সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির রূপ দেয়ার সভ্য পৃথিবীর আকাক্সক্ষাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে ইসরাইল আবারো গাজায় অগ্নিবর্ষণ শুরু করেছে। ১ ডিসেম্বর শুক্রবার ভোরে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গাজায় আবার বর্বরোচিত বোমাবর্ষণ শুরু করা হয়। প্রাথমিক হামলায় শতাধিক ফিলিস্তিনির শাহাদতবরণ ও অসংখ্য আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এটি এমন এক সময় হচ্ছে, যখন গাজার হাসপাতালগুলো আহতদের চিকিৎসা দিতে অপারগ। বেশির ভাগ হাসপাতাল ইসরাইলি বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়ে গেছে। যে কয়টি অবশিষ্ট আছে তাদের কাছে ওষুধ ও সরঞ্জাম নেই। এমনকি গাজায় শহীদদের দাফন করার সামগ্রীও দুষ্প্রাপ্য। ইসরাইল গত ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় যে হাজার হাজার টন বারুদ নিক্ষেপ করেছে, তার ফলে ১৫ সহস্রাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। এদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। শাহাদতের সুধা পানকারী অল্পবয়সী শিশুদের ছবি দেখে বিশ্ব চিৎকার করেছে। সবার এটিই আশা ছিল যে, বন্দীবিনিময়ের নামে যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলো, তা স্থায়ী সমাধানে রূপ নেবে। কিন্তু ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মাথায় গাজাকে ভূপৃষ্ঠ থেকে মুছে ফেলার যে উন্মত্ততা চেপে বসেছে, তা তাকে হিংস্র পশু বানিয়ে দিয়েছে।

ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আগেই বলেছিলেন, মানবিক বিবেচনায় বিরতি শেষ হওয়ার পর পুরো গাজায় কঠিন হামলা করা হবে। আর এ যুদ্ধ লক্ষ্য অর্জনে অবশ্যই পৌঁছবে। এর আগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও বলেছিলেন, ‘হামাস সম্পূর্ণরূপে নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ অব্যাহত রাখবেন। তিনি পৃথিবীর বুক থেকে তাদের মুছে ফেলেই তবে ক্ষান্ত হবেন।’ এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, ইসরাইল হামাসকে মুছে ফেলার জন্য গাজায় যে চূড়ান্ত পর্যায়ের ধ্বংসযজ্ঞ চালাল, এতে তারা কী পরিমাণ সফলতা পেলো? এর জবাব হচ্ছে শূন্য। কেননা, এখন পর্যন্ত ইসরাইল তাদের লক্ষ্য অর্জনে সফল হতে পারেনি। তারা এ সময়ে যা কিছু করেছে, তার ফলে গাজার সাধারণ নাগরিকরাই মারা গেছে। তাদের জীবন জাহান্নামে পরিণত হয়েছে। পক্ষান্তরে তারা হামাসের সামান্যই ক্ষতি করতে পেরেছে। ইসরাইলি বাহিনী উত্তর গাজায় ৬০ শতাংশের বেশি বাড়িঘর ও আশ্রয়শিবির ধ্বংস করে দিয়েছে। ৫০ সহস্রাধিক পরিবার সম্পূর্ণরূপে নিজেদের বাড়িঘর হারিয়েছে। এ ছাড়া আড়াই লাখ বাড়িঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৬-এর অধিক হাসপাতাল এবং ৫৫টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিপূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়েছে। হাজার হাজার শহীদের লাশ এখনো ধ্বংসস্তূপে দাফন হয়ে আছে। তাদের খুঁজে বের করা ও কাফন-দাফনের আগেই গাজায় আবার বারুদ বর্ষণ শুরু হয়ে গেছে। এই মানবিক দুঃখগাথার পরিণাম কী হবে, তা কেউ জানে না। ইসরাইলি আগ্রাসনে সবচেয়ে বড় দু’মুখো ভূমিকা পালন করছে আমেরিকা। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন কিরবি একদিকে তো যুদ্ধবিরতিতে মেয়াদ বৃদ্ধির চেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন, আবার অন্যদিকে এ কথাও বলেছেন যে, যদি ইসরাইল আবার হামাসের পেছনে লাগার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আমেরিকা তাকে সাহায্য করবে।
