মনে হচ্ছে বর্তমানে ভারতে মুসলমানদের কষ্ট দেয়া একটি স্বতন্ত্র নীতি হয়ে গেছে। আগে এ কাজটা করত সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলো। কিন্তু যখন থেকে এ শক্তিগুলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে, তখন থেকে পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে উদ্বেগজনক হয়ে গেছে। অথচ ভারতের সংবিধান এখন পর্যন্ত সেকুলার এবং দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু কার্যত সব কিছু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সন্তুষ্টির জন্য করা হচ্ছে। মুসলমানদের এমনভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে যে, যেন তারা এ দেশের আসল নাগরিক নন, তারা ভিনদেশী কেউ, যাদের শেকড় উপড়ে ফেলা দেশের স্বার্থে জরুরি ধরে নেয়া হয়েছে। আগামীতে তাদের মানসিক ও আবেগী কষ্ট দিয়ে তাদের ভেতর ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যাতে তারা নিজেদের বিছানাপত্র গোটানো শুরু করে দেয়। রামমন্দির উদ্বোধনের পর তো ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলোর সাহস এত বেড়ে গেছে যে, মুসলমানদের মুছে ফেলতে তাদের প্রস্তুত দেখা যাচ্ছে। সরকারের মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে সব নাগরিকের মাঝে নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করা এবং জানমালের নিরাপত্তা প্রদান করা। কিন্তু এর বিপরীতে সরকার এমন গোষ্ঠীকে সাহস জোগানোর নীতির পথে হাঁটছে, যারা মুসলমানদের ক্রমাগত ভীতসন্ত্রত করে যাচ্ছে। এর কার্যকর প্রমাণ সম্প্রতি দেখা গেল, যখন দেশের সবচেয়ে বড় বেসামরিক পুরস্কার ‘ভারতরতœ’ তাদের দেয়া হয়েছে, যারা দেশে শুধু বিষময় পরিবেশ সৃষ্টি করেনি, বরং সাম্প্রদায়িকতার বিদ্বেষকে এ দেশের স্বতন্ত্র নীতি বানিয়ে দিয়েছে। এবারের ভারতরতœ পুরস্কার যেন মুসলমানদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা।
সবাই জানেন, ভারতরতœ হিন্দুস্থানের সবচেয়ে বড় বেসামরিক পুরস্কার। এখন পর্যন্ত এটা তাদেরই দেয়া হয়েছে, যারা দেশের জন্য বড় ধরনের কোনো অবদান রেখেছেন। কিন্তু বিজেপি সরকারে এ পুরস্কারের অর্থ বদলে গেছে। এখন এ পুরস্কার এমন লোকদেরও দেয়া হচ্ছে, যারা শাসকদলের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহযোগী হয়েছেন। এ কারণে সম্প্রতি যাদের এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে অধিকাংশেরই জাতীয় অবদান নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। কেননা এ পুরস্কার বিতরণের সময় শুধু রাজনৈতিক ফায়দাকে মাথায় রাখা হয়েছে। এ বছর ভারতরতœ পুরস্কারে ভূষিত ব্যক্তিদের মাঝে কর্পুরি ঠাকুর, লাল কৃষ্ণ আদভানি, এম এস স্বামীনাথন, পি ভি নরসিমা রাও এবং চরণ সিংয়ের নাম রয়েছে। নরসিমা রাও কংগ্রেস পার্টির দ্বিতীয় নেতা, যিনি এ পুরস্কারে ভূষিত হলেন।

এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সিনিয়র কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখার্জিকে ভারতরতœ প্রদান করা হয়েছে। তিনি ভারতরতœ অর্জনের আগে নাগপুর গিয়ে আরএসএস-এর সদর দফতরে হাজির হয়েছিলেন। যার দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, তিনি কংগ্রেসে থেকে আরএসএস-এর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে গেছেন। একেবারে হুবহু নরসিমা রাও এমনটাই করেছিলেন। এ কারণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওকে মৃত্যুর পর এ পুরস্কারে