হাবিবুর রহমান চৌধুরী কুমিল্লা
সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় আবারো আলোচনায় এসেছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণ, বিভিন্ন কিশোর গ্রুপের কর্মকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং এসব গ্রুপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পর দিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনায় আরো কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সাল থেকে কুমিল্লা মহানগর ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন কিশোর গ্রুপের তৎপরতা দৃশ্যমান হতে শুরু করে। সময়ের সাথে এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র বহন, হত্যাচেষ্টা ও হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
মহানগরীর টমছমব্রিজ, সালাহউদ্দিন রোড, ঠাকুরপাড়া, বিসিক এলাকা, ধর্মপুর, রেইসকোর্স, কাঠের পুল, হাউজিং এস্টেট, দক্ষিণ চর্থা, মুরাদপুর, কাপ্তানবাজার, অশোকতলা, পার্ক রোড, মোগলটুলি, নবাববাড়ি রোড, ইপিজেড রোড, মেডিক্যাল কলেজ রোড, শাসনগাছা, কাটাবিল, নুরপুর, কোটবাড়ি, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, জাদুঘর রোড, সালমানপুর ও সানন্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।মহানগরীর বাইরে চৌদ্দগ্রাম, বুড়িচং, দেবিদ্বার, মুরাদনগর ও লাকসাম উপজেলাতেও কিশোরদের বিভিন্ন গ্রুপের তৎপরতা ও অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়।
স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সময়ে ঈগল গ্রুপ, রতন গ্রুপ, আর স্কোয়াড, কেবিজি, কেএনএফ, র্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিবিক, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ, বস, রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক, আরজিএস, সিএমসি, কিং স্কোয়াড ও ক্রাইম সেটআপসহ বিভিন্ন নামে কিশোর গ্রুপের তৎপরতার কথা আলোচনায় এসেছে।
অপ্রতিম হত্যায় জড়িত দু’জন ‘কেবিজি’র সদস্য
কুমিল্লায় ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত গ্রেফতার চারজনের মধ্যে দু’জন ‘কেবিজি’ নামে একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বলে জানিয়েছে পুলিশ। কেবিজির পূর্ণ নাম ‘কোটবাড়ি বাইকার গ্রুপ’।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম হত্যার মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিন এই গ্রুপের সদস্য। অপ্রতিম হত্যায় গ্রেফতার হওয়া ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের সাথেও তুহিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কয়েক বছরে কিশোর গ্যাং-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ১৪ হত্যাকাণ্ড
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা বিভিন্ন ঘটনায় গত কয়েক বছরে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ২০১৬ সাল থেকে চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অন্তত ১৪টি হত্যাকাণ্ডে ঘটেছে।
তবে এসব ঘটনার সব ক’টির সাথে কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা আদালত বা তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে কি না- তা পৃথকভাবে যাচাইয়ের বিষয়। এর মধ্যে ২০২২ সালের ১৯ আগস্ট কুমিল্লা নগর উদ্যানের সামনে দুই কিশোর গ্রুপের বিরোধের জেরে মো: শাহাদাত হোসেন (১৫) নামে এক কিশোরকে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ ওঠে। একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর নগরীর দক্ষিণ চর্থার বড়পুকুর পাড় এলাকায় থার্টি ফার্স্ট নাইটের একটি অনুষ্ঠান থেকে ডেকে নিয়ে ফয়সাল ইসলাম হৃদয় (১৮) নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে।
নানা অপরাধের অভিযোগ
বিভিন্ন সময়ে এসব কিশোর গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, মারামারি, অস্ত্র বহন, হত্যাচেষ্টা, হত্যা, নারীকে উত্ত্যক্ত করা এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া দলবদ্ধভাবে মোটরসাইকেল নিয়ে চলাচল, শোডাউন এবং বিভিন্ন এলাকায় সঙ্ঘবদ্ধভাবে ঘোরাফেরার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর পুরনো এসব ঘটনার পাশাপাশি কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনের কারণ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। পরিবারে নজরদারির ঘাটতি, অপরাধপ্রবণ বন্ধুদের সাথে মেলামেশা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক ব্যবহার, মাদকসহ বিভিন্ন বিষয়কে কিশোর অপরাধের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা করা হয়েছে। কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো: মোসলেহ উদ্দিন বলেন, অপ্রতিম হত্যায় জড়িত দু’জনই কিশোর। কিশোর হওয়ার কারণে তাদের বিচার থেকে রেহাই পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। ‘তারা কিলার। আইন সংশোধন করে হলেও তাদের বিচার হওয়া উচিত।’ তিনি আরো বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে আলাদা পুলিশ বিভাগ গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
এক রাতে ৬২৪ কিশোর আটক : কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে এক রাতে ৬২৪ জনকে আটক করার পর ৪৫১ জনকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। বাকি ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ থাকায় আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় এ অভিযান চালানো হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ওসি মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম বলেন, ‘কেবিজি, কেএনএফসহ যেসব গ্রুপের কথা আমরা শুনছি বা তথ্য পাচ্ছি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’



