বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কোনো নেতাকর্মীকে বিশেষ সুবিধা না দিতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে দলমত নির্বিশেষে সবার জন্য আইন সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।  কেউ অপরাধে জড়িত হলে তার রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে আইনের আওতায় আনতে হবে। ’

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাতে কুষ্টিয়া সার্কিট হাউসের মিলনায়তনে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।  কুষ্টিয়া জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে তিনি গতকাল কুষ্টিয়ায় প্রথম মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। 

সভায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপির কোনো নেতাকর্মী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বাধা সৃষ্টি করলে, পুলিশের কাছে অনৈতিক তদবির করলে কিংবা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে তাদেরও আইনের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।  এ ক্ষেত্রে কাউকে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া যাবে না।’ 

একইসাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার জন্য বিএনপি নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। 

সভায় কুষ্টিয়ার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, উন্নয়ন কার্যক্রম, বিদ্যুৎ, কৃষি, সার, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, মডেল মসজিদ এবং আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজার নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।  প্রতিমন্ত্রী জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য শোনেন এবং জেলার উন্নয়ন ও জনসেবার ক্ষেত্রে সরকারি দফতরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। 

আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে উদযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও প্রশাসনকে নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী।  পূজা মণ্ডপগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন এবং আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। 

কোনো অবস্থাতেই জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে দেয়া যাবে না বলেও জানান তিনি। 

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ ও সাশ্রয়ের জন্য সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। পর্যায়ক্রমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিসের ছাদে সোলার প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে।’

একইসাথে মসজিদসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার কথা বলেন তিনি। 

মডেল মসজিদের বিদ্যুৎ বিল মওকুফের প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু মডেল মসজিদের জন্য বিদ্যুৎ ফ্রি করার সুযোগ নেই। কারণ অন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকেও একই ধরনের দাবি আসতে পারে।  তাই বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় সবার জন্য একটি সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত নীতি অনুসরণ করতে হবে। ’

সরকারি কাজে অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা গাফিলতি কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না বলে কর্মকর্তাদের সতর্ক করেন প্রতিমন্ত্রী। 

তিনি বলেন, ‘সরকারের গৃহীত কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়নে কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে।  কোনো কর্মকর্তার গাফিলতি বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ 

কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সার পাওয়া এবং সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।  কুষ্টিয়ার উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত প্রস্তাবনা তৈরির নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী। 

তিনি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে দেখার এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দেন। 

জেলার ডেঙ্গু প্রতিরোধের ব্যবস্থা সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।  ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে সেই সাথে কুকুর এবং সাপের ভ্যাকসিন সহজলভ্য করতে হবে।’

শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানোর পাশাপাশি খেলাধুলার চর্চা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘শিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাথরুম ও ওয়াশরুমের পরিচ্ছন্নতা এবং এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।’ 

সভায় জেলা শিক্ষা অফিসার মো: আবু তৈয়ব ও মো: ইউনুস আলী কুষ্টিয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাধুলা এবং জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অর্জনের তথ্য তুলে ধরেন।  এ সময় প্রতিমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করে জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাধুলার সুযোগ আরো বাড়াতে জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী। 

স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলেন তিনি। সভায় ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের অগ্রগতির বিষয়েও জানতে চান প্রতিমন্ত্রী। 

জেলা সমাজসেবা অধিদফতরের উপ-পরিচালক জানান, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য গণনাকারী নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে।  তাদের প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর ট্যাব সরবরাহ করা হলে কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।  কৃষি কার্ড বিতরণের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান। 

কুষ্টিয়ায় তামাক চাষে অতিরিক্ত সার ব্যবহারের বিষয়টি সভায় তুলে ধরেন জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান জানান, জেলায় তামাক চাষে অতিরিক্ত প্রায় ২৬ হাজার টন সার ব্যবহার হয়, যা জেলার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তামাক চাষিদের তালিকা পাওয়া গেছে এবং তাদের সার দেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ নজরদারি রাখা হবে। 

জেলায় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বিষয়ে বিআরবি ও ব্যাটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি। 

কুষ্টিয়ার সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ও পুলিশের দায়িত্ব পালনে সুবিধার জন্য দু’টি স্পিডবোট দেয়ার দাবি জানান কুষ্টিয়া-১ আসনের এমপি রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা।  এর আগে মন্ত্রী সন্ধ্যায় জেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের সাথে স্থানীয় দিশা টাওয়ারে মত বিনিময় করেন। 

তিনি সরকারের সকল উন্নয়ন কাজে বিএনপির নেতাকর্মীদের সহযোগিতার আহ্বান জানান। তিনি দীর্ঘ সময় নেতাকর্মীদের বক্তব্য শোনেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে জবাব দেন।  দিশা টাওয়ারে বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে মত বিনিময় সভা চলাকালীন ছাত্রদলের দু’টি গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। 

জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসানের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া-১ আসনের এমপি রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা, সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি ফরিদা পারভিন, ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমি, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন, সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির সরকার, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি, সিভিল সার্জন ডা: কামাল হোসেন, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আব্দুল লতিফ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: মিজানুর রহমানসহ জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।