ভূষিত করা হলো। নরসিমা রাওয়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে, তিনি তার শাসনামলে বাবরি মসজিদ শহীদ করান। বর্তমান সরকার তাকে তার বিনিময়স্বরূপ মরণোত্তর পুরস্কার প্রদান করেছে। একই রকমভাবে বাবরি মসজিদের শাহাদতের পথ সুগমকারী লালকৃষ্ণ আদভানিকেও পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। অথচ তাকে বহু দিন ধরে হিমাগারে রাখা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ তাকে ভারতরতœ দিয়ে নতুন জীবন প্রদান করা হলো।
যদি আপনি লালকৃষ্ণ আদভানির জাতীয় অবদানের প্রতি নজর বুলান, তা হলে বেশ নৈরাশ্যজনক দৃশ্য ফুটে উঠবে। জাতীয় পর্যায়ে তার এমন কোনো অর্জনের রেকর্ড নেই, যার ভিত্তিতে তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসমারিক পুরস্কার প্রদান করা যায়। সবাই জানেন, তিনি সোমনাথ থেকে অযোধ্যা পর্যন্ত বের করা রথযাত্রার সময় দেশে অস্বাভাবিক সাম্প্রাদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করেন এবং দেশের দু’টি বড় সম্প্রদায়কে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। আদভানির রথযাত্রার সময় দেশে ভয় ও ত্রাসের যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা পুরোপুরি শব্দে বর্ণনা করা যাবে না। এ কারণেই অন্যতম হিন্দু সাংবাদিক রঘুবর সোরেন তাকে ভারতরতœ প্রদানের পর অযোধ্যা থেকে তার প্রতিবেদনে লিখেছেন, ‘লালকৃষ্ণ আদভানিকে প্রদত্ত ভারতরতœ মূলত রামমন্দির, রামনগরী ও কোটি কোটি রামভক্তের পুরস্কার। এটা বলতে গিয়ে তিন দশক আগের সেই সময়ের কথা মনে পড়ে, যখন মন্দির আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল এবং লালকৃষ্ণ আদভানিকে সেই আন্দোলনের নায়ক মনে করা হতো।’ ওই সাংবাদিক আরো লিখেছেন, ‘সবচেয়ে বেশি চূড়ান্ত পর্যায়ের ভূমিকায় তাকে সে সময় দেখা গেছে, যখন রামজন্মভূমির মুক্তির জন্য সোমনাথ থেকে রথযাত্রা নিয়ে তিনি অযোধ্যার দিকে রওনা হন। দিনটা ছিল ১৯৯০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। অথচ মন্দির আন্দোলন এর আগে থেকেই জনআন্দোলনরূপে হয়ে আসছিল। কিন্তু আদভানির রথযাত্রা সেই আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছার জন্য সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।’

হিন্দি দৈনিক জাগরণের প্রতিবেদকের এই চুম্বকাংশ উদ্ধৃত করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আপনারা যেন আদভানির মূল অবদানটা অনুমান করতে পারেন। অনুরূপভাবে পি ভি নরসিমা রাওকে ভারতরতœ প্রদানের নেপথ্যে তার সেই নিন্দনীয় ভূমিকা রয়েছে, যা তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পথ সুগম করে দিতে পালন করেন। সবাই জানেন, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর কেন্দ্র কল্যাণ সিং সরকারকে বরখাস্ত করে সেখানে প্রেসিডেন্ট শাসন জারি করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেখানে বাবরি মসজিদের স্থানে অস্থায়ী মন্দির বানাতে ছাড় দেয়া হয়। যদি নরসিমা রাওয়ের নিয়ত স্বচ্ছ হতো, তাহলে তিনি এমনটা হতে দিতেন না। কেননা যা কিছু ধ্বংস করা হয়েছিল, সেটা মসজিদ ছিল। আর তার অবশিষ্টাংশের ওপর রামমন্দিরের কাঠামো নির্মাণ করানো সরাসরি অন্যায়। নরসিমা রাওয়ের অপর বড় কীর্তি হচ্ছে জালিম দখলদার ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক কায়েম করা। তারই শাসনামলে ভারত-ইসরাইল বন্ধুত্বের বন্ধন গড়ে ওঠে, যা বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় এজেন্ডা প্রমাণিত হয়। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ইসরাইলের সাথে ভারতের যে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে, তা কারো কাছে গোপন নেই।
