'১২টায় অফিস আসি, দুইটোয় টিফিন/ তিনটেয় যদি দেখি সিগন্যাল গ্রিন/ চটিটা গলিয়ে পায়ে, নিপাট নির্দ্বিধায়/ চেয়ারটা কোনোমতে ছাড়ি/ ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে/ চারটেয় চলে আসি বাড়ি/ আমি সরকারি কর্মচারী।.... নচিকেতার এই গানটির মতোই অফিসে আসা-যাওয়া করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত অন্তত ৭৫ ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী। অফিস করার ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা করছেন না। অথচ মাস শেষে সরকারি কোষাগার থেকে নিয়ম মেনে পুরো সম্মানী তুলছেন তারা।
সরেজমিন গত এক মাসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সকালে এক থেকে দেড়ঘন্টা পর অফিসে ঢোকেন, আবার নির্ধারিত কর্মঘন্টা শেষ না হতেই কাজ ফেলে ফের নির্দ্বিধায় বেরিয়ে যাওয়া তাদের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু দেরিতে আসা, আগে বেরিয়ে যাওয়া তা নয় অফিসিয়াল কাজেও তাদের নানা তালবাহানা। কখনও কাজ ফেলে জটলা পাকিয়ে মেতে উঠেন খোশ গল্পে। কখনও বা চা-নাস্তার নাম করে ঘন্টাখানেক লাপাত্তা। আবার কেউ কেউ অফিসে হাজিরা দিয়েই চলে যান সংসারের জন্য বাজার করতে। অফিসিয়াল কাজ করতে এসে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে প্রায়ই ফিরে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের।
অনেক সময় মোবাইলে কল করে ডেকে এনে কাজ করাতে হয়। এছাড়া স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে অফিসে না আসার অভিযোগ অনেক নতুন নয়। মূলত প্রশাসনিক ভবন ও আবাসিক হলগুলোতে কর্মকর্তারা ফাঁকিবাজিতে উস্তাদ। বিভাগে কর্মকর্তারা ফাঁকি দিচ্ছেন এক ঘন্টার টিফিন সময় দুই ঘন্টা থেকে আড়াই ঘন্টা।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফাঁকিবাজিতে দুই দিনের কাজ করতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একসপ্তাহ ধরে ঘুরতে হয়। তবে শিক্ষকদের কাজ ‘একটু গুরুত্ব’ দিয়ে করলেও প্রশাসনিক কাজ সারতে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয় প্রতিনিয়তই। এ বিষয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে দূর্ব্যবহারের শিকার হতে হয়। ভোগান্তির শিকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ- প্রশাসনের নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা ও স্ব স্ব দফতর প্রধানের কাছে জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া না থাকায় নিশ্চিন্তে এমন অফিস ফাঁকিতে বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে তারা।
তবে প্রশাসনের উর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি ফাঁকিবাজি এবং অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে গেলে ফুঁসে উঠে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইউনিয়ন। তখন আওয়ামী লীগ, বিএনপিপন্থীসহ সব দলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এক হয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে মাঠে নামে। উদ্ভুত পরিস্থিতির সমাধন করতে এসব বিষয়ে দৃষ্টি দিতে পারেনি শুধু বর্তমান নয় বিগত কোনো প্রশাসনই।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভাগ, আবাসিহ হল, প্রশাসনিক ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা এবং নিরাপত্তা প্রহরীসহ বিভিন্ন পদে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োজিত আছে। এর মধ্যে কর্মকর্তা ৭৩৪ জন, সহায়ক কর্মচারী ৬৭৮ জন, সাধারণ কর্মচারী ১ হাজার ২১৮ জন।
