রাজশাহীতে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এক সংলাপে দেশ ও গণতন্ত্র পুনর্গঠনে সরকার ব্যবস্থাপনায় সব বিভাগ থেকে প্রতিনিধির অংশগ্রহণ নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়েছে। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংস্কারের অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি বিভাগে ধারাবাহিক সংলাপ শুরু করেছে। এ পর্যায়ে ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটি গতকাল শনিবার রাজশাহী জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা এ দাবি জানিয়েছেন।
সংলাপে অতিথি আলোচক ছিলেন- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যব্যবস্থা বিভাগের অধ্যাপক ও প্রোভিসি (প্রশাসন) ড. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন এবং সুজন রাজশাহী জেলা সভাপতি আহমদ সফি উদ্দিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান। এ ছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থী, আইনজীবী, রাজনীতিক, শিল্প উদ্যোক্তা, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমকর্মী, মানবাধিকার কর্মী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী সংগঠক, সেচ্ছাসেবীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের পেশাজীবীরা মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে সংস্কার বিষয়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত জানান।
রাবি প্রোভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি আমাদের দেশের নেতৃত্বে এসেছেন, এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্যের। আমাদের উচিত এ সময়টিকে কাজে লাগানো। দেশ সংস্কারের বিভিন্ন ধাপ পূরণ করে আমাদের জাতীয় নির্বাচনের দিকে যাওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে ধৈর্য সহকারে বর্তমান সরকারকে সময় দেয়া দরকার।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, সাবেক মেয়র ও এমপি মিজানুর রহমান মিনু বলেন, দেশ পুনর্গঠনে বিএনপির ৩১ দফা রয়েছে। ইনশাআল্লাহ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এলে বিএনপি এই দফা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে নতুন এক বাংলাদেশ উপহার দেবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, হাজার মানুষের রক্তের বিনিময়ে আমরা ফ্যাসিস্ট সরকারকে বিদায় করেছি, এ দেশে আর ফ্যাসিজম কায়েম করতে দেয়া হবে না।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরী নায়েবে আমির আবু মোহাম্মদ সেলিম বলেন, যেকোনো ধরনের সংস্কারের আলোচনায় সরকারের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সরকারের আন্তরিক সম্পর্ক থাকা উচিত, এতে দেশে প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো ত্বরান্বিত করবে।
জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরী সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মণ্ডল বলেন, রাজনৈতিক দলেও সংস্কার ও পুনর্গঠনের প্রয়োজন রয়েছে। দলে শৃঙ্খলা নিয়ে আসতে হবে।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষও নানা ধরনের প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কথাশিল্পী ডা: নাজিব ওয়াদুদ বলন, প্রত্যেকটি সংগঠনকেই নিজের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী গণতান্ত্রিক উপায়ে সংগঠন চালাতে হবে এবং মানুষের চিন্তার জগতে পরিবর্তন আনতে হবে। তা না হলে কোনো পরিবর্তনই টেকসই হবে না।
নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন বাংলাদেশের সভাপতি অ্যাডভোকেট এনামুল হক বলেন, ভবিষ্যতের টেকসই উন্নয়নে একই সাথে সংবিধান পুনঃলিখনের জন্য জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি গণপরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালনা করতে হবে এবং সংবিধান নতুন করে প্রণয়ন করতে হবে।
রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও দৈনিক নয়া দিগন্তের রাজশাহী ব্যুরো চিফ মুহা: আব্দুল আউয়াল বলেন, রাজনৈতিক কারণে সাংবাদিকরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। আমাদের এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও সাংবাদিকতার স্বার্থে সবাই যেন এক থাকে। তিনি আরো যোগ করেন যে, সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত করা হয়।
বৈষম্যবিরোধী আ›দোলনের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক তাসিন খান বলেন, বর্তমান সরকার শুধু বৈষম্যবিরোধীদের নয়, এটি বর্তমান বাংলাদেশে ফ্যাসিস্টবিরোধী সব রাজনৈতিক দলেরও। তাদের উচিত এ সরকারকে সর্বাত্মক সহায়তার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক দেশ সংস্কার এগিয়ে নিয়ে দ্রুত নির্বাচন দেয়া।
সুলতানা সাগরিকা জানান, দেশের স্বাস্থ্য খাতে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজমান, বিশেষভাবে হিজড়া কমিউনিটির মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ বিষয়ে সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত।
সেন্টার ফর গভর্র্ন্যান্স স্টাডিজ বাংলাদেশভিত্তিক একটি থিংকট্যাংক, যা সুশাসন, দুর্নীতি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের বিষয়ে গবেষণা ও মিডিয়া স্টাডি পরিচালনা করে। দ্রুত পরিবর্তনশীল জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো শিক্ষাগত সম্প্রদায়, সরকার, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ এবং উন্নয়ন অংশীদারদের মধ্যে শাসনের মান উন্নত করা, বাংলাদেশের নিরাপত্তার চাহিদা পূরণ করা, দারিদ্র্য নিরসনের জন্য উপলব্ধ সম্পদের দক্ষ ও বিচক্ষণ ব্যবহার করার শর্ত তৈরি করা, মানব সম্পদ উন্নয়ন, বর্ধিত গণতন্ত্রীকরণ, অংশগ্রহণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক শৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা।