পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বিচ্ছিন্ন মাঝেরচর দ্বীপের বাসিন্দাদের টিকে থাকতে হচ্ছে ঝড়-বৃষ্টিসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে নিত্য লড়াই করে।
উপজেলার বেতমোর রাজপাড়া ইউনিয়নের ভূখণ্ড থেকে পৃথক মাঝেরচর দ্বীপ। স্থানীয়দের ধারণা সুন্দরবনের অনতিদূরে বলেশ্বর নদ মধ্যে চর জেগেছে বলেই মানুষের মুখে মাঝেরচর দ্বীপ নামে খ্যাতি পেয়েছে। ৪০ এর দশকে জেগে ওঠা এ দ্বীপের পরিমান প্রায় ৮৪০ একর, সংরক্ষিত বন এলাকা ৫৪৩ একর। সরকার ১৯৬৬ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে জনপ্রতি ভূমিহীনকে দেড় থেকে তিন একর জমি ৯৯ বছরের জন্য মোট ২৮৮ একর জমি বন্দোবস্ত দেয় এবং ১৯৭৬ সালে ৫৪৩ একর জমি বনবিভাগে হস্তান্তর করে। এক সময় নদী পাড়ের লোকজন গরু মহিষ ছেড়ে দিত বছরান্তে। কিন্তু ১৯৬৬ সাল থেকে সরকারি বন্দোবস্তে ভূমিহীন মানুষ বসতি শুরু করলে কিছু বন উজাড় হয়। বন বিভাগ বাগেরহাটের অধীনে পিরোজপুর রেঞ্জ এখানে সরকারি বনায়নের পাশাপাশি রয়েছে বনবিভাগের অফিস।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের চিরচেনা বলেশ^র নদের মাঝেরচর দ্বীপ। এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন শতশত মানুষ এই মাঝেরচর দ্বীপে আসে। এখানে ম্যানগ্রোভ, নারকেল, রেইনট্রি, ছৈলা ও কেওড়া গাছে ভরপুর আর শুকর, পাতিশৃগাল, সাপসহ নানা জাতের পাখির দেখা মেলে। চারদিকে জলরাশির নৃত্যে নয়নাভিরাম মাঝেরচর দ্বীপ পর্যটক আকর্ষণের মায়া ঢেলে দিয়েছে। সকাল সন্ধ্যার আলোখেলা আর নোনাজলের জলকেলী , রূপালী ইলিশ শিকার বনের সৈন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। সামান্য দূরে দেখা মেলে বিশে^র সর্বোচ্চ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের। সম্ভাবনাময় দ্বিপটি পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্রে পরিচিতি পেলে পর্যটক আকর্ষণ যেমন বেড়ে যেত, তেমনি সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পেত।
নদীজলের পলিমাটির সৃষ্টি দ্বীপে পরিবেশ পেলে নানা রকম কৃষি উৎপাদনের বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। সরোজমিন পরিদর্শনে পাওয়া গেছে নানা তথ্য। অল্প অসম্পূর্ন বেড়িবাঁধ দ্বীপের জীবন বিষিয়ে তুলেছে। প্রায় ২৫০ পরিবারের এক হাজার জন দ্বীপবাসীর আতঙ্ক আর নিরাপত্তাহীনতা যেন নিত্যসঙ্গী। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতে নতুন করে শিকার হয় বিপর্যয়ের। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে সহায় সম্বলহীন জেলে গোষ্ঠী মানবেতর জীবন নির্বাহ করছে। বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা বঞ্চিত হচ্ছে মাঝেরচরবাসীর মানুষ। সামান্য প্লাবনে ডুবে যায় বসতবাড়ি, কৃষিজমিসহ সবকিছু। নদীতে মাছ শিকারের সুযোগে জেলেদের সন্তান শিশু শ্রমিকের পথ বেছে নেয়। ভূখণ্ড থেকে আলাদা বেতমোরের সাংরাইল থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার নদী পার হয়ে দ্বীপে যেতে হয়।
মাঝেরচর দ্বীপের বাসিন্দা আ: রাজ্জাক জানান, ৩০ বছর এখানে আছি বর্তমানে খেয়ার ট্রলার চালাই ১৫ দিন আমি আর বাকি ১৫ দিন আরেক জন। আমার কৃষিজমি আছে টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় বন্যার পানিতে ফসল নষ্ট হয়ে যায়।
কথা হয় লাকী বেগম, মোজাম্মেল মীর, মোহাম্মদ মাছুমের সাথে। তারা জানান, খেয়াঘাটের যাত্রী ছাউনি, কমিউনিটি ক্লিনিক, পাকা রাস্তা ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হলে তাদের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে মাঝেরচর দ্বীপ। বেতমোর রাজপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন জানান, এখানে ৪৫০ জন ভোটার। ভূমিহীনদের বাইরে এখানে অনেক জমি প্রভাবশালীরা ভাগিয়ে নিয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল কাইয়ূম জানান, মাঝেরচর দ্বীপ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।