আমি তিস্তা। তিস্তা নদী। আমাকে দিস্তাং, স্যাংচু, রঙ্গ, তৃষ্ণা বলেও জেনেছে অনেকে। কেউ কেউ মনে করে ত্রি ‘সেরাতা’ বা তিন প্রবাহের (করতোয়া, আত্রাই, পুনর্ভবা) জন্যই আমার নাম তিস্তা। ভারতের সিকিম রাজ্যের চুনটাংডে ও লাচুংচুর সঙ্গমে জন্ম আমার। বাংপো, কালিমপং, জলপাইগুড়ি ও মেখলিগঞ্জ পার হয়ে আমি এসেছি বাংলাদেশে। আমি ওপারে নেপাল ও আসামের সীমান্ত দিয়ে হিমালয়কেও ভাগ করেছি। তাই ওখানে আমার নাম তিস্তাং। তারপর নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রে নদে মিলেছি।
তিস্তা নদীর উৎপত্তির কথা উল্লেখ আছে পুরাণ কাহিনীর সঙ্গে। আমার জন্ম, বয়ে চলা, সুখ-দুঃখ-কষ্ট নিয়ে রয়েছে কত গল্পগাথা, মিথ, কবিতা, গান। এক সময় এ নদীকে উপজীব্য করে, কত রকম মাছ পেত জেলেরা। নদীটির বুকে পানসি, গয়লা, টাপুর ভিঙি নিয়ে ভেসে বেড়াত। এখন তো আর তা সম্ভব নয়। তা হবেই বা কেন? ওপারে (ভারতের গজালডোবা নামক স্থানে) নির্মিত তিস্তা বাঁধ পানিপ্রবাহ আটকিয়ে দিয়েছে। তিস্তার বুকটা এখন ধু-ধু মরুভূমি হয়ে থাকে। তাই এখন তিস্তার চর, চর চল্লিশ সাল, চর লক্ষ্মীটারী, বিনবিনার চর, চর সংকরদহ, চর ইচলী, চর বাগডোহরা ইত্যাদির দেখা মেলে।
আর আগে পুনর্ভবা, আত্রাই, করতোয়া, যমুনেশ্বরী, ঘাঘট, সতী স্বর্ণমতী, ভাটেশ্বরী এমন অনেক প্রবাহই ছিল তিস্তার ঔরসজাত। নদী নাকি চিরযৌবনা। কিন্তু সেই ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েছে। এখন তিস্তার বুকচিরে আলু, বাদাম, তামাক, কুমড়া নানা রকম শস্য ফলে। দুইপাশে বিস্তীর্ণ ধু-ধু বালুচর।
বর্ষা এলে বুক ভরে যায় পানিতে। তখন দুই পাশের মানুষ পড়েন বিপাকে। তিস্তা তখন হয়ে যায় সর্বনাশী, সর্বগ্রাসী তিস্তা। আশপাশের মানুষ দুঃখ-দুর্দশায় পড়ে থাকে। দাপুটে তিস্তার যৌবন আজ পড়ন্ত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির গজালডোবায় নির্মিত বাঁধ দিয়ে ভারত শুষ্ক মৌসুমে ১,৫০০ ঘন/মি. সেকেন্ড পানি মহানন্দা নদীতে নিয়ে যায়।
এ দিকে তিস্তা নদীর পানির ন্যায্যহিস্যা ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচিতে দলে দলে যোগ দিতে আসছেন পাঁচ জেলার মানুষ। গতকাল বেলা ২টায় লালমনিরহাটের তিস্তা সড়ক সেতু মঞ্চে উপস্থিত থেকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। মঞ্চে টানা ৪৮ ঘণ্টা অবস্থান করতে মানুষের অতিপ্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থায় রাখা হয়েছে। খাবার, অজু ও নামাজের ব্যবস্থা, গোসল, শৌচাগারসহ অতিপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। ৪৮ ঘণ্টা তিস্তাপাড়ে পালাগান, সারিগান, ভাওয়াই, লালন, লোকসঙ্গীত ও গ্রামীণ খেলাধুলা হা-ডু-ডু, ঘুড়ি উড়ানো, গোল্লাছুট ও দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। আর রাতে তিস্তাপারের মানুষের সুখ-দুঃখের ওপর প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও ভাওয়াইয়া গানের আসর, তিস্তার দুই পারে জ্বলবে মশাল। সব মিলে তিস্তাপাড় সেজে এক বর্ণিল সাজে।
তিস্তা নদীর দুই পারে আশপাশের পাঁচটি জেলার মানুষ এ অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন। এ জন্য নীলফামারী থেকে গাইবান্ধা পর্যন্ত ১১টি স্থানে মঞ্চ ও তাঁবুর ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিটি স্থানে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা। তারা সেখানে অবস্থান কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেবেন। আজ মঙ্গলবার সমাপনী অনুষ্ঠান হবে। সেখানে ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাও কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, গতকাল সোমবার সকাল থেকে রংপুর অঞ্চলের মানুষজন তিস্তাপাড়ে জড়ো হচ্ছেন। তিস্তাপাড়ে কয়েক লাখ মানুষের সমাগম হবে। তিস্তার পানির ন্যায্যহিস্যা ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলো জন আকাক্সক্ষার দাবি। এ কারণে এ অঞ্চলের মানুষ ঘরে বসে নেই। তারা নিজ দায়িত্বে তিস্তাপাড়ে জড়ো হয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন। তার ভাষ্য, আমাদের ৪৮ ঘণ্টার লাগাতার অবস্থান কর্মসূচির পর সরকার আমাদের দাবি না মানলে আরো কর্মসূচির ডাক দেবো।



