এ এস এম জসিম পাথরঘাটা (বরগুনা) 
এক দিন বা দুই দিন নয়, বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুৎ নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বরগুনার উপকূলীয় উপজেলা পাথরঘাটার প্রায় আড়াই লাখ মানুষ। আকাশে হালকা মেঘ জমলেই কিংবা সামান্য বাতাস বইলেই বিদ্যুৎ উধাও হওয়া যেন এই এলাকার নিয়মিত ঘটনা। 
সম্প্রতি এক দিনেই টানা ২০ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কাটাতে হয়েছে পুরো উপজেলাবাসীকে। গত সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মেরেকেটে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টাও বিদ্যুৎ মেলেনি। এমনকি অভিযোগ নম্বরে ফোন দিলে কেউ তা সহজে রিসিভও করেন না। দীর্ঘ সময় পর বিদ্যুতের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছকবাঁধা বার্তা দিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়- কাজ চলছে, ‘৩৩ কেভি (কিলোভোল্ট) সঞ্চালন লাইনে ত্রুটি’। 
পল্লী বিদ্যুৎ প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্র জানায়, পাথরঘাটায় বিদ্যুৎ আসে প্রায় ৬৬ কিলোমিটার দূরের পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া গ্রিড উপকেন্দ্র থেকে। বিস্তৃত এই দীর্ঘ সঞ্চালন লাইনটি বন-জঙ্গল, জলাশয় ও খোলা মাঠের ওপর দিয়ে পাথরঘাটায় এসেছে। ফলে ৬৬ কিলোমিটারের এই বিশাল লাইনের যেকোনো এক প্রান্তে সামান্য গাছপালার ডালপালা স্পর্শ করলে কিংবা কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলেই স্তব্ধ হয়ে পড়ে পুরো পাথরঘাটা। ৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ লাইনের ঠিক কোথায় ত্রুটি ঘটেছে, তা খুঁজে বের করতেই পার হয়ে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো বা পুরো এক দিন। ফলে পাথরঘাটা উপজেলার পল্লী বিদ্যুতের ৬০ হাজার ২০০ গ্রাহককে বিদ্যুৎহীন হয়ে অন্ধকারে থাকতে হয়। 
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বিদ্যুৎসঙ্কটের কারণে চরম বিপর্যয়ে পড়েছে পাথরঘাটার সার্বিক জনজীবন। ফ্রিজে রাখা পচনশীল খাবার নষ্ট হচ্ছে, পাশাপাশি ব্যাঘাত ঘটছে বাসাবাড়ির সুপেয় পানি সরবরাহে। চরম গরম ও মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে শিশু ও বৃদ্ধরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। একই সাথে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, বরফকল ও ক্ষুদ্র শিল্পকারখানাগুলোর স্বাভাবিক উৎপাদন বন্ধের উপক্রম হয়েছে। 
পাথরঘাটার অন্যতম মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি সামুদ্রিক মৎস্য শিল্প এই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসঙ্কটে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের অন্যতম প্রধান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে (বিএফডিসি) বরফের তীব্র সঙ্কট তৈরি হওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ট্রলার মালিক ও স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীরা। পাথরঘাটাবাসীর দাবি, কেবল ভাণ্ডারিয়া-নির্ভর ৩৩ কেভি লাইনের ওপর ভরসা না করে দ্রুত নিজস্ব সাব-স্টেশন স্থাপন, বিকল্প উৎসবিন্দু থেকে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ এবং ৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ঝুঁকিপূর্ণ সঞ্চালন লাইনটি সংস্কার করা হোক। 
পৌরসভার বাসিন্দা কামাল হোসেন, শহিদুল ইসলাম ও জামাল হোসেন বলেন, সামান্য ঝড়বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। এত দিন ধরে এই ৩৩ কেভির দোহাই দিয়ে আমাদের অন্ধকারে রাখা হচ্ছে, স্থায়ী সমাধান করা হচ্ছে না। শিক্ষার্থী শারমীন ও কাওছার বলেন, সামনে পরীক্ষা থাকলেও রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়তে হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে রাতে ঘুমানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বরফকল মালিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পাথরঘাটায় প্রতিদিন শত শত ট্রলার সাগরে যায় মাছ ধরতে, যার জন্য প্রচুর বরফ প্রয়োজন হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বরফ কলগুলো বন্ধ রাখতে হয়। এতে সাগরে আহরিত মাছ পচে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে পড়ে এবং ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। 
পল্লী বিদ্যুতের পাথরঘাটা সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম) আবুহক সরদার জানান, দীর্ঘ লাইনে ত্রুটির স্থান চিহ্নিত করাও অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়ভাবে একটি নতুন সাব-স্টেশন ও বিকল্প সঞ্চালন লাইন না হওয়া পর্যন্ত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।