্রচ্ছন্ন স্বৈরাচারেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। দলগুলোতে রয়েছে প্রভুরা। বিভিন্ন কর্মস্থলেও দেখা যায় একই ব্যাপার। উচ্চ কর্মকর্তা ও নিম্ন কর্মচারীর মধ্যে এখানে প্রভু ও দাসের সম্পর্ক, তারা সবসময় চালিত হয় ক্ষমতার সম্পর্ক দিয়ে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে অফিসের কর্তা ও পরিচালকের মধ্যে কোনো মানবিক বৈষম্য থাকে না। যদিও দায়িত্বের ক্ষেত্রে একজন ওপরে, আরেকজন নিচে। বিলেতে প্রধানমন্ত্রীর কোনো অধিকার নেই যেকোনো সাধারণ কর্মচারীর ওপর প্রধান মন্ত্রীগিরি ফলানোর। এখানে রাজনৈতিক দলগুলোতে নেতানেত্রীদের যমের মতো ভয় পায় অধীনস্থ নেতাকর্মীরা, কেননা নেতানেত্রীরা স্বেচ্ছাচারী। তাই কর্মীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিবর্তে গড়ে ওঠে অনুচরবৃত্তি। তারা রাজনীতিক হয়ে ওঠে না, হয়ে ওঠে অনুচর; সবসময় চোখ রাখে সুবিধার দিকে। একনায়ক হিসেবে হঠাৎ যারা দেখা দেয় তারা প্রভুরূপেই নিজেদের দেখে, অন্যদেরও দেখতে বাধ্য করে; আর রাজনীতিক নেতারাও ক্ষমতায় গিয়ে ক্রমেই প্রভু হয়ে ওঠে।

সমাজে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ক্ষমতাসীনরা মহাপুরুষ। আসলে চিরকালই ক্ষমতায় যায় মাঝারি মেধার লোকেরা। গণতন্ত্রে এটা সব সময় মনে রাখতে হবে যে ক্ষমতাসীনরা দেশের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি নন; শ্রেষ্ঠরা আছেন অন্যখানে, তারা কখনো ক্ষমতায় যাবেন না। এ দেশে রাজনীতিকরা খুবই নিন্দিত, তবে ক্ষমতাসীনদের স্তুতি করা বাঙালির স্বভাব; এই অনুসৃতিই দেশের সমাজ ও রাজনীতিতে গণতন্ত্র বিকাশের অন্তরায়।
এ দেশে রাজনীতিকদের বড় বড় উপাধি দিয়ে আকাশে তোলা হয়েছে; অনেককে দেবতা করে তোলা হয়েছে, কিন্তু তারা দেবতা নন। এখানকার বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকরা ক্ষমতাসীনদের পায়ের নিচে বসে লিখেন তাদের রচনাবলি, কিন্তু গণতন্ত্রে তাদের লেখার কথা ক্ষমতাসীনদের মাথার ওপর বসে। নিন্দিত মার্কিন দেশে দু’জন সাংবাদিক পতন ঘটাতে পারেন গ্রহের সবচেয়ে শক্তিমান ব্যক্তির, কেননা তারা পদতলে বসে লেখেন না। গালাগালিতে খুবই অভ্যস্ত আমরা, কিন্তু অন্যের বাক-স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নই।

