নারায়ণগঞ্জে শামীম ওসমানের রাজ্যে আগমন ঘটতে যাচ্ছে জাকির খানের। ৩৩টি মামলার মধ্যে ৩১টিতে খালাস পেলেন জাকির খান। বাকি দু’টিতে জামিনে রয়েছেন। যেকোনো সময় কারামুক্ত হতে যাচ্ছেন জাকির খান এমন খবর জানালেন তার অনুগতরা। ফলে আলোচিত সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের পলায়নের পর তার রাজ্যে নতুন করে আসছেন তার আতঙ্ক জাকির খান।
আইনজীবী রাজীব মণ্ডল জানিয়েছেন, জাকির খানের বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা ছিল। ৩০টি মামলায় ইতোমধ্যে তিনি খালাস পেয়েছেন। মঙ্গলবার আরো একটি হত্যা মামলায় তিনি খালাস পেলেন। দু’টি চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মামলা এখনো তার বিরুদ্ধে চলমান; কিন্তু ওই দুই মামলাতেও তিনি জামিনে রয়েছেন। মামলার কাগজপত্র কারাগারে পৌঁছানোর পর তার মুক্তির আর কোনো বাধা থাকবে না। নারায়ণগঞ্জে আলোচিত ব্যবসায়ী নেতা সাব্বির আলম খন্দকার হত্যা মামলায় জাকির খানসহ সব আসামিকে খালাস দেন আদালত।

জানা গেছে, একসময় নারায়ণগঞ্জের ত্রাস শামীম ওসমানের আতঙ্ক ছিলেন জেলা যুবদলের সভাপতি মমিন উল্লাহ ডেভিড। ২০০৪ সালের ২৪ নভেম্বর র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন ডেভিড। এর পর থেকে অনেকটা স্বস্তিতে থাকেন শামীম ওসমান; কিন্তু তার মনে আরেক আতঙ্ক ছিল জাকির খান। তাকে রুখতে এক এক করে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় ৩৩টি মামলা। ইন্টারপোলেও তার নাম ওঠে। একসময় জাকির খান নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে পলাতক জীবন যাপন শুরু করেন। প্রায় দুই দশক পর ২০২২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা থেকে গ্রেফতার হন জাকির খান।
জানা গেছে, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জাকির খান এলেই কেঁপে ওঠে নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়া। তাকে একসময় গডফাদার খ্যাত নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শামীম ওসমানও ভয় পেতেন। প্রকাশ্য সভা-সমাবেশেই তিনি বলতেন দেশের মধ্যে কাউকে ভয় পাই না। গালি দিয়ে বলতেন আমি একমাত্র জাকির খানকেই ভয় পাই।

নারায়ণগঞ্জের দৌলত খানের ছেলে জেলা ছাত্রদলের একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নেতা জাকির খান ১৯৮৯ সালে জাপার সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম নাসিম ওসমানের হাত ধরে জাতীয় পার্টির ছাত্রসমাজে যোগ দিয়ে নারায়ণগঞ্জের ছাত্ররাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর জাকির খানের সাথে নাসিম ওসমানের বিরোধ বাধে। পরে জাকির খান বিএনপি নেতা কামালউদ্দিন মৃধার নেতৃত্বে ১৯৯৪ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯৫ সালে দেওভোগ এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী দয়াল মাসুদকে শহরের সোনার বাংলা মার্কেটের পেছনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় শহরে পরিচিতি পান জাকির খান।
১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের শেষদিকে জাকির খান শহরের খাজা সুপার মার্কেটে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পেয়ে জেলে যান; কিন্তু প্রেসিডেন্টের সাধারণ ক্ষমায় তিনি মুক্ত হন। সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরীর নাতি হিসেবে শহরে পরিচিত হয়ে ওঠেন জাকির খান। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সাত মাসের মাথায় কাশীপুর বাংলাবাজার এলাকায় এক ঠিকাদারের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় দ্বিতীয় দফায় জাকির খানের পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয় এবং তিনি জেলে যান। আওয়ামী লীগের চার বছর জাকির খান থাকেন জেলে।

১৯৯৯ সালে স্বল্প সময়ের জন্য জেল থেকে বের হয়ে জাকির খান জেলা ছাত্রদলের সভাপতির পদ পেয়ে যান। আওয়ামী লীগের শাসনামলের শেষদিকে ২০০০ সালে শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জ থেকে টানবাজার ও নিমতলী পতিতালয় উচ্ছেদ করলে জাকির খানের পরিবারের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায় বলে সে সময় খবর ছড়ায়। বিশাল গাড়িবহর নিয়ে অস্ত্রের মহড়া শুরু করলে ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আবার কারাবন্দী হন তিনি। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও প্রায় পাঁচ মাস তিনি জেলে থাকেন। ২০০৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সাব্বির আলম খন্দকার খুন হওয়ার পর এ মামলার আসামি হওয়ায় তিনি নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে থাইল্যান্ডের সুকুমবিকে কয়েক কোটি টাকা দিয়ে আটতলাবিশিষ্ট একটি থ্রি-স্টার হোটেল কিনে ব্যবসা শুরু করেন। থাইল্যান্ডে হোটেল ব্যবসার মন্দাভাব থাকায় দুই দশক পর আবার দেশে ফিরে এসে আত্মগোপনে থাকেন। পরে ২০২২ সালে গ্রেফতার হন।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম রবি বলেন, জাকির খানকে ষড়যন্ত্র করে রাজনৈতিক মামলায় জেলে আটক রাখা হয়েছে। দেশের সঙ্কটময় সময়ে জাকির খানকে নারায়ণগঞ্জবাসীর বিশেষ প্রয়োজন। তাই এই সরকারের কাছে জাকির খানের মুক্তির দাবি জানাচ্ছি।