আমার বাসার অতি নিকটেই বিশাল মসজিদ। মসজিদের উচ্চ মিনারও আছে। দুঃখজনক ব্যাপার এই মসজিদের আজান শুনে ভালো লাগে না! আজান সুন্দর হয় না, শ্রুতিমধুর নয়, সেটা তো আছেই অন্য দিকে মুয়াজ্জিন সাহেব আজান শুরুর আগেই প্রচণ্ড উচ্চ শব্দে ঠক ঠক করেন। অর্থাৎ তিনি মাইক টেস্ট করেন ঠক ঠক শব্দ করে। প্রতিদিন পাঁচবার আজানের আগেই তিনি এই ঠক ঠক শব্দ করেন। এটা আমার কাছে চরম এক বিরক্তিকর, আরো অনেকের কাছে বিরক্তিকর। এই আধুনিক যুগেও তিনি এভাবে ঠক ঠক করে মাইক টেস্ট করছেন ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক। এ রকম মাইক টেস্ট করার পদ্ধতি আরো কয়েক জায়গায় দেখেছি; কিন্তু এটা উচিত নয়। এই মসজিদটি তৈরিতে আরবের কোনো এক ধনাঢ্য ব্যক্তি আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। মসজিদে এসিও আছে অনেকগুলো। তা ছাড়া আধুনিকতার আরো অনেক ছোঁয়া আছে। কিন্তু মসজিদের মুয়াজ্জিন সাহেব প্রকৃত আধুনিক হতে পারলেন না। এমনকি আজান শুদ্ধ উচ্চারণও হয় না। আমি ভদ্রলোক মুয়াজ্জিন সাহেবকে এই ঠক ঠক শব্দ করা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম এবং বলেছিলাম এটার নেতিবাচকতার ব্যাপারে। তিনি উত্তরে বলেছিলেন কমিটির লোকজন, এলাকার লোকজন নাকি মাইক টেস্ট করে আজান দিতে বলেছেন। মসজিদের ইমাম সাহেবকেও বলেছিলাম। তিনি ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন; কিন্তু সমাধানের ব্যাপারে কিছু বলেননি। এই মসজিদের ইমাম সাহেব এবং মুয়াজ্জিন সাহেব উভয়েই বেশ ভদ্রলোক। টানা দশ বছর এই মসজিদের অতি নিকটে আমার বাসা। ইমাম সাহেবের সাথে দেখা হলেই সালাম বিনিময় হয়। তিনি নিজেই আগে সালাম দেন। এই যে আজানের পূর্বে ঠক ঠক শব্দ করেন এতে তো শিশুরা বুঝতে পারে ঠক ঠক করা আজানেরই অংশ! তা ছাড়া এটা একটা শব্দ দূষণ। যেসব মসজিদে আজানের আগে ঠক ঠক শব্দ করে না সেসব মসজিদের মাইকগুলো কি আসমান থেকে এসেছে? কেন তাদের এ রকম বিরক্তিকর শব্দ করে মাইক টেস্ট করতে হচ্ছে? জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম, চকবাজার মসজিদ, লালবাগ শাহী মসজিদে, গাউসুল আজম মসজিদে, আজাদ মসজিদে তো এ রকম মাইক টেস্ট করা হয় না, আরো লাখ লাখ মসজিদে এ রকম বিরক্তিকর শব্দ করে মাইক টেস্ট করা হয় না তাদের মাইক কি আসমান থেকে এসেছে?
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন- ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই, যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।’

যুগে যুগে আজান নিয়ে হাজার রকমের আবেগীয় কথা বলেছেন পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিগণ। হজরত বেলাল (রা:) কর্তৃক আজান দেয়ার ইতিহাস থাকবে কেয়ামত পর্যন্ত। হজরত ওমর ফারুক (রা:) কর্তৃক প্রকাশ্য আজান চালুর ইতিহাসও থাকবে কেয়ামত পর্যন্ত।
কবি শামসুর রাহমান নাকি আজান নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছিলেন! এটা নিয়ে তার বিরুদ্ধে বেশ সমালোচনা আছে। এই কারণে কবি শামসুর রাহমানকে এক দিন বাংলা একাডেমিতে খুব কাছে পেয়েও তার সাথে হ্যান্ডসেক করিনি! অনেককে দেখেছি দৌড়ে এসে কবি শামসুর রাহমানের সাথে হ্যান্ডসেক করেছেন। অথচ কিশোর বয়সে কবি শামসুর রাহমানের লেখা স্বাধীনতা কবিতা আমি বেশ মজা করে আবৃত্তি করতাম। আমি কবিতা আবৃত্তি খুব পছন্দ করতাম। কবিতা আবৃত্তি করে নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে পুরস্কারও পেয়েছিলাম। যেই কবি শামসুর রাহমান আজান নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছেন সেই শামসুর রাহমান তার লেখা স্বাধীনতা কবিতায় উল্লেখ করেন- ‘স্বাধীনতা তুমি
শ্রাবণে অকূল মেঘনার বুক,
স্বাধীনতা তুমি পিতার কোমল জায় নামাজের উদার জমিন।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন লোকের আজানবিষয়ক কিছু কথা ভাইরাল হয়েছে। তিনি সমালোচিতও হয়েছেন। তিনি সম্ভবত সঙ্গীতের লোক; বয়স্ক ব্যক্তি। তিনি বললেন বাংলাদেশের আজান সবচেয়ে খারাপ! এবং তিনি ব্যঙ্গ করেছেন শ্রুতিমধুর নয় এমন আজানের! তিনি অবশ্যই এর বাইরে মসজিদ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যও করেছেন। তবে তিনি যে আজান নিয়ে মন্তব্য করেছেন সেটা চিন্তার বিষয়। এ ব্যাপারে দেশের বিজ্ঞ আলেমদের কাজ করা উচিত। শুদ্ধ উচ্চারণের এবং শ্রুতিমধুর আজানের জন্য একটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটও হতে পারে। দেশে প্রায় চার লাখের কাছাকাছি মসজিদ রয়েছে। বেশির ভাগ মসজিদে শ্রুতিমধুর আজান হয় না এটা স্বীকার করতেই হবে। এমনকি উচ্চারণেও সমস্যা। এ দেশে এত মাদরাসা তার পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যারাবিক বিষয়ে ভর্তি হলে তারা শিক্ষার্থীদের শুদ্ধ উচ্চারণে আলিফ বা তা ছা পড়ান। বিষয়টা চিন্তার।