এখন আসুন চৌধুরী চরণ সিংয়ের ওপর একটু দৃষ্টিপাত করি, যিনি কৃষক নেতা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বাস্তবে তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে, তিনি দেশে রাজনৈতিক দল বদলের রেকর্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার উত্তরাধিকারীরাও ওই নীতির ওপরই দাঁড়িয়ে আছেন। চৌধুরী চরণ সিংয়ের পর তার পুত্র অজিত সিং তার পথ অনুসরণ করেছেন। আর এখন তার পৌত্র জৈন্ত চৌধুরীও তার দাদার পদরেখার ওপর পথ চলছেন। চৌধুরী চরণ সিংকে ভারতরতœ প্রদানের পর জৈন্ত চৌধুরী সমাজবাদী পার্টি থেকে তার ঐক্য ভেঙে দিয়ে বিজেপির সাথে হাত মিলিয়েছেন। তিনি তার দাদাকে ভারতরতœ প্রদানকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘এখন কোন মুখে বাধা দেবো?’ চৌধুরী চরণ সিং পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের জাট কৃষক নেতা ছিলেন। ইউপির রাজনীতিতে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে উচ্চ জাতের আধিপত্য ছিল। রাজনৈতিক সঙ্কল্পে ভরপুর চৌধুরী ওই আধিপত্যকে সর্বাবস্থায় ধ্বংস করতে চাচ্ছিলেন। তিনি দলবদলের রাজনৈতিক যুগের নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেন। এটা এমন এক সময় ছিল, যখন জনপ্রতিনিধিগণ ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য সরকারি ভিত মজবুত করার কাজ করতেন। এ কৃতিত্বের বদৌলতে চরণ সিং ১৯৬৭ এবং ১৯৭০ সালে কিছু সময়ের জন্য উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সফলতা অর্জন করেন।

১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পর ইন্দিরা গান্ধী তাকেও কারাগারে প্রেরণ করেন। ১৯৭৭ সালে যখন ইন্দিরাবিরোধী জোয়ারের সময় জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসে, তখন চরণ সিং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং এর পরে উপ-প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু তিনি তাতেও তৃপ্ত হননি। তার দৃষ্টি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারের প্রতি নিবদ্ধ ছিল। ১৯৭৯ সালে আবার দল বদল করে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার হাতিয়ে নিতে সফল হন। এটা নিয়মবহির্ভূত রাজনীতির চূড়ান্তরূপ ছিল। জনগণ ইন্দিরা গান্ধীর বিরোধিতার নামে জনতা পার্টিকে বেছে নেয়। কিন্তু চরণ সিং এ বাস্তবতাকে শিকেয় তুলে রেখে সেই ইন্দিরা গান্ধীর সহায়তায় প্রধানমন্ত্রী হওয়াকে মেনে নেন। কিন্তু এ চেয়ারেও তিনি খুব বেশি দিন টিকে থাকতে পারেননি। কেননা ইন্দিরা গান্ধী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তার সমর্থন তুলে নেন। এ বাস্তবতার আলোকে চরণ সিংয়ের সবচেয়ে বড় অবদান এটাই বলা যেতে পারে যে, কোনো নীতি বা দর্শন ছাড়াই রাজনীতি করো। যেখানেই সুযোগ পাও সেখানেই দল বদল করে মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার হাতিয়ে নাও। যদি এ ধরনের লোকই ভারতরতেœর প্রাপ্য হয়, তাহলে এ ধরনের পুরস্কারকে আমরা দূর থেকে সালাম জানাই।
মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক মুম্বাই উর্দু নিউজ ১৮ ফেব্রুয়ারি,
২০২৪ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : ভারতের সাংবাদিক ও কলামিস্ট