ময়মনসিংহের ভালুকায় অর্ধ শতাধিক ডায়িং কারখানা কর্তৃপক্ষ পরিবেশ আইনের তোয়াক্কা না করে পানি শোধন যন্ত্র (ইটিপি) বন্ধ রেখেই উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সরাসরি কারখানার বর্জ্য এসে পড়ায় উপজেলার একমাত্র খিরু নদীসহ বিভিন্ন খালবিলের পানি দূষিত হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ভালুকা পৌর এলাকার গ্লোরি ও শেফার্ড ডায়িংসহ উপজেলার কাঠালী, মামারিশপুর, ধামশুর, হবিরবাড়ি, জামিরদিয়া মাস্টারবাড়ি, কাশর ও ভরাডোবা এলাকায় এসব ডায়িং কারখানা রয়েছে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ৯০ দশকের আগে বর্ষাকালে খিরু নদীতে বড় পালতোলা নৌকা ও লঞ্চ চলাচল করত। ব্যবসায়ীদের মালামাল আনা-নেয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল এ নৌপথ এবং নৌকাই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা। কালের আবর্তে দখল-দূষণে নদীটি অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। এমনকি ডায়িং ফ্যাক্টরির বিষাক্ত বর্জ্যরে কারণে খিরু নদীর পানি কালো হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
কয়েক বছর আগে পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড খারোয়ালী গ্রামে খিরু নদীরপাড়ে স্থাপিত গ্লোরি ডায়িং কারখানা ও ১৭ বছর ধরে খিরু সেতুর দক্ষিণপাড়ে প্রতিষ্ঠিত শেফার্ড ডায়িং কারখানা পরিবেশ অধিদফতরের আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে ইটিপি বন্ধ রেখেই তাদের উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এ গ্লোরি ও শেফার্ড কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যরে খিরু নদীসহ আশপাশের খালবিলের পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। পানি দূষণের কারণে এসব নদী-খালে মাছ মিলছে না। ইতোমধ্যে বহু পশু পাখি মারা গেছে। এমনকি এ নদীর পানি ব্যবহার করে নদীপাড়ের বাসিন্দা পেটের পীড়া ও চর্ম রোগসহ বিভিন্ন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিবাদ করলে মামলাসহ বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তেমনি উপজেলার কাঠালীগ্রামে অবস্থিত ইকরাম সোয়েটার লিমিটেডের রাসেল ডায়িং মিল ও শাহান কালার, হাজিরবাজার এলাকায় অবস্থিত আরটিএ ডায়িং, সাবাব ফেব্রিক্স, এফএম ডায়িং, মাস্টারবাড়ি এলাকায় অবস্থিত বাদশা কারখানা, এমএল ডায়িং, আরিফ ডায়িং, বেলী ইয়াং ডায়িং, স্কয়ার ডায়িং, ভরাডোবা এলাকায় অবস্থিত এক্সপিরিয়েন্সসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় অর্ধশতাধিক ডায়িং কারখানা রয়েছে। আর এসব কারখানার মালিকরা সার্বক্ষণিক ইটিপি বন্ধ রেখেই তাদের উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলার কাঠালীগ্রামের খিরু নদীপাড়ের বাসিন্দা আলী হোসেন জানান, এ নদীতের এক সময় সারা বছরই পানি থাকত। নদীপাড়ের বাসিন্দারা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
উপজেলার জামিরাপাড়া ও পারুল দিয়াগ্রামের একাধিক কৃষক জানান, আগে এ নদীর পানি ছিল স্বচ্ছ টলমলে। কিন্তু বর্তমানে মিল কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে সারা বছরই পানি নীল রঙ ধারণ করে থাকে। এ পানি আবাদি জমিতে সেচ দিলে ধানের গুছা পচে নষ্ট হয়ে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডায়িং কারখার এক কর্মচারী বলেন, ইটিপি সার্বক্ষণিক চালু রাখলে প্রতিদিন ৩০-৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। তাই স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা ও পরিবেশ অধিদফতরের অসাধু লোকদের ম্যানেজ করেই ইটিপি বন্ধ রেখে উৎপাদন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
পৌর এলাকায় অবস্থিত শেফার্ড ডায়িং কারখানা জেনারেল ম্যানেজার মোখলেছুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, যথাযথ নিয়ম মেনেই তাদের কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। কারখানার পানি নীল রঙের হলেও তা ইটিপির মাধ্যমে শোধন হয়েই বের হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান মনি জানান, ভালুকা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত ডায়িং কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে মৎস্য সম্পদ ধ্বংসসহ এ এলাকার ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এ ব্যাপারে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বেশ কয়েকবার অবহিত করেছি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলী নুর খান বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত ডায়িং কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে ইতোমধ্যে তাদের ইটিপি, প্লান পাশ ও পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র আছে কি না এসব বিষয়ে তথ্য চেয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। তথ্য পাওয়ার পর পরিদর্শনে গিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।



