জাতীয় নির্বাচন প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করার সুযোগ পায়। পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশের সরকার পরিবর্তনের একটিই নিয়ম আর তা হলো- একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করেন। ভোট প্রয়োগের এই ক্ষমতাই হলো জনগণের সার্বভৌমত্ব। বাংলাদেশ সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ ১৫ বছর ধরে তার এই সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছে না। কর্তৃত্ববাদী কায়দায় তাদের ভোটাধিকার হরণ করা হচ্ছে, কখনো রাতের আঁধারে, আবার কখনো ভোটকেন্দ্রে না যেতে দিয়ে।

নির্বাচন কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নয়; বরং সব মানুষের জন্য সমান অধিকারবিশিষ্ট সাংবিধানিক বিধি-বিধান। সৎ-যোগ্য-মেধা-প্রজ্ঞা-দেশপ্রেমে ঋদ্ধ ও জনগণের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, দুঃসময়ে পরীক্ষিত নেতৃত্বকেই জনপ্রতিনিধিরূপে নির্বাচিত করার জন্য জনগণ তাদের সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ন্যায়সঙ্গত অধিকার ভোগে বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশে বর্তমানে এই অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অনুপস্থিতিতে জনমনে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলেও চলছে নানামুখী তৎপরতা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, রাশিয়ার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। পরিস্থিতি এমন যে, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বিদেশী শক্তিগুলো পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলছে। স্বাধীন দেশের ভূখণ্ডে বিদেশীদের তৎপরতা এবং চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রতিনিয়ত দেশের জনগণকে ভাবিয়ে তুলছে। অবশ্য বিদেশীদের এই হস্তক্ষেপের জন্য দায়ী ক্ষমতাসীনরা। ক্ষমতাসীন দল নিজেদের ইচ্ছামাফিক সংবিধানের সংশোধন করে নিজেদের ইচ্ছার কাছে জনগণের ইচ্ছাকে জিম্মি করে ফেলতে চায়। জনগণের অধিকার হরণের কারণকে কেন্দ্র করেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ ও বিরোধের সুযোগ নিয়েই বিদেশী শক্তি বিভিন্ন পক্ষে বাংলাদেশের রাজনীতির উপর খড়গ নাড়ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ক্রমেই বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে পশ্চিমাদের কাছে। বর্তমান বাস্তবতায় এর গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের চোখ দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রতি দৃষ্টি রাখত কিন্তু ভারত মার্কিনদের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারেনি। ভারত শুধু বাংলাদেশ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশের সাথেও সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারেনি। এমনকি মালদ্বীপের মতো ছোট দেশও এখন আর ভারতের কথা শুনছে না। মালদ্বীপ থেকে ভারতের সেনাবাহিনীকে সরিয়ে আনতে হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। পেছন থেকে সমর্থন দিয়ে একটি দুর্বল, জনগণের সমর্থনবিহীন সরকারকে ফ্যাসিবাদী করে গড়ে তুলে সেই সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে নতজানু করে রাখার কৌশল থেকে ভারত আওয়ামী লীগকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখার জন্য জনগণের সমর্থনের তোয়াক্কা করছে না।
ভারত বাংলাদেশকে হাতের পুতুল বানিয়ে রাখতে চায়। তারা মনে করে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশ তাদের মুঠির মধ্যে বন্দী থাকবে। অর্থাৎ তাদের কথামতো সব কাজ করবে। অন্যদিকে চীনেও এক ধরনের একনায়ক সরকার বিদ্যমান। রাশিয়াতেও বিরোধী রাজনীতিকে কোণঠাসা করে একনায়কতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে আছেন ভøাদিমির পুতিন। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ভারতকে যেমন চাহিবা মাত্র সব কিছু দিয়ে দিচ্ছে, তেমিন চীন-রাশিয়ার ফ্যাসিবাদী কায়দায় রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। ইত্যাদি কারণে ভারত, চীন ও রাশিয়া আওয়ামী লীগ সরকারকেই ক্ষমতায় রাখতে চায়।

আওয়ামী লীগ বিগত ১৫ বছরে সব ধরনের নির্বাচনে মানুষের ভোটের অধিকার হরণ করে চলেছে। বিরোধী সব রাজনৈতিক দল ও ভোটের অধিকার হারানো সব শ্রেণীর লোক ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য আন্দোলন করলেও ভারত, চীন ও রাশিয়ার দৃষ্টি সেদিকে নেই। তারা বলছে, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ নির্বাচন করতে সক্ষম। তারা আরো বলছে, ‘বাংলাদেশের নির্বাচন দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়’। তাদের এই বক্তব্য দেশের জনগণের মতের বিপরীত। এই তিনটি দেশের সরাসরি প্রশ্রয়ে ক্ষমতাসীন দল আরেকটি এক তরফা নির্বাচনের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির পশ্চিমা মিত্ররা ওই তিনটি দেশের ঠিক বিপরীতে গিয়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলে আসছে বারবার। বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে তাদের সমর্থন নেই বলেও জানিয়েছে তারা। তবে, এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ^ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। বিদেশী বিভক্ত শক্তির মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের ক্ষমতাসীন সরকার খুব একটা পাত্তা দিেেচ্ছ না। তারা একগুঁয়েমি করেই একটি জনসমর্থনবিহীন নির্বাচন করার জন্য নির্বাচন কমিশনের সাথে একাট্টা হয়ে কাজ করছে।

