নওগাঁর মান্দায় ঐতিহাসিক কুশুম্বা শাহী মসজিদের নাম, যশ খ্যাতি এবং কদর রয়েছে দেশ-বিদেশজুড়ে। মধ্যযুগে সুলতানী আমলে গৌড় বাংলায় যেসব অনুপম মডেলের স্থাপনা গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে অন্যতম বর্তমান রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলার (উত্তরবঙ্গের তৎকালীন রাজশাহী জেলার নওগাঁ মহকুমার) নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের পাশে মান্দা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৪কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ-পশ্চিমে কুশুম্বা ইউনিয়ন পরিষদের অনতিদূরে অবস্থিত কুশুম্বা শাহী মসজিদের।
কুশুম্বা শাহী মসজিদের অপরুপ নিমার্ণশৈলী সবার মন কাড়ে। মসজিদের ভেতরে পাথরের তিনটি কারুকার্যময় অপরুপ মেহরাব দেখে সবার চোখ যেন জুড়িয়ে যায়। সামনে উত্তর-দক্ষিণ দিক বরাবর লম্বা বিশাল এক দীঘি রয়েছে। যার আয়তন বর্তমানে বেড়ে প্রায় একশত বিঘা ছাড়িয়ে গেছে। এটিই মসজিদটির সৌন্দর্য অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছ্ েতা বলাই বাহুল্য মাত্র। আর এ দীঘিতে বর্তমানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অনেক মাছ চাষ হচ্ছে। আমাদের প্রচলিত পাঁচ টাকার নোটের উপর যে মসজিদের ছবি দেখতে পাওয়া যায় তা তো এ কুশুম্বা মসজিদেরই।

নির্মাণকাল
কুশুম্বা মসজিদের তিনটি প্রবেশদ্বারের মধ্যেরটির উপর আরবী হরফে বা অক্ষরে নামাঙ্কিত বা লিখিত ৭.৭ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য এবং ৮ ইঞ্চি প্রস্থের যে শিলালিপি দেখা যায়, তাতে মসজিদের নির্মাণ সাল উল্লেখ করা হয়েছে। তার উপর ভিত্তি করে কুশুম্বা মসজিদের নির্মাতা হিসেবে যার নাম উৎর্কীণ করা আছে, তিনি হলেন সোলায়মান খাঁন। তিনি তৎকালীন কুশুম্বা গ্রামের চিলমন মজুমদার নামে একজন হিন্দু জমিদার ছিলেন। তিনি তার জমিদারীর রাজস্ব পরিশোধে ব্যর্থ হলে কারাগারে বন্দি হন। অবশ্য পরে তিনি নিজের ইচ্ছায় স্ব-পরিবারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং সোলায়মান খাঁন নাম ধারণ করে বন্দিদশা থেকে মুক্তি লাভ করেন।
কিছুকাল পরে তিনিই নিজ অর্থ ব্যয়ে কুশুম্বা মসজিদের আংশিক বাকি নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। তবে এ নিয়ে মতভেদ আছে, কুশুম্বা মসজিদে’র এর নির্মাণ কাজ সুলতান আলা-উদ-দীন হোসাইন শাহ এর শাসন আমলে শুরু হয়েছিল। জনাব শামস উদ-দীন আহম্মদ কৃত এবং রাজশাহী’র বরেন্দ্র যাদুঘর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ওঠ” গ্রন্থের ১৫৫ পৃষ্ঠায় লিখিত একটি তথ্য মতে রাজশাহী জেলা পরিষদের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সুরেন্দ্র মোহন চৌধুরী কুশুম্বা মসজিদের পশ্চিমে সোনাদিঘির দক্ষিণ পাড়ের ধ্বংস্তুপ থেকে একটি শিলালিপি আবিষ্কার করেন। এতে ধ্বংস প্রাপ্ত সোনা মসজিদ খ্রিস্টাব্দ ১৪৯৮ সালের ৩০ডিসেম্বর মোতাবেক আরবী ৯০৪ হিজরী’র ১৩ই জমাদিউল আওয়াল তারিখে নির্মিত হয়েছিল।
এ কারণে কুশুম্বা মসজিদটিও হয়ত এ সময়ের কাছাকাছি কোন সালে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে বলে অভিমত রয়েছে। কারণ কুশুম্বা মসজিদের কেন্দ্রীয় মিহরাবের উপর স্থাপনকৃত শিলালিপিটি সুলতান আলা-উদ-দীন হোসাইন শাহ এর আমলের ছিল এবং মসজিদের কেন্দ্রীয় দরোজার উপরে স্থাপনকৃত শিলালিপিতে’ সুলতান গিয়াস উদ-দীন বাহাদুর শাহ এর নাম লিপিবন্ধ আছে। আর সুলতান গিয়াস উদ-দীন বাহাদুর শাহ আসল নাম ছিল খিজির খাঁন। তিনি আফগানিস্থানের শাসক ছিলেন।
