ময়মনসিংহের ভালুকায় আইনের তোয়াক্কা না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা, সরকারি পাকা রাস্তার পাশে এবং ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে ১৪টি ইটভাটা। এসব ইটভাটায় সামাজিক বনায়নের গাছ কেটে এনে পুড়ানো হচ্ছে। পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র পাওয়ার মতো না হলেও রহস্যজনক কারণে বেশ কয়েটিতে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। এসব ইটভাটার বিরুদ্ধে প্রশাসনের তেমন তৎপরতা নেই। ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে ফসলি জমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ (১ জুলাই/২০১৪ থেকে কার্যকর) এ বলা হয়েছে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে আধুনিক প্রযুক্তির অর্থাৎ জিগজ্যাগ ক্লিন, হাইব্রিড হফম্যান ক্লিন, বার্টিক্যাল শফট ক্লিন, টানেল ক্লিন বা অনুরূপ উন্নততর প্রযুক্তির পরিবেশবান্ধব ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। তা ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক কিলোমিটারের মধ্যে, আবাসিক ও জনবসতিপূর্ণ কিংবা সংরক্ষিত এলাকার বনভূমিতে ইটভাটা করা যাবে না। আরো উল্লেখ আছে যে, সরকারি বনাঞ্চলের সীমারেখা থেকে দুই কিলোমিটার দূরত্বে করতে হবে।
এসব ইটভাটা তদারকি করার জন্য জেলা প্রশাসকের নির্দেশে স্থানীয় বনবিভাগ উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান থাকলেও রহস্যজনক কারণে ভালুকার অধিকাংশ ইটভাটার মালিক এসব আইনের তোয়াক্কা করে না। তারা সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করেই ফসলি জমির ‘টপসয়েল’ ব্যবহার করে অবৈধ দেদারসে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে ইটভাটা আবাদি জমির উর্বরতা হ্রাস ও ফলজ ও বনজ গাছপালা হুমকির মুখে পড়েছে।
উপজেলার ধলিয়া পলাশতলী গ্রামে সরেজমিন দেখা গেছে, পলাশতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তরপাশ ঘেঁষে আনিছুর রহমানের রিফাত ব্রিক্স, সোহাগ খানের আলসাফা ও জালাল উদ্দিনের সেবা নামক লাইসেন্সবিহীন তিনটি ইটভাটা রয়েছে। রিফাত ইটভাটার চারপাশে মজুদ করে রাখা হয়েছে কয়েক শ’ মণ লাকড়ি। চিমনি দিয়ে প্রচণ্ড বেগে ধোঁয়া বের হচ্ছে। সেই ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায়।
উপজেলার মেদুয়ারী গ্রামে অবস্থিত জাহিদ ব্রিক্স, বহুলী গ্রামে মিরাজ ব্রিক্স, মেদিলা বাহিরপাথার খোরশেদ আলমের আলম ব্রিক্স, উরাহাটি গ্রামের মধুনী পাথারে ফসলি মাঠে গড়ে ওঠা মনো মিয়ার এমএমআর ব্রিক্স ও সুরুজ তালুকদারের ইটভাটার ভেতরে বিপুল পরিমাণ কাঠ মজুদ অবস্থায় রাখা হয়েছে। এ দিকে উপজেলার শান্তিগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত দীপ্তি একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয়ের পিছনে ও শান্তিগঞ্জ-ধলীয়া পাকা রাস্তা ঘেঁষে ইয়াসিনের এমবিবি ও সুলতান মিয়ার এমআরএল ব্রিক্স গড়ে উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ভাটা মালিক জানান, ভালুকার কোন ভাটারই লাইসেন্স নবায়ন নেই। কিভাবে চলে প্রশ্ন করা হলে তারা জানান, প্রতিটি ইটভাটা থেকে ভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারিকে ৫০-৬০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়। তারাই জেলা প্রশাসক ও বনবিভাগ সেক্টর ম্যানেজ করে থাকেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ভালুকা আঞ্চলিক শাখার সদস্য সচিব কামরুল হাসান পাঠান কামাল জানান, উপজেলার বেশিরভাগ ইটভাটারই লাইসেন্স নেই। এমনকি তারা নীতিমালারও ধার ধারেন না। রহস্যজনক কারণে পরিবেশ অধিদফতরও নির্বিকার। স্থানীয়ভাবে ইউএনও এবং বনবিভাগ তদারকি করলে হয়তো কিছুটা অনিয়ম দূর হতো।
ইটভাটা তদারকি কমিটির সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলী নূর খান জানান, তার দফতরে ১৪টি ইটভাটার তালিকা রযেছে। ইতোমধ্যে পরিবেশ অধিদফতরের সাথে কথা হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বরের পর অভিযানে গিয়ে যেসব ভাটায় অনিয়ম পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।