বর্তমানে অধ্যাপক আব্দুস সোবহান উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অফিস সময় নির্ধারণ করেন। মাঝে দেড়টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত টিফিন। এর আগে অফিস সময় ছিল সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত। তবে গত এক মাস ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’টি প্রশাসনিক ভবন ও ছাত্রদের ১১টি আবাসিক হলে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিন্দাস অফিস ফাঁকি দেওয়ার দৃশ্য। হাতে গোনা কয়েকজন বাদে সবাই এটাকে অভ্যাসে পরিনত করে নিয়ম বানিয়ে নিয়েছেন। প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, ‘ফাঁকি দিয়ে কর্মজীবন পার করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ৭৫ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী।’
সর্বশেষ, গত ৭ থেকে ৯ মে, বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত সরেজমিন দেখা যায়, নতুন প্রশাসনিক ভবনের সংস্থাপন শাখা, অর্থ ও হিসাব দফতর, মার্কসশীট শাখা, সার্টিফিকেট শাখা এবং পুরোনো প্রশাসনিক ভবনের কেন্দ্রীয় ভান্ডার ও প্রকৌশল দফতরসহ বেশকিছু দফতরের কর্মকর্তাদের চেয়ার ফাঁকা পড়ে আছে। কর্মকর্তারা চলে যাওয়ায় সেসব দফতরে কর্মচারীরাও লাপাত্তা। দফতর খোলা কিন্তু লোকবল নেই।
অফিসে কেউ নেই কেনো; তা জিজ্ঞেস করার মতো মানুষও মেলে নি। যেসব দফতরে কর্মকর্তা নেই, কর্মচারী বা পিয়নকে জিজ্ঞেস করলে শুরু করেন নানা তালবাহানা। সংবাদকর্মী পরিচয় দিলে তো কোনো মতেই বলতে রাজি হয় না দফতর প্রধান বা কর্মকর্তারা কোথায় বা কেনো বেরিয়ে গেছেন? জেরার মুখে কখনও বলেন ছুটিতে, আবার কখনও বা জানান অসুস্থতার অজুহাত।
এদিকে, অফিসে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কাজ না করে জমিয়ে আড্ডায় বসেন। জটলা পাকিয়ে পারিবারিক ও সাংসারিক কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির গল্পে মশগুল। তবে সাড়ে ৪টা বাজতেই সব পক্ষই লাপাত্তা। অফিস সময় ৫টা বাজার আধাঘন্টা আগে জরুরী কাজে গেলেও আর মেলে না কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেখা।
অন্যদিকে, আবাসিক হলগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সকালে এক থেকে দেড় ঘন্টা কাজ করার পরই ব্যাক্তিগত কাজে অফিস ছেড়ে যান বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। হলগুলোতে সরেজমিন গিয়েও এর প্রমাণ মিলেছে। শহীদ জিয়াউর রহমান হল, মতিহার হল, নবাব আব্দুল লতিফ হল, শাহ্ মখদুম এবং শহীদ শামসুজ্জোহা হলে অফিস সময়ে গিয়েও বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীর দেখা মেলেনি।
একই দিনগুলোতে সকালে দিকে গিয়ে দেখা যায়, অফিস সময় ৯টা হলেও সাড়ে ৯টা পার হওয়ার পরও কোনো কোনো দফতরের তালা খোলা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক স্ব স্ব দফতর প্রধান ও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তারা শুধু সেদিনই এমন হয়েছে বলে দাবি করেছেন। কারও দাবি, কাজ কম তাই বসে না থেকে ব্যক্তিত কাজে গিয়েছিলেন। তাতে দোষের কিছু করেন নি তিনি। তবে কেউ-ই নাম-পরিচয় প্রকাশ করে মন্তব্য দিতে রাজি হয়নি।
জানতে চাইলে প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক রুবাইয়াত ইয়াসমিন বলেন, আবাসিক হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফাঁকিবাজির বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নয়। তবে হলগুলোতে লোকবল সংকট আছে। সংকটের কারণে কিছু বিষয় আমাদেরও ম্যানেজ করে চলতে হয়। অন্য কারও করার কথা সেটা আরেক দায়িত্বে থাকা কাউকে দিয়ে করানো হয়। প্রাধ্যক্ষ পরিষদের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. আব্দুস সোবহান বলেন, ‘কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস ফাঁকির বিষয়টি সম্পর্কে আমার কানে বেশ কিছু অভিযোগ এসেছিল। পরিকল্পনা আছে, হঠাৎ করে আমরা অভিযান চালাবো। সেটা শুধু একদিন নয়, ধারাবাহিকভাবে মাঝে-মধ্যে এই অভিযান চালানো হবে। অভিযানে কারও বিরুদ্ধে ফাঁকিবাজির প্রমাণ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’