সুলতান গিয়াস উদ-দীন বাহাদুর শাহ বা খিজির খাঁন ঝনেক সোলায়মানকে দিয়ে সুলতান আলা-উদ-দীন হোসাইন শাহের সময়ে নিমার্ণাধীন কুশুম্বা মসজিদের নির্মাণ কাজ শেষ করান, পরে হোসাইন শাহের নামাঙ্কিত প্রস্তর ফলকটি অপসারণ না করে তা কেন্দ্রীয় দরোজার উপর লাগানো প্রস্তুর লিপিটি প্রতিস্থাপনও করান। এতে প্রমাণিত হয় যে, কুশুম্বা মসজিদটি নির্মাণ কাজ সুলতান আলা-উদ-দীন হোসাইন শাহের শাসন আমলে ১৫০৪ খ্রিস্টাব্দে (হিজরী ৯১০ সালে) শুরু হয়েছিল।
পরে তা পাঠান সুলতান গিয়াস উদ-দীন বাহাদুর শাহ বা খিজির খাঁন ১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দে (৯৬৬ হিজরীতে) নির্মাণ কাজ শেষ করেন। ১৩০৪ সালের ভূমিকম্পে মসজিদের ছাদ ভেঙ্গে গেলে এর নির্মাণ কৌশল জানা এবং বোঝা যায়। মসজিদের ভেতরে মেহরাবের উপরে আরবী অক্ষরে ক্ষুদ্র একটি শিলালিপিতে মসজিদেরর নির্মাণ কাল ৯১০ হিজরী উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া এ শিলালিপিতে একটি কলেমা উৎর্কীণ রয়েছে। লিপির একটি পংক্তিতে হোসন শাহ রাজত্বের কল্যাণ ও মঙ্গল কামনা করা হয়েেেছ।
কুশুম্বা প্রাচীনকালের একটি স্থানের নাম। মহাভারতে এটির নাম পাওয়া যায়। পালরাজা রামপালের সভাকবি সন্ধ্যাকর নন্দী তার “রাম চরিতম” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কুশুম্বা গ্রামটি সামন্ত রাজা দ্বোরপ বর্ধণের রাজধানী ছিল। কোন কোন ঐতিহাসিক বলেছেন, গৌড়ের সুলতান হোসেনশাহ্ এর পুত্র নাসির উদ দীন নুসরত শাহ্ এর নির্দেশে এ মসজিদটি নির্মিত হয়েছে।
জনশ্রতি রয়েছে যে, সোলায়মান খাঁন মসজিদ থেকে সামান্য দুরে উত্তর-পশ্চিম কোণে পরিখা বেষ্টিত একটি বাড়িতে বসবাস করতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল সোনা বিবি মতান্তরে কুসুম বিবি। সেখানে এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ ছিল। দিঘিতে পারদ থাকায় কোন শ্যাওলা জন্মে না বলে ধারণা। আরো ধারণা দিঘির সাথে মাইদাকোলা বিলের মধ্যে একটি সংযোগ ছিল। পরিখা দিয়ে কোন ব্যক্তি গেলে আর ফিরে আসত না। সেই বাড়ি ও মসজিদের ধ্বংসাবশেষ এখনও কিছু অবশিষ্ট দেখা যায়।
যা বর্তমানে জঙ্গলে পরিপুর্ণ হয়ে গেছে। মসজিদের আয়তনঃ প্রায় সাড়ে তিনশত বিঘা আয়তন জায়গাজুড়ে কুশুম্বা মসজিদ ও দিঘি অবস্থিত। এর মধ্যে কুশুম্বা মসজিদের দৈর্ঘ্য ৪০হাত, প্রস্থ ৩০হাত এবং দেয়ালে পুরুত্ব হলো ৪হাত। এটি গাঢ় ধূসর বর্ণের পাথর দিয়ে নির্মিত বলেই অনেকের মত লক্ষ্য করা যায়। আসলে দেয়ালের ভেরতে আছে ইট। ভেরতে ইট-সুরকি দিয়ে দুই দিকে পুরু করে পাথরের চাঁই দিয়ে এমনভাবে তা ঢেকে দেয়া হয়েছে যে, বাইরে থেকে দেখে যেন বোঝার কোন উপায় নেই।
মসজিদটি প্রতœতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত। একজন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্মচারী এখানে নিয়োজিত রয়েছেন। বর্তমানে প্রতিদিন এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়। তাছাড়া মুসলিমদের প্রধান উৎসব ইদুল ফিতর ও ইদুল আযহায় এখানে বেশ কয়েক বার জামায়াতে নামাজ আদায় করেন অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মুসলিম ভাতৃবৃন্দ।

কুশুম্বা দিঘি
মসজিদের পূর্ব দিকে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর শতাধিক বিঘা আয়তনের একটি বিরাট দিঘি রয়েছে। দিঘিটির দৈর্ঘ্য ১২৫০ ফুট এবং প্রস্থ ৯০০ফুট। তবে বর্তমানে এর আয়তন অনেক বেড়ে গেছে। মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত হলেও প্রতি বছর পুকুর ইজারা দেয় রাজস্ব বিভাগ। অনেক রাজস্থ আয় হলেও মসজিদের উন্নয়নের কাজে তেমন কোন অর্থ ব্যয় করতে দেখা যায় না বলে স্থানীয়রা দাবী করেন।
