অপেক্ষার পালা শেষ। ভাষার মাস শুরুর প্রথম দিন আজ বিকেলে পর্দা উঠছে একুশে বইমেলার। বিকেল ৩টায় বাংলা একাডেমি আয়োজিত মাসব্যাপী এ মেলার উদ্বোধন করবেন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করবেন বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো: রেজাউল করিম বাদশা এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সচিবের রুটিন দায়িত্ব) মো: মফিদুর রহমান। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪ প্রদান করা হবে।
বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব ড. সরকার আমিন জানান, এবারের মেলায় মানুষের পরিবর্তনের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করেই সাজানো হয়েছে। বেড়েছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, স্টল ও মেলার আয়তন। পুরো মেলা সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকবে। নতুন পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠেয় এ মেলার মূল থিম জুলাই গণ-অভ্যুত্থান : ‘নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ’। অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রথম বইমেলাকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১৯৫২-র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শহীদদের নামে সেই ভাগগুলো। মেলার বিশেষ আকর্ষণ থাকছে জুলাই চত্বর, সেখানে গণ-অভ্যুত্থানের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হবে।
মেলার রঙ হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে লাল, কালো ও সাদা। লাল বিপ্লবের প্রতীক, কালো শোকের এবং সাদা আশার। এবারের বইমেলা স্টল আর প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার মেলার আকার বেড়েছে। মেলায় মোট ৭০৮টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে এক হাজার ৮৪ ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গত বছর প্রতিষ্ঠান ছিল ৬৪২টি এবং ইউনিট ছিল ৯৪৬টি।

তার ভাষ্য, ৫২-র ভাষা আন্দোলন এবং ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থাকলেও বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ঐতিহাসিক মাইলফলক, অর্থাৎ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কোনো চত্বর মেলায় নেই। না থাকার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের কারণে এবার জুলাই চত্বর রাখা হয়েছে। ভাষা শহীদদের নামেও আছে। তবে আগে কখনো বই মেলায় মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চত্বর ছিল না বা করা হয়নি, সেই কারণে এবারো রাখা হয়নি।
এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৯৯টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৬০৯টি প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এবার মোট প্যাভিলিয়নের সংখ্যা ৩৭টি, যার মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৩৬টি। গত বছরও (২০২৪) প্যাভিলিয়ন ৩৭টি ছিল। এবার লিটল ম্যাগাজিন চত্বর করা হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চের কাছের গাছতলায়। সেখানে ১৩০টি লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া শিশুচত্বরে ৭৪টি প্রতিষ্ঠানকে ১২০ ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গত বছর শিশুচত্বরে ৬৮টি প্রতিষ্ঠানকে ১০৯টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। গত বছর ৬০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে বইমেলায়। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৭৫১টি। এবার আরো বেশি বই প্রকাশের আশা করা হচ্ছে। মেলায় এবার মোড়ক উন্মোচন হয়েছে ৬০০টি বইয়ের। গত বছর দর্শনার্থীর সংখ্যা ৬০ লাখের কাছাকাছি ছিল, এবার সেই সংখ্যাও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সচিব জানান, সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে-কোনো সময় কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বইমেলা চলাকালীন শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের জন্য একাডেমি ও প্রকাশক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি শৃঙ্খলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। মেলার নীতিমালা অনুযায়ী, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানবিরোধী, যেকোনো জাতিসত্তাবিরোধী, অশ্লীল, রুচিগর্হিত, শিষ্টাচারবিরোধী, সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন বা জননিরাপত্তার জন্য বা অন্য কোনো কারণে বইমেলার পক্ষে ক্ষতিকর কোনো বই বা পত্রিকা বা দ্রব্য অমর একুশে বইমেলায় বিক্রয়, প্রচার ও প্রদর্শন নিষিদ্ধ। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে একাডেমি।

নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের জন্য নতুন বই উন্মোচন মঞ্চ নামে একটি নির্দিষ্ট স্থানের ব্যবস্থা থাকবে। একটি লেখক বলছি মঞ্চ থাকবে। সেখানে প্রতিদিন নতুন বই সম্পর্কে লেখক-পাঠক-দর্শকের মধ্যে আলোচনা, মতবিনিময়, প্রশ্নোত্তর পর্ব চলবে। আগের বছরে প্রকাশিত বিষয় ও গুণগত মানসম্মত, সর্বাধিকসংখ্যক বই প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার এবং শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার দেয়া হবে।
শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগত মান বিচারে সর্বাধিক বইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার এবং বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে স্টলের নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত প্রতিষ্ঠানকে তিন ক্যাটাগরিতে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার দেয়া হবে।
প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা এবং ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বইমেলা উন্মুক্ত থাকবে। শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বইমেলা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। শুক্র ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মেলার আয়োজনে থাকবে শিশু প্রহর। বিগত বছরগুলোর মেলার মতো এবারো বাংলা একাডেমিসহ অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে।