২৭ ডিসেম্বর ২০২৩ গুলিস্তান ফুলবাড়িয়া মোড় থেকে কিছু পণ্য নিয়ে এক সিএনজি থ্রি হুইলার গাড়িতে উঠি। এ সময় একজন এসে আমার কাছে চাঁদা চান। বললেন, আমরা লেবার। এটি আমাদের এলাকা। আমি বললাম, আমি তো নিজে আমার মাল গাড়িতে তুললাম, আপনাদের প্রয়োজন হচ্ছে না। উত্তরে বললেন, আমরা মাল ধরলে ৪০ টাকা দেয়া লাগত। আপনি উঠিয়েছেন এ জন্য ২০ টাকা দেন। তার কথা ছিল সন্ত্রাসী স্টাইলের। আমি এ টাকা নেয়ার আইনি ভিত্তি জানতে চাইলাম। তারা একই কথা বললেন, এটি আমাদের এলাকা। টাকা দিতে হবে। ঝামেলা এড়াতে টাকা দিলাম, তিনি একটি স্লিপও দিলেন। সেখানে শিরোনামে লেখা- ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা।’ সিএনজি চালকের থেকেও তিনি ২০ টাকা নিলেন। সেদিন দেখলাম ওখানে একটি টিম বিরতিহীনভাবে পাবলিকের কাছ থেকে চাঁদা নিচ্ছে। স্লিপের ওপর লেখা, ‘ফুলবাড়িয়া স্টপওভার বাস টার্মিনাল ও সংলগ্ন এলাকা, গোলাপশাহ মাজার এলাকা জিরো পয়েন্ট, টিঅ্যান্ডটি সম্মুখভাগ এলাকা, বঙ্গবাজার এলাকা, নবাবপুর রোড, চকবাজার এলাকা, কাজী নজরুল ইসলাম সরণি নর্থ সাউথ রোড, ইংলিশ রোড, এ এইচ এম কামরুজ্জামান সরণি, চানখাঁরপুল এলাকা, ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকা, বকশিবাজার এলাকা, আজিমপুর এলাকা, নিউ মার্কেট এলাকা, সুন্দরবন স্কয়ার, ঢাকা ট্রেড সেন্টার ট্রান্সপোর্টসহ মালামাল লোড-আনলোড টোল ফি সংশ্লিষ্ট মার্কেটের সম্মুখভাগ থেকে আদায়যোগ্য।’ রসিদ নম্বর ছিল ১২০৬। তাতে আরো লেখা টোল ফি আদায়ের রসিদ ইজারাদার প্রতিষ্ঠান, ‘জনাব নিলয় মাহমুদ’।
শুধু এই এলাকাগুলোতেই নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় এরকম টাইপের স্লিপ ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। পোস্তগোলা ব্রিজের ঢালেও এরকম স্লিপ ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করা হয় যেটা নিয়ে বেসরকারি টিভি চ্যানেল এটিএন বাংলা একটি প্রতিবেদনও সম্প্রচার করে। বাসে-টেম্পোতে, লেগুনা-ট্রাকসহ প্রায় সব ট্রান্সপোর্টে নিয়মিত চাঁদাবাজি চলে। গাজীপুরে বাস-মিনিবাসে একটি পরিবার প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করে। এ বিষয়ে ২০১০ সালে দৈনিক কালের কণ্ঠ বড় নিউজ করেছিল। তখন সেই পরিবার গাজীপুর থেকে সব কালের কণ্ঠ কিনে ধ্বংস করে। যাতে পাবলিক তাদের চাঁদাবাজির ঘটনা জানতে না পারে। মাদারীপুরের একটি পরিবার বাস-ট্রাক থেকে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকা চাঁদা তুলে যেটা নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম নিউজ করে। বাসটার্মিনালগুলোতে গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী চাঁদাবাজদের সিন্ডিকেট বেশ শক্তিশালী। ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে ব্যাপক চাঁদাবাজি ছিল। পদ্মা ব্রিজ চালুর পর সেটি কিছু কমেছে। তবে পদ্মা সেতুতে অতিরিক্ত টোল আদায় করা হয়। আর পদ্মা ব্রিজের স্লোপের দুই দিকের সড়কেও টোল দিতে হয়। নাগরিকদের জন্য এটি চরম জুলুম। দেশের হাজারও পণ্যের মূল্য অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে চাঁদাবাজির কারণে।
ঢাকার সদরঘাটে লাল শার্টওয়ালাদের চাঁদাবাজি সন্ত্রাসী বহু অতীত থেকে। ইটভাটাগুলোতে চাঁদাবাজি চরম পর্যায়ে। গত ২৮ ডিসেম্বর ২০২৩ দৈনিক প্রথম আলোতে একটি খবরের শিরোনাম ছিল, ‘শিল্প-কারখানা করতেও চাঁদা দিতে হয় জনপ্রতিনিধিকে।’ উপশিরোনাম ছিল- সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড-ট্রেড লাইসেন্স নেয়া, কারখানা নির্মাণের জমিতে বালু ভরাটসহ নানা কাজে চাঁদা নেন ইউপি চেয়ারম্যান ছাদাকাত উল্লাহ।
ব্যাটারিচালিত গাড়িগুলো থেকে প্রতিদিন চাঁদাবাজি হয়। এসব চাঁদাবাজি হয় রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে।
কয়েকদিন আগে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, এমপির মতো রাজনৈতিক পদে থাকতে পারলে অনেক লুটপাট করা যায়। যেটি গত ১৫ বছরে প্রমাণিত। রাজনৈতিক শেল্টার ছাড়া সারা দেশে চাঁদাবাজি চলতে পারে না। সভ্য কোনো দেশে এমন চাঁদাবাজি চলতে পারে, তা ভাবতেই অবাক লাগে।
প্রশ্ন হচ্ছে, স্বাধীন দেশে একটি গোষ্ঠী বিশাল সংখ্যক নাগরিকের কাছ থেকে চাঁদাবাজি কিভাবে করতে পারে?
