তিন যুগে বন্ধ হয়েছে প্রায় দেড় হাজার সিনেমা হল। এবার থাকছে না ঐহিত্যবাহী মধুমিতা হল। চলচ্চিত্রে অব্যাহত মন্দায় সিনেমা হলটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মালিক ইফতেখার নওশাদ। আসছে রোজার ঈদে সিনেমা চালিয়ে হলটি বন্ধ করে দেয়া হবে। সেটি ভেঙে নির্মিত হবে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন। তবে সেখানে মাল্টিপ্লেক্স থাকবে।
গণমাধ্যমকে ইফতেখার নওশাদ বলেন, ‘সিনেমা নাই, কী করবো হল চালু রেখে? যে সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে সেগুলো তো সিনেপ্লেক্সের, আমাদের হলে চালানোর মতো না। বছরে এত লস গুনে গুনে তো টিকে থাকা যায় না। তাই আসছে রোজার ঈদের সিনেমা চালানোর পর চিরতরেই মধুমিতা বন্ধ করে দেবো।’ আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হলেও এই শহরের সিনেমাপ্রেমীদের জন্য একটা ইমোশন, নস্টালজিয়া, কিন্তু পারছি না। বাধ্য হয়েই বন্ধের সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। তবে নতুন ভবনে মাল্টিপ্লেক্স করার ইচ্ছে রয়েছে। দেখা যাক কতটা কী করতে পারি।
১৯৫৬ সালে এ দেশে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ তৈরি ও মুক্তির পর দ্রুত সিনেমা হলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। নব্বই দশকের শেষ দিক পর্যন্ত এ দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪৭০টি। কিন্তু দর্শকের অভাবে তিন যুগে বন্ধ হয়েছে ১৪১০টি সিনেমা হল। বর্তমানে দেশে সিনেমা হল আছে ৬০টির মতো। সর্বশেষ বিয়োগের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে মধুমিতা।
এর আগে ২০১৯ সালের ১২ অক্টোবর বন্ধ হয়ে যায় রাজধানীর কাকরাইলে অবস্থিত বিখ্যাত রাজমণি সিনেমা হল। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হাজার আসনের সিনেমা হল অভিসারও পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ছবির অভাবে দর্শক না আসায় বছরের পর বছর লোকসান গুনে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকার স্বনামধন্য আজাদ সিনেমা হলটি করোনার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সব যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ও আসন নষ্ট হওয়ায় বন্ধ হওয়ার পথে। দিনাজপুরের ফুলবাড়িয়ায় অবস্থিত হাজার আসনের বিখ্যাত সিনেমা হল ‘উর্বশী’র অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। এক সময় ঢাকায় সিনেমা হলের ঐতিহ্য ও ইতিহাস ছিল সমৃদ্ধ।
চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির দেয়া তথ্য মতে, দেশের প্রায় ২৯টি জেলা এখন সিনেমা হলশূন্য। ইতোমধ্যে বন্ধ হওয়া হলগুলোর মধ্যে রয়েছে- ঢাকার গুলিস্তান, নাজ, বিউটি, স্টার, লায়ন, রূপমহল, শাবিস্তান, পূর্ণিমা, রাজমণি, মল্লিকা, পূরবী, পদ্মা, সুরমা, ডায়না, যমুনা, অভিসার, জোনাকি, আগমন, চিত্রামহল, অতিথি, মানসী, ডায়না, মুন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঢাকায় মোট সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল ৪৪টি। এখন বড় মাপের সিনেমা হলের মধ্যে চালু আছে মধুমিতা, গীত, সংগীত প্রভৃতি। ডেমরার মতিমহল ও রানীমহলও নেই। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে ২০টি সিনেমা হল ছিল। এর মধ্যে আলমাস, দিনার, খুরশীদ মহল, নূপুর, জলসা, উজালা, রঙ্গম, উপহার, অলংকার, রিদম, পূরবী, সানাই, বনানী কমপ্লেক্সসহ প্রায় সবই বন্ধ হয়ে গেছে। চালু আছে শুধু ‘সিনেমা প্যালেস’।
