বরিশালে আবাসন খাতে অন্তত সহস্রাধিক বিনিয়োগকারী বছরের পর বছর ধরে ভবন নির্মাণের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছেন। অনুমোদন না পাওয়ায় তারা ভবন নির্মাণ করতে পারছেন না। বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২০ অনুযায়ী নকশা অনুমোদনের জন্য আবেদন করলেও সেই আবেদন ফিরিয়ে দেয়া হয় সাবেক মেয়র আবুল খায়ের আবদুল্লাহ দায়িত্ব গ্রহণের পর।
সরকারি ব্রজমোহন (বি এম) কলেজ রোডের মধুমিয়ার পুল এলাকার বাসিন্দা রওশন জাহান যৌথ মালিকানায় ১৩তলা ভবন নির্মাণের আবেদন করার পর ফিরিয়ে দেয়া হয়। এর পর ১৯৯৬ সালের বিধিমালা অনুযায়ী ফের আবেদন করেন তিনি। সে অনুযায়ী গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর নকশা অনুমোদন ফি দুই লাখ ৬১ হাজার ৮৬৭ টাকা ব্যাংকে জমা দেন। নকশা সংশোধন করে আবার জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন বিসিসির প্রশাসক। ফলে আবাসন খাতে তাদের প্রায় ১১ কোটি টাকার বিনিয়োগ বন্ধ রয়েছে।
রওশন জাহানের মতো আবাসন খাতে অন্তত সহস্রাধিক বিনিয়োগকারী বছরের পর বছর ধরে নকশা অনুমোদনের অপেক্ষায় বিনিয়োগ করতে পারছেন না। ফলে শুধু নগরীতেই আবাসন খাতের প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ অন্তত দুই বছর ধরে আটকে আছে। যার প্রভাব পড়েছে নির্মাণসামগ্রীতে।
অ্যাসোসিয়েশন অব বিল্ডিং কনসাল্টট্যান্স বরিশালের তথ্যানুযায়ী, একতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের জন্য ৯২৪ জন এবং সপ্তমতলা থেকে ১৪ তলা পর্যন্ত ৭৬ জন বিনিয়োগকারী নকশার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা প্রায় দুই থেকে পাঁচ বছর ধরে নকশা অনুমোদন পাচ্ছেন না। সিটি করপোরেশনের গড়িমসির কারণে এই খাতের প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে আছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
ইঞ্জিনিয়ারিং কনসাল্টিং ফার্মের তথ্যানুযায়ী একতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের গড় ব্যয় প্রায় তিন কোটি টাকা। সে হিসাবে শ্রমিক মজুরিসহ ৯২৪টি ভবনের নির্মাণ ব্যয় গিয়ে দাঁড়াবে এক হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। আর সাততলা থেকে ১৪ তলা পর্যন্ত গড় ব্যয় সাড়ে ছয় কোটি টাকা। সে হিসাবে ৭৬টি বহুতল ভবন তৈরিতে শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে নির্মাণ ব্যয় হবে আনুমানিক ৫০০ কোটি টাকা। প্রকৌশলীরা বলছেন, শ্রমিক বাদে পুরো টাকাটাই বিনিয়োগ হবে নির্মাণসামগ্রী খাতে।
বরিশাল সিমেন্ট ও লৌহজাত দ্রব্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান হিরা বলেন, আমরা মন্দার মধ্যে দিন পার করছি। এই খাতে আমাদের হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ আছে। কিন্তু সে অনুপাতে রিটার্ন নেই। প্ল্যান অনুমোদনের ধীরগতির কারণে নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসায় এত ধস। অ্যাসোসিয়েশন অব বিল্ডিং কনসাল্টট্যান্স সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী আবু ছালেহ বলেন, বহুতল ভবন নির্মাণ ব্যয় প্রতি বর্গমিটার দুই হাজার টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। প্রতি বর্গমিটারে শ্রমমূল্য ২৫ শতাংশ হারে এক হাজার ভবন নির্মাণে শ্রমিকদের মজুরি প্রায় ৬৫৫ কোটি টাকার মতো। জেলা ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মোল্লা বলেন, এই খাতে বিনিয়োগের ২৫ শতাংশ শ্রমিকরা পেতেন। ফলে নির্মাণের সাথে জড়িত সব শ্রেণীই উপকৃত হতো।
বরিশাল ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক নিয়াজ মাহামুদ বেগ বলেন, বহুতল ৫৪টি ভবনের প্ল্যান আটকে আছে দুই বছর ধরে। যদি সঠিক সময়ে বিসিসি বহুতল ভবনগুলোর নকশা অনুমোদন দিত তাহলে আবাসন খাতে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ হতো।
বিসিসির তথ্যানুযায়ী, একতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত গড়ে নকশা ফি ৪০ হাজার, ল্যান্ড সার্ভে প্রতিবেদনের জন্য ১০ হাজার, হোল্ডিং চার হাজার, পানির সংযোগ বাবদ ১১ হাজার এবং গভীর নলকূপের জন্য ১৮ হাজার টাকা নির্ধারিত রয়েছে। ছয়তলা পর্যন্ত প্রতিটি ভবনের জন্য নকশা অনুমোদন পেতে বিনিয়োগকারীকে গড়ে ৮৫ হাজার টাকা করে বিসিসির অনুকূলে ব্যাংকে জমা দেয়া বাধ্যতামূলক। এ খাতে এক হাজার ভবনের নকশা অনুমোদন ফি বাবদ বিসিসির রাজস্ব আয় গিয়ে দাঁড়াত প্রায় ১১ কোটি টাকা।
বিসিসির এক কর্মকর্তা বলেন, এই খাত থেকে প্রতি বছর বিসিসি হোল্ডিং ট্যাক্স থেকে রাজস্ব আয় ছয় কোটি টাকা হতো। পানির বিল বাবদ আরো আট কোটি টাকার রাজস্ব আসত এই খাত থেকে। সব মিলিয়ে বিসিসির রাজস্ব আয়ে প্রতি বছর এই খাত থেকে ১৪ কোটি টাকা যুক্ত হতো। নতুন নকশা অনুমোদন দিলে বিসিসি এ খাত থেকে অন্তত ২৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে পারত।
বরিশাল নাগরিক অধিকার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক ও স্পার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসাইন খান বলেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ১৯৯৬ বাতিল করে নীতিমালা ২০২০ বাস্তবায়ন করার দাবি আমাদের। যেসব এলাকায় কিংবা বাড়িতে পানির সরবরাহ লাইন সংযোগ করা হয়নি, সেসব এলাকার জনগণকে পানির বিল থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। ভবনে বসবাস শুরু করার পূর্ব পর্যন্ত হোল্ডিং ও পানির বিল নেয়া যাবে না।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী বলেন, গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ৫০টি প্ল্যান অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সবগুলোই সর্বোচ্চ ছয়তলা ভবনের অনুমোদন রয়েছে। জমাকৃত প্ল্যানগুলো পর্যায়ক্রমের ছেড়ে দেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, ১৯৯৬ বিধিমালা অনুযায়ী প্ল্যানটা হলে আমাদের সুবিধা হয়। তবে দেখা গেছে বেশির ভাগ আবেদনই ১৯৯৬ সালের ইমারত আইন বিধিমালার মধ্যে নেই। তাই অনুমোদন প্রক্রিয়ায় গতি পাচ্ছে না।