উল্লেখ্য, গত দেড় মাসের মধ্যে এই গাজাতে যে বর্বরোচিত বোমাবর্ষণ হয়েছে, তাতে যেখানে একদিকে ফিলিস্তিনি জনগণকে মারাত্মকরূপে জান-মালের ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, সেখানে এ যুদ্ধের ফলে ইসরাইলের অর্থনীতির কোমর ভেঙে গেছে। তাদের মুদ্রার মান ১০ বছর পেছনে চলে গেছে। নেতানিয়াহুর হঠকারিতা ও অনর্থক জেদের ফলে খোদ দেশের অভ্যন্তরে তার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। তাকে একপর্যায়ে লাঞ্ছিতও হতে হয়েছে। আগে আমরা এ যুদ্ধের ফলে ইসরাইলের আর্থিক ক্ষতির পর্যালোচনা করব। এরপর একনজরে এ যুদ্ধ থেকে নেতানিয়াহু ও তার সমর্থকদের ক্ষতির ওপরও দৃষ্টিপাত করব।

জায়নবাদী সরকারকে গাজার যুদ্ধের ফলে প্রতি সপ্তাহে ৬০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি গুনতে হচ্ছে। তাদের অর্থনীতি অধঃমুখী। ইসরাইলের চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ওয়্যার কেবিনেটের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে যুদ্ধের ব্যয়ের পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে উপস্থাপিত রিপোর্ট মোতাবেক ইসরাইলকে এ যুদ্ধের কারণে প্রতি সপ্তাহে এক বিলিয়ন শেকেল (ইসরাইলি মুদ্রা) ক্ষতি গুনতে হচ্ছে, যা ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। ওই ব্যয়ের মধ্যে জায়নবাদী সেনাদের বেতনও শামিল। অন্যদিকে, বিমান হামলা ও অস্ত্রসংক্রান্ত ব্যয় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। হামাসের পক্ষ থেকে ‘তুফানুল আকসা’ অপারেশন শুরু হওয়ার পর জায়নবাদী সরকার তিন লাখ ৬০ হাজারের বেশি রিজার্ভ বাহিনীকেও তলব করেছে, যার কারণে শুধু বেতন বাবদই মাসিক খরচ ১৩০ কোটি ডলারের বাড়তি বোঝার চাপ নিতে হচ্ছে। এ ছাড়াও রিজার্ভ বাহিনী তলবের কারণে ইসরাইলের অপর অর্থনৈতিক কার্যক্রমগুলোর ওপরও মারাত্মকরূপে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। কেননা, এ বাহিনীর একটি বিশাল অংশ বিভিন্ন শাখায় কাজ করছিল। আরেক দিকে যুদ্ধের কারণে ইসরাইলি মুদ্রা ক্রমাগত মান হারাচ্ছে। মার্কিন সম্প্রচার সংস্থা ব্লুমবার্গের বক্তব্য, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইসরাইলি মুুদ্রার মান ৭ শতাংশ কমেছে। ইসরাইলের বন্ড ও স্টকেও কম লেখা হয়েছে। পুঁজিবাদীদের আশঙ্কা, গাজায় চলমান যুদ্ধ আঞ্চলিক বিবাদের আকার ধারণ করতে পারে। যুদ্ধে জড়িত কোনো রাষ্ট্রের ওপর এ ধরনের প্রভাব কোনো নতুন কিছু নয়। যখনই কোনো দেশ যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তাকে চারদিকের ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়। এ বাস্তবতা সত্ত্বেও যুদ্ধ কোনো সমস্যার সমাধান নয় এবং স্বয়ং সেটি নিজেই এক মারাত্মক সমস্যা। কিছু দেশ সেটিকেই প্রাধান্য দেয়। এতে সেই শক্তিগুলো সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়, যারা যুদ্ধের সরঞ্জাম তৈরি করে এবং অস্ত্রবাণিজ্যের ওপর যাদের অর্থনীতি নির্ভরশীল। যে দেশগুলো সবার আগে ইসরাইলের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে, আমেরিকা তাদের শীর্ষে রয়েছে। তারা তাদের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ গাজার সীমান্তে মোতায়েন করেছে।