পশ্চিমা শক্তি এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সরকারি দল এবং রাষ্ট্রের নিরপত্তাবাহিনী একত্রিত হয়ে ভোটের অধিকার চাওয়া মানুষগুলোর উপর অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রেফতার করা হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে। একজন বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীকে না পেলে তার ভাইকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। সন্তানকে না পেলে মা-বাবাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা আছে, অত্যন্ত অন্যায়ভাবে তাদেরকে বিচারের নামে প্রহসন সাজিয়ে সাজা দেয়া হচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, চার-পাঁচ দিন পরপর তারিখ দিয়ে এবং মামলার বাদি ও সাক্ষী (যারা সবাই পুলিশ) তাদেরকে ফোন করে ডেকে এনে সাক্ষী দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এমনকি পুলিশ যদি সাক্ষী দিতে গরহাজির থাকে এবং এজহারের মতো করে সাক্ষী দিতে না পারে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে মর্মে পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়। বিরোধী রাজনীতিকে কঠোরভাবে দমন করার জন্য সরকার সব পক্ষকে একই কাজে ব্যবহার করছে। সব মিলিয়ে দেশকে একটি নৈরাজ্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে। মূল কথা- চীন, ভারত ও রাশিয়ার সমর্থনে তারা যেকোনো উপায়ে একটি একতরফা নির্বাচন করার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার-বিষয়ক সংগঠন সিভিকাস মনিটর গত ৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত রিপোর্টে বলেছে, ‘বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের কথা বলার স্থান বন্ধ (ক্লোজড) হয়ে গেছে। ‘পিপল পাওয়ার আন্ডার অ্যাটাক-২০২৩’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ১৯৮টি দেশের নাগরিক অধিকার পরিস্থিতির বিশদ বিবরণ দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে ভিন্নমত দমনে সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে বলা হয়েছে- বাংলাদেশে কর্তৃপক্ষ মানবাধিকার রক্ষাকারীদের টার্গেট করেছে, সাংবাদিক, বিক্ষোভকারী ও অন্যান্য সমালোচকদের নানা উপায়ে ভীতি প্রদর্শন করছে। তারা নানা ধরনের সহিংসতা, গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সুশীলসমাজের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন এবং তাদের তহবিল ও কার্যক্রমের ওপর বিধিনিষেধ, সরকার কর্তৃক মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, অধিকারের দুই মানবাধিকারকর্মী আদিলুর রহমান ও নাসির উদ্দিন এলানকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা, নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে হয়রানি এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিরোধী দলের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন ও গ্রেফতার, সাংবাদিকদের হয়রানি, নজরদারি, নির্যাতন ও শারীরিক হামলাসহ তাদের কাজের জন্য টার্গেট করার ঘটনাওগুলোকেও নথিভুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিভিকাস’ (নয়া দিগন্ত, ৭ ডিসেম্বর ২০২৩)। সিভিকাসের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গবেষক জোসেফ বেনেডিক্ট মন্তব্য করেছেন, ‘যদিও বছরের পর বছর ধরে আমরা শেখ হাসিনার শাসনামলে নাগরিক স্বাধীনতার উপর বিধিনিষেধ দেখেছি, কিন্তু ২০২৩ সালে এই লঙ্ঘন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আরো বলেছেন, শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সম্ভব সব কিছু করছে। জোসেফ আরো যোগ করেছেন, ‘বর্তমান পরিবেশে কোনো অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।’

বর্তমান পরিস্থিতি বিরোধী রাজনীতির জন্য এতটাই নাজুক যে, গোটা দেশ তাদের জন্য কারাগার হয়ে পড়ছে। সরকারপ্রধান তার দলের কর্মীদের ওপর হুকুম জারি করে রেখেছেন,বিএনপির কাউকে দেখা মাত্রই যেন পুলিশে সোপর্দ করা হয়। জনগণ ভয়ের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। অন্যদিকে, জনগণের হয়ে যে সুশীলসমাজ কথা বলত তাদের স্থানও সঙ্কুচিত হয়ে গেছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ভয়ের মধ্যে আটকে ফেলেছে। মোটা দাগে গোটা দেশটিকে স্বৈরশাসনের মধ্যে নিপতিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রের এই ভীতিকর অবস্থায় দেশের জনগণের একটি বৃহৎ অংশ নির্বাচনের ওপরে, প্রশাসনের ওপরে, সত্যতার ওপরে, খবরের ওপরে তাদের সমস্ত আস্থা হারিয়ে ফেলছে। জনগণকে ভয়ের মধ্যে রেখে জনগণের অনাস্থা সত্ত্বেও নির্বাচনের আয়োজন প্রহসন ছাড়া আর কী হতে পারে।
harun_980@yahoo.com