নারায়ণগঞ্জে বন্ধ হয়েছে আশা, মাশার, হংস, ডায়মন্ড। এখানে ছয়টি সিনেমা হলের মধ্যে এখন চালু আছে গুলশান ও নিউ মেট্রো। যশোরে বন্ধ হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নিরালা। নারায়ণগঞ্জের আদমজীতে মুনলাইট বন্ধ হয়েছে।
গাজীপুরে সাতটি সিনেমা হলের মধ্যে বন্ধ হয়েছে চন্দনা, আনারকলি, কোপ্রি, বর্ষণ। খোলা আছে বর্ষা, ঝুমুর ও উল্কা। মুন্সীগঞ্জে বন্ধ হয়েছে ছবিঘর ও দর্পণা। মানিকগঞ্জের তিনটি সিনেমা হলের মধ্যে বন্ধ হয়েছে তৃপ্তি ও টাউন হল, খোলা আছে নবীন। ময়মনসিংহ জেলায় ৪১টি সিনেমা হল ছিল। এখন খোলা আছে পাঁচটির মতো। এখানকার ঐতিহ্যবাহী অজন্তা, অলকা, সেনা অডিটোরিয়াম বন্ধ হয়েছে। রয়েছে পূরবী ও ছায়াবাণী। টাঙ্গাইল জেলায় সিনেমা হল ছিল ৪৭টি। আছে পাঁচটির মতো। এখানকার বিখ্যাত রওশন টকিজ বন্ধ হয়ে গেছে।
দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে প্রায় ২৯টি জেলা এখন সিনেমা হলশূন্য। এসব জেলার মধ্যে রয়েছে নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঝালকাঠি, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, নড়াইল, মৌলভীবাজার, রায়পুর, মাদারীপুর, সিরাজগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার। চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও যশোরকে চলচ্চিত্র দর্শকের স্বর্গ বলে গণ্য করা হতো।
গত দুই দশকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বন্ধ হয়ে গেছে ২০টি প্রেক্ষাগৃহ। একসময় যশোরের পরিচিতি ছিল সিনেমা হলের শহর হিসেবে। ছিল ২১টি সিনেমা হল। এখন যশোরে মাত্র ৬টি সিনেমা হল চালু রয়েছে। সিরাজগঞ্জ জেলার ৩১ হলের মধ্যে এখন টিকে আছে মাত্র সাতটি। খুলনা মহানগরীতে সিনেমা হল ছিল ১১টি। এখন আছে মাত্র চারটি। ডুমুরিয়া উপজেলার একমাত্র সিনেমা হলটি বন্ধ রয়েছে। নেত্রকোনা জেলা শহরের একমাত্র সিনেমা হল হীরামন ও নাটোরের সায়াবাণী বন্ধ হয়ে গেছে। সিলেটের সাতটির মধ্যে একটি এবং রংপুরের পাঁচটির মধ্যে একটি টিকে আছে। দিনাজপুর, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুরে বর্তমানে মাত্র একটি করে হল চালু রয়েছে।
ঝিনাইদহে ১৭টির মধ্যে ৩টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২০টির মধ্যে ৬টি, বেলকুচিতে ১৭টির মধ্যে দুটি, চুয়াডাঙ্গায় ১৪টির মধ্যে দুটি, নীলফামারীতে ২৪টির মধ্যে একটি, পাবনায় ২৮টির মধ্যে সাতটি, মানিকগঞ্জে ৯টির মধ্যে একটি, লক্ষ্মীপুরে ১০টির মধ্যে একটি, ঠাকুরগাঁওয়ে ১৫টির মধ্যে ছয়টি, রাজবাড়ীতে ২০টির মধ্যে দুটি, রূপগঞ্জে ছয়টির মধ্যে একটি, রংপুরে পাঁচটির মধ্যে একটি, সিলেটে সাতটির মধ্যে একটি সিনেমা হল চালু রয়েছে। গাজীপুরে ছিল ১৪টি সিনেমা হল, এর মধ্যে ১১টিই বন্ধ হয়ে গেছে।