নুনু শাহ্র মাজারঃ মসজিদের কাছে নুনু শাহ্ নামে একজন জনৈক একজন ধার্মিক দরবেশের মাজার ছিল। বর্তমানে মাজারের কোনচিহ্ন পর্যন্ত আজ আর দেখতে পাওয়া যায় না। স্থানীয় ভুীমদস্যু ও স্বার্থনেষি মহল সেটি গ্রাস করে ফেলেছে। অনেকে দিঘির জমি দখল করে পত্তন নিয়ে স্থায়ী ভাবে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করেছে। ফলে অনেক জমি বেহাত হয়ে গেছে। তবে তাদের অনেকের দাবী এ জমি তাদের নিজ পরিবারের খতিয়ানভ’ক্ত।


পিকনিক স্পট
উত্তরে মানতে আসা অতিথিদের জন্য ষোলটি চুলা নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া মহিলা অতিথিদের বসার জন্য একটি শেডঘর রয়েছে। ৭/৮টি দোকানপাট সেখানে গড়ে উঠেছে।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কুশুম্বা মসজিদটি সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ করতে তেমন উদ্যোগি নয়। তারা এর সঠিক দেখভাল করতে পারছেন না। ফলে মসজিদের দক্ষিণে উপরে পাথরের আবরণ দেয়া ইটের ফটকটি ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়ে গেছে। এটির মেরামতের জন্য কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। দীর্ঘদিন থেকে মসজিদের কোন উন্নয়ন কাজ হয়নি। কয়েক বছর আগে মসজিদের সামনে একটি পাকা ঘাট। পরে আরো দুটি পাকা ঘাট নির্মিত হলেও দীঘদিন থেকে মসজিদ সংস্কার করা হচ্ছিল না।
মসজিদ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নুরুজ্জামানের নিকট সাংবাদিকরা মসজিদে লাইটের ব্যবস্থা করার দাবী জানালে তিনি আগ্রহী হয়ে উপজেলা পরিষদ থেকে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪০লাখ টাকা বরাদ্দ করেন।
পরে দফায়দফায় বরাদ্দ বাড়ানো হয়। এতে মসজিদের চারদিকে দেওয়াল তৈরি এবং ৩২টি নানা রংঙের লাইট স্থাপন, মেঝেতে টাইল্স, মসজিদের দক্ষিণ- পশ্চিমে মুসল্লিদের জন্য আধুনিক টাইল্স দিয়ে অযুখানা নির্মাণ ও পানির টাংকি স্থাপন করা হয়েেেছ। এছাড়া অতিথি’দের বিশ্রামের জন্য দোতলা বিশিষ্ট বিশ্রামাগ্রার (যাতে নিচের তলায় পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা ১৮টি টয়লেট) নির্মাণকাজ শুরু করেন। এগুলোর জন্য প্রায় ৮০লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। তিনি পদোন্নতিজনিত (এডিএম) কারণে অন্যত্র বদলি হয়ে চলে গেলে বর্তমানে (প্রায় ৫মাস হয়ে গেল) আবারো কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। এটির কোন হীন উদ্দ্যেশ্য সাধারণ জনগণ বুঝতে পারছেন না। তারা বন্ধ কাজ দ্রুত শুরুর দাবী জানিয়েছেন। তবে এডিএম মোঃ নুরুজ্জামান হঠাৎ একদিন কুশুম্বা বেড়াতে এসে আপেক্ষ্য করে বলেছেন, তিনি নিজ উদ্যোগে বন্ধ বাকি কাজ শেষ করবেন। তবে কবে নাগাদ আবার কাজ শুরু হবে তা সচেতন মহল জানতে এখনও পারছেন না।
অনুপম সৌন্দর্যের এ মসজিদ দেখতে এখানে দেশ-বিদেশের অনেক পর্যটক ভ্রমণে ও বেড়াতে আসেন। তাদের জন্য কোন ভাল হোটেল-মোটেল নেই। ফলে নানা সমস্যার সম্মুখীন হন আগত পর্যটক ও পিপাসুরা। সম্প্রতি ব্যাক্তি উদ্যোগে নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের পাশে কুশুম্বা মোড়ে সীমানা কফি হাউস নির্মিত হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় আহামরি কিছূ না। এখানে আগত পর্যটক ও ভ্রমণপিপাসু কিছু মহিলারা মাঝে-মধ্যে হেনস্থার শিকার হন কিছু টাউট-বাটপারদের হাতে। একজন পাহারাদারর এর স্থলে এখানে ৪জন পাহারাদার নিয়োগ দানের জন্য অনেক উদ্যোগ নেয়া হলেও, এখনও তা বাস্তবে আলোর মুখ দেখেনি। তাদের নিরাপত্তার জন্য দ্রুত সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা দরকার।