মো: ইফতেখার হোসেন তুহিন হাতিয়া (নোয়াখালী)
সুন্দরবনের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন নিঝুমদ্বীপ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এ দ্বীপে ক্রমবর্ধমান জনবসতির বিপরীতে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের জন্য আজো গড়ে ওঠেনি কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। সাগর-নদীবেষ্টিত এ জনপদের বাসিন্দাদের চিকিৎসার জন্য পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ দুর্গম পথ। এ দীর্ঘ পথে যাতায়াতে স্থানীয়দের, বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও প্রসূতিদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। চিকিৎসার জন্য উপজেলা সদরে যাওয়ার পথে নৌযান ও সড়কপথে মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটে।
নিঝুমদ্বীপ থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার ভাঙাচোরা সড়ক ও জলপথ পাড়ি দিতে হয়। সাধারণ চিকিৎসা বা দুর্ঘটনায় গুরুতর রোগীদের জেলা সদরে নিতে হয় পাড়ি দিতে হয় প্রায় ১১০ কিলোমিটার পথ। দ্বীপের মৎস্যজীবী, কৃষক ও দরিদ্র মানুষের অনেকের পক্ষেই এ ব্যয়বহুল ও দুর্ভোগের যাত্রা বহন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে প্রসবকালীন জটিলতা কিংবা জরুরি চিকিৎসার অভাবে অনেক রোগী পথেই মারা যায়।
নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রটি একটি সাইক্লোন শেল্টারে পরিচালিত হলেও সেখানে কোনো মেডিক্যাল অফিসার নেই। নেই পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা ও উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার। বর্তমানে ইউএনএফপিএর সহযোগিতায় একজন মিডওয়াইফ দিয়ে কোনো রকমে সেবার কাজ পরিচালিত চলছে। প্রয়োজনীয় অক্সিজেন, গ্লাভস ও অন্যান্য উপকরণেরও সঙ্কট সব সময় লেগেই থাকে। সেখানে মূলত স্বাভাবিক প্রসব ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায় না।
সম্প্রতি এ কেন্দ্রে চিকিৎসা না পেয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয় রোকসানা নামে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে। দীর্ঘ ও দুর্গম পথ পাড়ি দেয়ার সময় তার অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে জেলা হাসপাতালে নেয়ার পথে নদীতে ট্রলারেই তার মৃত্যু হয়। স্থানীয়দের দাবি, রোকসানার মতো আরো অনেক নারী চিকিৎসার অভাবে পথেই প্রাণ হারান।
নোয়াখালী জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক এ কে এম আমিনুল ইসলাম বলেন, নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে জনবল অনুমোদিত নেই। এ জনবল দেয়ার এখতিয়ারও তার নেই। কেন্দ্রটির জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এখন স্থানীয় মানুষের অন্যতম প্রধান দাবি।
দ্বীপে তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেখানে সেবার মান নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। চিকিৎসক ও ওষুধের সঙ্কট, জরাজীর্ণ ভবন এবং যোগাযোগ সমস্যার কারণে নিয়মিত সেবা পাওয়া যায় না। স্থানীয়দের অভিযোগ, সভা-সেমিনারের কারণ দেখিয়ে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের অনেকে নিয়মিত ক্লিনিকে থাকেন না। ফলে নারীসহ সাধারণ রোগীদের স্থানীয় ফার্মেসি ও কবিরাজের ওপর নির্ভর করতে হয়।
নিঝুমদ্বীপে একটি হাসপাতাল স্থাপনের দাবিতে স্থানীয়রা বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন ও কর্মসূচি পালন করেছেন। সাবেক ইউপি প্রশাসনিক সদস্য তাজুল ইসলাম বলেন, উপজেলা ও জেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্বের কারণে দরিদ্র ও অসহায় মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। অন্তত ৩০ শয্যার একটি হাসপাতাল এখন সময়ের দাবি।
স্থানীয় নামার বাজারের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, মৎস্যজীবীসহ দ্বীপের সাধারণ মানুষ সরকারি চিকিৎসাসেবা থেকে প্রায় বঞ্চিত। গুরুতর রোগী নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়ার পথে চোখের সামনে মৃত্যুর ঘটনা দেখতে হয়। দ্বীপে হাসপাতাল হলে এ দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হবে। ২০২৪ সালে জেলার সাবেক সিভিল সার্জন ডা. মাসুম ইফতেখার নিঝুমদ্বীপে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছিলেন। স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও দ্বীপটি পরিদর্শন করেন। তবে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
নোয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেন বলেন, নিঝুমদ্বীপবাসী যাতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পান, সে বিষয়ে তারা আন্তরিক। দ্বীপবাসীর স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে করণীয় সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
৪০ হাজার নিঝুমদ্বীপবাসীর নেই হাসপাতাল