অনুরূপভাবে ব্রিটেন, জার্মানি এবং ফ্রান্সও ইসরাইলের যুদ্ধোন্মাদনাকে আগ বাড়িয়ে দিয়েছে। যদি এ দেশগুলো চাইত, তাহলে ইসরাইলকে আক্রমণে বাধা দিয়ে ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান করতে জোর দিত। কিন্তু তার পরিবর্তে তারা ইসরাইলের পৃষ্ঠপোষকতাকে প্রাধান্য দিয়েছে। এখন এতটা ধ্বংস এবং ক্ষতি হওয়ার পর আমেরিকা ও পশ্চিম দুনিয়া দুই রাষ্ট্র সমাধানের কথা বলছে, যা এ সমস্যার একমাত্র সমাধান। গাজায় ইসরাইলের বোমাবর্ষণে হাজার হাজার মৃত্যুর বিরুদ্ধে মুসলমানরা ইসরাইলকে সহায়তাকারী ব্রান্ডের পণ্য বয়কটের যে আন্দোলন শুরু করেছিল, এর দ্বারাও আমেরিকা ও পশ্চিমা পণ্য বিক্রয়ের ওপর প্রভাব পড়েছে। আরব দেশের নাগরিক ক্রেতাদের মধ্যে ইসরাইলকে সহায়তাকারী কোম্পানির ব্রান্ড বয়কটের আন্দোলন বেশ ছড়িয়ে পড়েছে। এ বয়কটের আওতায় বিশেষ করে পশ্চিমা ব্রান্ডের খাদ্য-পানীয় পণ্য ও ঘরে ব্যবহারের পণ্যও শামিল রয়েছে। যে আরব দেশগুলোতে বিক্ষোভ আন্দোলনের অনুমতি নেই, সেখানে পশ্চিমা ও মার্কিন খাদ্যসামগ্রী সম্পূর্ণরূপে বয়কট বিক্ষোভের সবচেয়ে অভিনব পন্থা, যা মিসর, কুয়েত, জর্দান ও মরক্কোতে বিশেষভাবে অবলম্বন করা হয়েছে। বয়কটের এ আন্দোলনের আওতায় ওই কোম্পানিগুলোও অন্তর্ভুক্ত, যারা ইসরাইলের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে এ যুদ্ধে তাদের খোলাখুলি সমর্থন প্রকাশ করেছে এবং যারা ইসরাইলকে আর্থিক সাহায্য প্রদানে সামনের কাতারে থাকে। বয়কটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ম্যাকডোনাল্ড, স্টারবাক্স ও কেএফসির মতো ব্রান্ডের ওপর। আর এসবই আমেরিকার ব্রান্ড। এর দ্বারা স্পষ্ট হয়, ইসরাইলের পাশাপাশি তার সহায়তাকারীদেরও আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। গাজায় যতই ইসরাইলের আক্রমণ বৃদ্ধি পাবে, তাদের ক্ষয়ক্ষতিও ততটাই বাড়তে থাকবে।

এ যুদ্ধের ফলে আমেরিকা ও ইসরাইলের নেতৃত্বেও বিতৃষ্ণা তৈরি হয়েছে। শুধু নেতানিয়াহুরই নিজ দেশে অবস্থান দুর্বল হয়ে যায়নি; মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকেও তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়তে হয়েছে। বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও গাজায় যে যুদ্ধাভিযান শুরু হয়েছিল, তার বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল হামাসের নামনিশানা মিটিয়ে দেয়া এবং বন্দীদের মুক্ত করা। কিন্তু দেড় মাসের যুদ্ধে ইসরাইল বাহিনী তাদের লক্ষ্য পূরণে বিশেষ কোনো সফলতা অর্জন করতে পারেনি। এটি অপ্রত্যাশিত যে, ইসরাইলি বাহিনী দেড় মাসেও হামাসকে শেষ করতে পারেনি। তেলআবিবে অবস্থানরত ইসরাইল-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ খেমরাজের বক্তব্য, ‘এখন তো এ অভিযান এক বছরেও শেষ হওয়া অসম্ভব মনে হচ্ছে। কেননা, হামাসের যোদ্ধারা ৫০০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সুড়ঙ্গের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে।’ তিনি এ কথাও বলেন, ‘এ পরিস্থিতির কারণে ইসরাইলে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইসরাইলি বাহিনী এমন এক লড়াই লড়ছে, যেখানে তারা জয়লাভ করতে পারছে না, যার কারণে তাদের কপালে ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে।’ ইসরাইলের সদ্য জরিপে নেতানিয়াহুর অবস্থান বেশ দুর্বল দেখা যাচ্ছে। তার দলের কিছু সদস্য ইসরাইলের ব্যর্থতার জন্য তাকে দায়ী করে পদত্যাগও করেছেন।
মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক মুম্বাই উর্দু নিউজ ৩ ডিসেম্বর, ২০২৩ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট