কেউ বলছেন আমার বাবাকে ফিরিয়ে দাও, কেউ বলছেন স্বামীকে একটিবার দেখতে চাই। মা তার সন্তানের ছবি বুকে নিয়ে অঝোরে কাঁদছেন। এমন দৃশ্য দেখা গেছে গতকাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত সমাবেশে উপস্থিত হয়ে এভাবেই বিগত ১৫ বছরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলের গুম-খুনের শিকার পরিবারের ভুক্তভোগীরা তাদের দুঃখের কথা জানান।
২০১৬ সালে গুমের শিকার পারভেজ হোসেনের একমাত্র মেয়ে হৃদি। তখন তার বয়স মাত্র ছিল ৩ বছর। বাবার মুখটাও স্পষ্ট মনে নেই তার। স্বৈরাচার তাকে বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছে। ১১ বছরের এ শিশু কান্নাঝরা কণ্ঠে তার পিতৃস্নেœহ বঞ্চিত হওয়ার আবেগ প্রকাশ পায়। হৃদি জানায়, ২০১৬ সালের পর থেকেই আমরা বাবার মুখ দেখিনি। জানি না আমার বাবা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন। স্কুলে সবার বাবা নিতে আসে, শুধু আমার বাবা আসে না। যারা আমার বাবার গুমের সাথে জড়িত তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। সেইসঙ্গে আমার বাবা মারা গেলেও তার লাশ ফেরত দেয়া হোক। হৃদির অভিযোগ, আমার বাবার কী দোষ ছিল যে তাকে গুম করা হলো। আজও ফিরে এলো না আমার বাবা। আমরাইবা কী দোষ করেছিলাম, যার কারণে এখনো বাবাকে ফেরত পাইনি। আমি আমার বাবাকে ফেরত চাই। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে হৃদি। তার কান্নায় উপস্থিত সকলের চোখ ছলছল করছিল। হৃদি বলে, ‘ফিরিয়ে দাও আমার বাবাকে। আমার বাবাকে ফেরত চাই। আমি শুধু বাবার হাতটা ধরতে চাই।’

এ সময় জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে দুই চোখ হারানো ২১ বছরের যুবক ওমর ফারুক বলেন, জুলাই আন্দোলনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে গাজীপুরের সখীপুরের নিজবাড়িতে ছিলাম। ৪ আগস্ট আন্দোলন প্রবল হলে ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম। এ সময় সামান্য দূর থেকে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা মিলে গুলি ছুড়তে থাকে। এর পর আমাকে অচেতন অবস্থায় একটি বেসরকারি হাসপাতাল ভর্তি করা হয়। আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত শুধু গুলি আর গুলি। দুই চোখ অন্ধ হয়ে গেছে, আমি কিছুই দেখতে পাই না। তিনি আরো বলেন, দেশের প্রয়োজনে আন্দোলনে ছিলাম। এ জুলাই আন্দোলনসহ ১৫ বছরে যারা গুম-খুন আর গণহত্যার সাথে জড়িত ছিলেন তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। সেইসঙ্গে শেখ হাসিনাকে দেশে এনে বিচারের আওতায় আনার দাবিও করছি। তাদের বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কেউই শান্তিতে ঘুমাতে পারছি না।
হাসিনার ফাঁসি চেয়ে আন্দোলনে আহত খোকন চন্দ্র বর্মন বলেন, ফ্যাসিবাদ নির্মূলের জন্য আমরা লড়েছি। আজ পাশের দেশ ভারত থেকে পতিত ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী বিপ্লবকে ব্যর্থ করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র আঁটছে। ভারত সরকারকে বলতে চাই আপনারা ফ্যসিবাদকে জায়গা দেয়া বন্ধ করুন। হাসিনা সরকারের অপরাধের দায়ে ফাঁসি দিতে হবে। আগামীতে ফ্যাসিবাদ বিরোধীর প্রশ্নে সবার এক থাকতে হবে।
হৃদি, ওমর ফারুক, খোকন চন্দ্র বর্মণের মতো শত শত গুম খুনের শিকার ও জুলাই আন্দোলনে আহতরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উপস্থিত হয়ে নিজেদের কথা জানান গণমাধ্যমকে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে উপস্থিতদের ভুক্তভোগীদের একটাই দাবি, শেখ হাসিনাকে দেশে এনে আদালতের মাধ্যমে বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করা। পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িতদেরও বিচারের দাবি জানান তারা।