লেখক যদি ধান্দাবাজ না হন, তবে তিনি সত্য প্রকাশ করবেনই। দেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতি গড়ে ওঠেনি বলে প্রতিটি দল রাজনীতিক গুণ্ডা পালে। তবে গুণ্ডারা ক্ষমতার সাথে থাকতেই সবসময় পছন্দ করে, কেননা তাতে তাদের সমৃদ্ধি ঘটে। ফ্যাসিতন্ত্রের শর্ত হচ্ছে, দলে বহু গুণ্ডা থাকবে, আর গণতন্ত্রের শর্ত হচ্ছে দলে কোনো গুণ্ডা থাকবে না। গণতন্ত্রযাত্রী বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে অবিলম্বে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতিক সংস্কৃতি বিস্তারে প্রধান ভূমিকা নেয়ার দায়িত্ব ক্ষমতাধিকারীদের। তাদের প্রথম কাজ নিজেদের গণতান্ত্রিক করে তোলা; দলের গুণ্ডাবাহিনী নিষ্ক্রিয় করা। কারো দু-হাত কেটে ফেলে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব; তবে সম্ভব নিজেদের পতন ত্বরান্বিত করা এবং দেশকে ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরতন্ত্রের কাছে সমর্পণ করা। মানুষ নানাভাবে হতভাগ্য হতে পারে; তবে যার দেশ বলে কোনো ভূ-ভাগ নেই সে সবচেয়ে হতভাগ্য।
প্রতিটি মানুষের চাই নিজের দেশ; যে দেশের মাটির অনেক গভীর পর্যন্ত ছড়ানো তার শেকড়। দেশ তার প্রতিটি সন্তানের কাছে প্রত্যাশা করে অনেক কিছু; আর সন্তানেরও দেশের কাছে প্রাপ্য অনেক। দেশের কাছে সন্তানের প্রাপ্য খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, জীবিকা এবং নিরাপত্তা। বাংলাদেশ তার সন্তানদের অনেক কিছুই দিতে পারে না। তার কিছু শক্তিমান, দুষ্ট সন্তান ভোগ করে তার সম্পদের অধিকাংশ; আর অধিকাংশ সন্তান জীবন কাটিয়ে দেয় ক্ষুধা, পীড়ন, আশ্রয়হীনতায়। ভাগ্যসন্ধানী কেউ কেউ পাড়ি জমায় বিদেশে।
খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা প্রভৃতি তার সন্তানদের দিতে পারেনি বাংলাদেশ। দিতে পারছে না নিরাপত্তাও। বাংলাদেশ দিন দিন তার সন্তানদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। কোনো নিরাপত্তা নেই চারপাশে। যানবাহনের হিংস্রতা, প্রকৃতির রোষ রয়েছে; তার চেয়ে বেশি করে রয়েছে এবং প্রতিদিন বেশি করে দেখা দিচ্ছে সামাজিক, রাজনৈতিক সহিংসতা, হিং¯্রতা। রাস্তা থেকে দুর্বৃত্তরা তুলে নিয়ে যাচ্ছে।

রাষ্ট্র পথিকের নিরাপত্তা দিতে পারছে না; দিকে দিকে ধর্ষণে মেতে উঠেছে রাজনৈতিক মাস্তানরা, কিন্তু রাষ্ট্র দিতে পারছে না তাদের নিরাপত্তা। দুর্বৃত্তের ভয়ে এখন দেশের প্রতিটি মানুষ। সুপরিচিত শক্তির স্নেহে দুর্বৃত্তেরা শানিয়ে চলেছে তাদের ছুরি। দেশ হয়ে উঠছে বিপজ্জনক। অচিরেই কি আমাদের খুঁজে ফিরতে হবে ‘নিরাপদ দূরত্ব’ উদ্বাস্তুর মতো ফিরতে হবে ইউরোপ আমেরিকার দেশে দেশে? শুধু প্রাণটুকুর জন্য? ধিক, এই রাষ্ট্রকে। রাষ্ট্র যখন ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠে তখন প্রতিটি বিবেকি মানুষই হয়ে ওঠে বিপন্ন। দেশের যারা শ্রেষ্ঠ সন্তান, তাদের জীবন হয়ে ওঠে ফ্যাসিবাদী ছুরি ও আগ্নেয়াস্ত্রের লক্ষ্য। বাংলাদেশে এখন ফ্যাসিবাদের প্রবল প্রসার ঘটছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের স্নেহে দীর্ঘ ছুরি নিয়ে বেরিয়ে পড়ার উপক্রম করছে সন্ত্রাসীরা। প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ নির্মূল করাই ভোট ডাকাতদের লক্ষ্য। ভোট ডাকাত হচ্ছে সভ্যতার শ্মশান। ভোট ডাকাত ফ্যাসিবাদী; তাদের রাজনীতির রূপে আমার ঢাকার সড়কে ও বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের বারান্দায় দেখেছি। হিটলারের জার্মানি ফ্যাসিবাদের লীলাক্ষেত্র। হিটলারের প্রচণ্ড বাহিনীর লক্ষ্যই ছিল জার্মানির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মাথা কেটে নিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠে। তারা প্রগতিশীল বইপত্রের বহ্নি-উৎসব করেছে, খুঁজে ফিরেছে প্রতিটি প্রগতিশীল মস্তিষ্ক ও হৃদয়। জার্মানি হয়ে উঠেছিল তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ভূখণ্ড। তাই দেশ থেকে নিরাপদ দূরত্বে চলে গেছেন আইনস্টাইন, মান, ফ্রয়েড, ব্রেশ্ট ও আরো বহু প্রতিভা, যারা বিশ শতকের স্থপতি। বর্বরের কাছে আইনস্টাইনের কোনো মূল্য নেই, বর্বর পছন্দ করে আইনস্টাইনের লাশ দেখতে; দুর্বৃত্তের কাছে ফ্রয়েডের গুরুত্ব এটুকু যে তার দীর্ঘ ছুরি ওই হৃৎপিণ্ডে ঢুকিয়ে দিতে পারে।
লেখক: সভাপতি: সাংবিধানিক অধিকার ফোরাম; নব্বইয়ের সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের কেন্দ্রীয় নেতা