২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়া ছিটমহলটি নিজ ভুখন্ডে সংযুক্ত হয়। ছিটমহলটি বিনিময়ের পর দীর্ঘ ৬৮ বছরের নাগরিকত্বহীন অবরুদ্ধ জীবনের গ্লানি আর বঞ্চনার কালিমা মুছে যায়। একটা সময় এসব ছিটমহলের বাসিন্দারা নিজের পরিচয়টুকু দিতে পারতেন না, বঞ্চিত ছিলেন সব ধরনের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে। দেশের উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্ত হওয়ায় একেবারে পাল্টে গেছে বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর জীবনযাত্রা।
ছিটমহলটি বিনিময়ের নয় বছর পর সরেজমিনে দেখা হয় এনছার আলী নামে ৯৫ বছরের এক বৃদ্ধার সাথে তিনি জানান, ৬৮ বছর আমাদের কোনো পরিচয় ছিল না। জেলহাজতের চেয়েও খারাপ অবস্থায় ছিলাম। ছিটমহলের অধিবাসীদর জন্য ছিল না কোনো নির্দিষ্ট দেশ ও পরিচয়। ফলে আমরা মানবেতর জীবনযাপন করেছি। আগে কুপি জ্বালিয়ে ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করতো কিন্তু এখন সকল বঞ্চনার কালিমা মুছে গেছে।
সাবেক এই ছিটমহলে সরকারের সব ধরনের সেবা সহজেই মানুষের মধ্যে পৌঁছে দিতে তিন ভাগে ভাগ করে ফুলবাড়ী সদর, ভাঙ্গামোড় ও কাশিপুর ইউনিয়নের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে যুক্ত হয়েছে স্কুল, কলেজ, মাদরাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধা ও স্যানিটারি টয়লেট প্রদান, কমিউনিটি ক্লিনিক, ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ভূমি রেকর্ড, পাকা সড়ক, মসজিদ ও মন্দির নির্মাণ এবং কৃষিসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ায় খুশি এখানকার অধিবাসীরা।
শিক্ষার্থীরা সহজেই এলাকায় পড়াশোনা করতে পারছে, শিশুরা নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে। পাশাপাশি চিকিৎসা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নও হয়েছে ছিটমহলের বাসিন্দাদের। আমার মতো বয়স্করা পাচ্ছে বয়স্ক ভাতা, বিধবা মহিলারা পাচ্ছে বিধবা ভাতা।
দাসিয়ারছড়া সরকারি দাখিল মাদরাসার সুপার সাহানুর আলম জানান, শুরুতেই তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করলেও পরবর্তিতে একটি দাখিল মাদরাসা জাতীয়করণসহ তিনটি নিম্নমধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভূক্ত করেছে সরকার। ছিটমহল বিনিময়ের পর থেকেই তাদের জীবন মানের উন্নতি হয়েছে। শিক্ষা, চাকরিসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধাগুলো পাচ্ছেন তারা। স্কুল, কলেজ, মাদরাসা প্রতিষ্ঠার কারণে শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে। এখন আর আগের মতো ঠিকানাসহ সকল পরিচয় গোপন করে লেখাপড়া করতে হয় না। নয় বছরে সরকারের এই উন্নয়ন পদক্ষেপে অনেক খুশি ছিটমহলবাসী।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতরের উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা আজমর আবসার জানান, ‘দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগের কারণে ধীরে ধীরে এখানকার মানুষ ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্থ হয়ে পড়ছে। সাবেক ছিটমহলের হাবিবপুর গ্রামের অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া শামিম রানা মোবাইলে ফেসবুক ও ইউটিউব দেখে ৫৬ ইঞ্চি বিমান তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে। সে প্রযুক্তির ধারণাকে কাজে লাগিয়ে বিমান তৈরি করেছে। আমি আইসিটি কর্মকর্তা হিসেবে তাকে সকল ধরনের সহযোগীতা করবো।’
সাবেক ছিটমহল বিনিময় কমিটির সভাপতি আলতাব হোসেন জানান, ‘ডিজিটাল কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সেন্টারটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় যুবকদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিয়মিত চলছে। ছিটমহলবাসী চাকরির আবেদন থেকে শুরু করে অনলাইনভিত্তিক সকল কাজ ঘরে বসেই করতে পারছে।
তিনি বলেন, দাসিয়ারছড়ায় ইতোমধ্যে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন মালিকানা এক হাজার ৬৪৩ একর ও সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত ৯ একর জমির প্রাক জরিপ শেষে খতিয়ান হস্তাস্তর করা হয়েছে। ব্যক্তি মালিকানা ভূমি খাজনা খারিজ করে ক্রয়-বিক্রয় অব্যাহত রয়েছে।
ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ জানান, দাসিয়ারছড়ার মানুষ সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। প্রায় ২৭ কিলোমিটার পাকা সড়ক, প্রয়োজনীয় সংখ্যক কাচা সড়কসহ কালভার্ট ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। শতভাগ সেচের আওতায় আনা হয়েছে কৃষি জমি। হতদরিদ্র পরিবারের জন্য ভিজিএফ, টিসিবি পণ্যসহ শতভাগ বাড়িতে নিশ্চিত করা হয়েছে সুপেয় পানি ও সেনিটেশন ব্যবস্থা। উন্নয়নে জীবন চিত্রের পরিবর্তন ঘটেছে এখানকার মানুষের।



